কেঁদোভূত

মোহিত কামাল

ইলেকট্রিসিটি চলে যাওয়ার পর আচমকা ঘর আঁধার হয়ে গেল। আঁধারেও দুটো চকচকে চোখ ঘুরতে লাগল ঘরে। দেহ নেই, মুখ নেই, অথচ চোখ ঘুরছে—দেখে ভয় পেলো না রবিন, বরং ভয়শূন্য নীরব পাথরের মতো নিজের চোখ গোল গোল করে তাকিয়ে রইল নড়তে থাকা চোখ দুটোর দিকে।

টেবিলে বসে পড়ছিল সে। সামনে জেএসসি পরীক্ষা। পরীক্ষাকে কখনোই ভয় পায়নি সে। শুনেছে ভয় পেলে অনেক সময় অদ্ভুত সব দৃশ্য চোখে ভাসে, ভূত এসে ঘাপটে টুঁটি টিপে ধরে, অথবা কেড়ে নেয় মুখের কথা। সে তো ভয় পায়নি। তবুও কি ভূত চলে এল ঘরে?

চিন্তাটা মাথায় নড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াতে চাইল সে। উঠতে পারল না। মনে হলো চেয়ারে শক্ত আঠা লাগিয়ে রেখেছে কেউ, ওঠার চেষ্টা করেও উঠতে পারছে না। তবে কি সত্যি সত্যি ভয় পাচ্ছে নিজেই? ভূত কি সত্যিই আক্রমণ করেছে এই মুহূর্তের আঁধারে ডুবে থাকা ঘর? এ ভাবনাটি ধীরে ধীরে ভয় জাগিয়ে তুলল মনে, বুক ঢিপ ঢিপ বাড়তে লাগল, পাগলা ঘোড়ার মতো টগবগ করে ছুটতে লাগল হূদপিণ্ড। বাইরে তাকাল খোলা জানালা দিয়ে। জানালায় পর্দা ঝুলছে। তবে পর্দার একপ্রান্তে সামান্য ফাঁক রয়েছে। সেই ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে ব্যালকনির সাদা দেয়াল। দূরে সড়কের বিদ্যুত্ বাতির আবছা আলোয় দেখা যাচ্ছে দেয়ালের ওপর হাত নড়ছে। আঙুলের ইশারায় ডাকছে তাকে। সত্যিই কি কেউ ব্যালকনিতে এসে দাঁড়িয়েছে? ভয় জোরাল হচ্ছে। কাঁপছে শরীর, আবার উঠতে চেষ্টা করল রবিন, জোর করে দাঁড়িয়ে গেল। না চেয়ারে আঠা নেই তবে প্রথমে উঠতে পারছিল না কেন সে? প্রশ্নটিও মাথার মধ্যে ভুতুড়ে চাপ তৈরি করল। দৃপ্তপায়ে ভয় হটিয়ে এগিয়ে গেল ব্যালকনির দিকে। সঙ্গে সঙ্গে অন্ধকারে চকচক করে ভেসে থাকা চোখ দুটোও সরে গেল? কোথায় পালাল তারা? ভাবনাটি থামিয়ে রাখতে পারল না রবিনকে। সজোরে টান দিল পর্দা। না। হাত নাড়ানো কমছে না। আসলে কি ওটা হাতের ইশারা? নাকি অন্য কিছু? দুরন্ত প্রশ্নের আলোকে সাহস নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করল রবিন। সঙ্গে সঙ্গে ভয়ের চাপও কমে গেল মস্তিষ্ক থেকে। অদ্ভুত কাণ্ড—চাপ কমে যাওয়ার পর দেখল চকচক করে ভাসতে থাকা চোখ দুটো সরে গেছে সামনে থেকে। কোথায় পালাল তারা? পেছন ফিরল দেখার জন্য—না, নেই।

তবে কি সাহসের সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে ভূতটুতের আক্রমণ? তেমন কথাই শুনেছিল সে। এই ভরসায় এগোল ব্যালকনির দিকে। হাত এখনো নড়ছে। তবে এখন মনে হচ্ছে এটি পুরোপুরি হাত নয়। হাতের মতো দেখতে একটা ছায়া পড়েছে দেয়ালে। সড়কবাতির এপাশে রয়েছে একটা গাছ। পানপাতার মতো দেখতে। পাতায় সড়কবাতির আলো এসে পড়ছে উল্টো পাশে। আর এপাশে নড়ছে পাতার ছায়া। তা-ই দেখে মনে হয়েছিল হাতের ইশারা। বোঝার পর এতক্ষণে দমবন্ধ করা শ্বাস বেরিয়ে গেল সজোরে। ভয়শূন্য মন নিয়ে এল ঘরে। এপাশ ওপাশ তাকাল। ভূতের চোখ দুটো খুঁজল। নেই, পালিয়েছে তারা। ভূতচোখ এলই বা কেন, পালালই বা কেন—বিষয়টি না বুঝে আঁধার ঘেঁটে বসল চেয়ারে। হঠাত্ ইলেকট্রিসিটির শক খাওয়ার মতো ঝাঁকি খেয়ে উঠে দাঁড়াল সে। দেখল আঁধারে খোলা বইয়ের দু পৃষ্ঠার ওপর চোখ দুটো আসন নিয়েছে। চকচক করছে। ঘুরছে মারবেলের ঘূর্ণির মতো। ভয় পেলেও জয়ের নেশা চেপে বসল রবিনের সাহসী মনে। বইয়ের দিকে হাত বাড়াল সে। আর তখনই চোখের জল ফেলে ‘ভূতচোখ’ পালাল ঘর থেকে।

আরো সাহস বেড়ে গেল রবিনের। জোরালো কণ্ঠে আঁধারের দিকে প্রশ্ন ছুড়ে দিল, ‘চোখভূত’, তুমি কি আছ, না পালিয়ে গেছ? তোমার চোখের পানিতে ভিজে গেছে কেন আমার বইয়ের পাতা?’

মিউ মিউ উত্তর ভেসে এল, ‘তুমি আমাকে ভয় পাওনি তাই কেঁদেছি আমি। সেই অশ্রুতে ভিজে গেছে তোমার বই, মরি আমি। তাই পালিয়েও যাচ্ছি তোমার সাহস দেখে...’