অবাক করা এক ডাইনোসর বিচ

মার্জিয়া লিপি

ইচ্ছেটা অনেকদিন ধরেই ছিল। ২০১৮ সালের অক্টোবরে মালয়েশিয়া আর ইন্দোনেশিয়ার বালি ভ্রমণের জন্য মালিন্দো এয়ারলাইনসে টিকিট বুকিং দিলাম। ক্রিসমাসের ছুটির পর ১২ দিনের একটা ভ্রমণসূচি খসড়াও করে ফেললাম। পরিকল্পনার প্রথম চার দিনের সূচিতে ছিল—মালয়েশিয়া আর পরবর্তী ৮ দিন ছিল বালির জন্য নির্ধারিত। শুরুতে ভ্রমণসঙ্গী ছিল সাত জন, পরে বেড়ে সে সংখ্যা দাঁড়ায় ১০ জনে। সর্বকনিষ্ঠ সদস্য দ্রাবিড়ের বয়স সাড়ে চার আর বয়োজ্যেষ্ঠ বিশ্বজিত্ ভাদুড়ী দাদার বয়স ৫৪। সহকর্মী রহুল ভাই এয়ার টিকিট কিনেও শেষ পর্যন্ত আর অফিসের কাজের জন্য যোগ দিতে পারলেন না।

ভ্রমণসূচিতে স্থির হলো—৩১ ডিসেম্বরে বালির কুটা বিচের বিখ্যাত আতশবাজি দেখব। মূলত বালি  ইন্দোনেশিয়ার একটা আলাদা দ্বীপরাজ্য। আর ইন্দোনেশিয়া পৃথিবীর বৃহত্তম দ্বীপের দেশগুলোর অন্যতম। তেরো হাজারের বেশি দ্বীপ—জীববৈচিত্র্য আর সাংসৃ্কতিক বৈচিত্র্যে অনন্য এ দেশটি। সবচেয়ে বড় ফুল— র্যাফলেশিয়া অ্যারনোল্ডো আর গ্রেটার বার্ডস অব প্যারাডাইস-এর জন্য বিখ্যাত।

ইন্দোনেশিয়ার উত্পত্তি গ্রিক ভাষায় ইন্দোস আর নেসস থেকে যার অর্থ ইন্ডিয়ান আইল্যান্ড। প্যাসিফিক রিং অব ফায়ার-এ অবস্থিত দেশটির মাটি ভূ-গাঠনিকভাবে খুব অস্থির। ৪০০টি আগ্নেয়গিরি রয়েছে ইন্দোনেশিয়ায়—যার মধ্যে ১৩০টিই সক্রিয়। গত কয়েক বছরে আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ আর সুনামির কারণে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এদেশটি বার বার সংবাদ শিরোনাম হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতি ঘটেছে বিভিন্ন পর্যায়ে অনেক। বছরে দুটি ঋতু দেখা যায়—বর্ষা এবং শুষ্ক। বিষুবরেখা বরাবরে অবস্থিত দেশটির তাপমাত্রা খুব বেশি উষ্ণ বা শীতল নয়। ৩৪টি প্রদেশ রয়েছে ইন্দোনেশিয়ায়—যার মধ্যে জাভা, বালি এবং লুম্বক আয়তনের দিক থেকে বড়। 

বালি বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য প্রবালদ্বীপ—নুসা পেনিডা, নুসা লেম্বানগান, নুসা কেনিঙ্গন নিয়ে গঠিত। পাশেই রয়েছে লুম্বক প্রদেশের বিখ্যাত আরো কিছু দ্বীপ। এসব দ্বীপের প্রত্যেকটিতে রয়েছে নিজস্ব স্বতন্ত্র সংস্কৃতি আর বৈশিষ্ট্য। দিনে-রাতে কমপক্ষে দ্বীপগুলোর তিনবার এসব প্রবালদ্বীপের সৌন্দর্য আর বৈশিষ্ট্য বদলে যায়। সূর্যোদয়ের পর স্নিগ্ধ আর রাতের আলো-আঁধারের নীরবতায় দ্বীপরাজ্য যেন সৌন্দর্যের ভিন্ন পসরায় নিজেকে সাজায়। বালি ভ্রমণে অধিকাংশ পর্যটকই ভ্রমণের তালিকায় দ্বীপ—নুসা লেম্বানগান, নুসা পেনিডা এবং গিলি ট্রায়নগানকে অন্তর্ভুক্ত করে। 

আমাদেরও ৮ দিনের বালি পর্বের ভ্রমণসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করেছিলাম—কুটা আর উবুদের বিভিন্ন দর্শনীয় মন্দির—তানাহলট, উলুয়াতু, নুসা দুয়া সমুদ্রসৈকত, ড্রিম বিচ, পাদাংপাদাং সিক্রেট সমুদ্রসৈকত, জিমবারান বিচে সামুদ্রিক মাছে ক্যান্ডেল ডিনার, থার্টিফাস্ট নাইটে কুটা বিচের আতশবাজি, উবুদের রাইস ট্রেরেস, আর্ট গ্যালারি, কফি প্ল্যানটেশন, ট্রারাঙ্গান জলপ্রপাত, জীবন্ত আগ্নেয়গিরি—কিন্তামানি, মাংকি ফরেস্ট, বার্ড জু ইত্যাদি। দ্বীপের তালিকায় রেখেছিলাম নুসা লেম্বানগান, নুসা কেনিঙ্গন, নুসা পেনিডা এবং গিলি ট্রায়নগানকে।

ভ্রমণের শুরুতে খুব উত্তেজনায় ছিলাম বালির কোরাল দ্বীপ ভ্রমণ এবং পানির নিচের বিভিন্ন অ্যাকটিভিটিস নিয়ে।

স্কুবা ড্রাইভিং এবং স্নোরকেলিং-এর জন্য বালি এবং লুম্বকের গিলি দ্বীপগুলো খুব বিখ্যাত। পানির নিচের জীববৈচিত্র্য অসাধারণ বর্ণিল ও অন্যরকম বিস্ময়কর।

ইন্দোনেশিয়া ভ্রমণের ষষ্ঠ দিনে আমরা রওনা দিই নুসা লেম্বানগান থেকে নুসা পেনিডায়। নুসা পেনিডা দ্বীপে যে কয়টি আকর্ষণীয় স্থান রয়েছে, তার মধ্যে একটি ডাইনোসর বিচ বা কেলিংকিং বিচ। নীলাভ-সবুজ পানি, সোনালি ঝকঝকে রোদ আর মাখন রঙের সাদা সৈকতে ডাইনোসর আকৃতির বিচটি বৈশিষ্ট্যে স্বতন্ত্র ও অনন্য।

নুসা লেম্বানগানে আসতে হয় কুটার সেনোর বিচ থেকে ফার্স্ট বোটে। সৈকতের একেবারে কিনারায় অবস্থিত—স্বপ্নের মতো সুন্দর একটা রিসোর্ট—নুসা লেম্বানগানের মহাগিরি। প্রবালদ্বীপের কাচের মতো স্বচ্ছ নীল পানি আর মহাগিরির সুইমিংপুল রাত্রিযাপন শেষে ভ্রমণসঙ্গীদের ঘুমের মধ্যে রেখেই আমি আর সূর্য একটা মোটরবাইক নিয়ে রওনা দিলাম নুসা পেনিডার উদ্দেশে। সেদিন ছিল বালিতে ‘গালুনগন’ উত্সব। প্রতি ছয় মাস পর পূর্ণিমা তিথিতে ‘গালুনগন’ উত্সব পালিত হয়। রঙ-বেরঙের বিভিন্ন পোশাক পরে মাথায় পূজার নৈবদ্য নিয়ে ভিড় করে ছোট-বড় সকলেই বিভিন্ন মন্দিরে। বছরকয়েক ধরে এই দ্বীপটি অন্যরকম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে পর্যটকদের কাছে পরিচিতি পেয়েছে। মোটরবাইকে ৪৫ মিনিট যাওয়ার পর ইয়েলো ব্রিজের নিচে টিকিট কাউন্টারের পাশে বাইক পার্ক করে স্পিডবোটের টিকিট কিনে নিলাম লাল রঙের ১ লক্ষ মিলিয়ন রুপাইয়া দিয়ে—যা বাংলাদেশের টাকায় মূল্যমান ৬ শত। মোটরবাইকের নম্বরসহ একটা ফটোগ্রাফ তুলে নিলাম যাতে ফিরতি পথে একই রঙের কালো বাইকের সমুদ্র থেকে নিজেদের বাইকটা খুঁজে পেতে সুবিধা হয়। রওনা করলাম স্পিডবোটে—সবুজ রঙের পানির বুক চিরে রাজহংসীর মতো। আধাঘণ্টার জলপথ পাড়ি শেষে পেলোবন হারবারে নেমে পুনরায় আরেকটি বাইক ভাড়া নিলাম ভরপেট পেট্রোলসহ সত্তর হাজার রুপাইয়ার বিনিময়ে। অগ্রিম টাকা শোধ করে রওনা দেওয়ার পূর্বে মোটরবাইকের মালিক জানালেন, ফেরার পর তাঁকে না পেলে আমাদের অপেক্ষার প্রয়োজন নেই। চাবি মোটর সাইকেলে রেখে চলে গেলেই হবে। সেখানে নাকি এরকমই রেওয়াজ। একথা শুনে মনে মনে তুলনা করলাম—জাতিগতভাবে আমাদের দৈন্যদশার কথা।

আমরা চলছি পাহাড়ি উঁচু-নিচু পথ বেয়ে। কিছুদূর পরপর আবার পিচঢালা রাস্তা, অনেকটা আমাদের দেশের রাঙামাটি যাওয়ার রাস্তার মতো। পথে অনেক বিদেশি ও বিদেশিনীকে দেখলাম স্কুটি এবং বাইক চালাচ্ছে।  স্মার্টফোনে জিপিএস দেখে দেখে পথ চলছে। মাঝে মধ্যে রাস্তা ভুল করে স্থানীয় পথচারীদের জিজ্ঞেস করে আবারও সঠিক পথের সন্ধান মিলছে। প্রায় ঘণ্টাখানেক মোটরবাইকে চলার পর রাস্তা ভুলে সামনে চলে গিয়ে পুনরায় তীর চিহ্নিত সঠিক পথের সন্ধান খুঁজে পাই। কিছুদূর যাওয়ার পর রাস্তা কোথাও কোথাও বেশ ভাঙা। স্থানীয় মানুষজন খুবই সহযোগিতাপূর্ণ মনোভাবের। পাহাড়ি রাস্তায় যদি বাইক চালানোর পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকে তবে হঠাত্ করে অ্যাডভেঞ্চার না করাই ভালো। প্রায় ১:৩০ মিনিট টানা গাড়ি চলার পর দেখা মিলল নুসা পেনিডার অন্যতম আকর্ষণীয় ডাইনোসর বিচ বা কেলিংকিং বিচের পার্কিং এলাকার। প্রবেশের জন্য টিকিট কিনতে হলো ৫০ হাজার রুপাইয়া দিয়ে। মোটরবাইক রেখে অন্যদের অনুসরণ করে কিছুদূর যাওয়ার পরই চোখের সামনে ভারত মহাসাগরের এক অপরূপ রূপের দেখা মেলে।

সবুজ গাছপালা পেরিয়ে সাদা সৈকতের পর দিগন্তজোড়া স্বচ্ছ নীলাভ সবুজ রঙের সমুদ্র। অনেক পর্যটক এখানে যেয়ে এর উপরিভাগের সৌন্দর্য দেখে চলে আসেন, কিন্তু বালি ভ্রমণের প্রথম থেকেই আমার খুব ইচ্ছা ছিল ডাইনোসর বিচের সিক্রেট পয়েন্টে যাওয়ার। উপরিভাগ থেকে সৌন্দর্য দেখে আমরা নিজেদের আর থামাতে পারলাম না।

পাহাড় আর সমুদ্রের দুর্গম প্রকৃতির বন্য সৌন্দর্য আমাকে অনেক বেশি মুগ্ধ করে। ২০০৩ সালে হিমালয়ের

শৃঙ্গ—কাঞ্চনজঙ্গার সঙ্গে প্রথম দেখা দার্জিলিং-এ। এক দুনির্বার আকর্ষণ আর রহস্যের চাদর যেন খুঁজে পাই হিমালয়ের কাঞ্চনজঙ্গায়। সে বছরেই আমাদের প্রথম ট্রেকিংয়ের অভিজ্ঞতা হয়। রুদ্রপ্রয়াগ থেকে মন্দাকিনীর কিনার ধরে ধরে পৌঁছে গিয়েছিলাম উত্তরাঞ্চলের চার ধামের অন্যতম হিমালয়ের শৃঙ্গে—তীর্থ কেদারনাথে। গৌরীকুণ্ড থেকে চড়াই-উতরাই পথে ২৮ কিলোমিটার পায়ে হাঁটার পথ। সেবারে হিমালয়ের শ্বেত-শুভ্র শৈবতীর্থ কেদারনাথ শৃঙ্গকে দেখেছিলাম হাতের নাগালের দূরত্ব থেকে। এসব উথাল-পাথাল পাগলামির দীর্ঘ বিরতি শেষে ২০১৬ সালে পৌঁছে গিয়েছিলাম—পৃথিবীর স্বর্গ কাশ্মিরের পির পাঞ্জাল এবং জানস্কর পাহাড়ের মাঝখানে পান্না রঙের ট্যুলিয়ান লেকে। মেঘ ভেসে আসা পাহাড়ের গা ঘেঁষে গ্লেসিয়ার নিচে নেমে আসা, বেগুনি আর হলুদ রঙের ছোট ছোট জিপসি ফুলের কার্পেটের মধ্য দিয়ে নেমে আসে স্বর্গের উর্বশী-রুপালি রঙের ঝরনা। ২০১৭ সালে ভুটানের প্রধান ঐতিহ্যবাহী বৌদ্ধমন্দির টাইগার্স নেস্টে—প্রায় ৮ ঘণ্টার কষ্টসাধ্য ট্রেকিং শেষে পৌঁছেছিলাম টাইগার্স নেস্ট। ভুটানের পারো ভ্যালিতে সুউচ্চ পাথুরে পাহাড়ের ঝুলন্ত খাঁজে এক অভূতপূর্ব নির্মাণশৈলীর নিদর্শন তাকসান মন্দির। এমনকি ২০১৮ সালের মে মাসে আমাদের নেপাল ভ্রমণ ছিল অনেক রোমাঞ্চকর। অন্নপূর্ণা বেসক্যাস্প থেকে হিমালয়ের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ—এভারেস্টকে দেখা, ক্লিফ জাম্পিং, ভটিকশি নদীতে রাফটিং, ওয়াল ক্লাইম্বিং, সিদ্দা কেভ অভিযান, বাঞ্জি জাম্পিং—এসবই অ্যাডভেঞ্চার ছিল আমাদের ভ্রমণে।

নুসা পেনিডার কেলিংকিং বিচের উপরিভাগে পর্যটকের জটলা। স্মার্টফোন আর ক্যামেরায় বিভিন্নভাবে ছবি তুলে স্মৃতিতে রেখে দিচ্ছে রহস্যময় সৈকতটিকে। সারা গায়ে উল্কি আঁকা ব্রাজিলের এক বিখ্যাত মডেলের ফটোশুট চোখে পড়ল। পায়ে হেঁটে নিচে নামার সময় কেউ বলছে ৪০-৫০ মিনিট কেউ বা বলছে আরো কিছু বেশি সময় লাগবে। বারবার আমি সূর্যের মুখের দিকে তাকাচ্ছিলাম। একপর্যায়ে তাকিয়ে বললাম, ভয়ের কী আছে? আমাদের তো একদিনে ১৪ ঘণ্টা পাহাড়ে হাঁটার অভিজ্ঞতা রয়েছে; এ আর এমনকি?

এভাবে কোনোরকম প্রস্তুতি ছাড়াই সিক্রেট বিচের জন্য রওনা হলাম। পাহাড় বেয়ে কিছুদূর নিচে নামার পর গাছপালার মাঝখান দিয়ে ডাইনোসর বিচে যাওয়ার জন্য পথ পেয়ে গেলাম। কিছু পথ অতিক্রম করে দেখতে দেখতে ডাইনোসরের মাথার দিকে এগিয়ে যেতে লাগলাম।

প্রথমে একটু সহজই মনে হয়েছিল। কিন্তু দ্বিতীয় ধাপে যাওয়ার পরই আসল রহস্যের শুরু হলো। খূবই সরু পাহাড়ি পথ। দু পাশ একদম ফাঁকা। শুধু কিছু চিকন চিকন লাঠি ও বাঁশ দিয়ে সিঁড়ির হাতলের মতো করে বানানো। বিভিন্ন উচ্চতার এলেবেলে সিঁড়ি। মনে হলো ভুটানে টাইগার নেস্টে যাওয়ার সময় ওপরে উঠে তেরশ সিঁড়ি অতিক্রম করেছিলাম, কিন্তু এবারের অভিজ্ঞতা একেবারে ভিন্ন। সরু কাঠ আর বাঁশ ধরেই সবাইকে নিচে নামতে হয়েছিল, পাথরের খাঁজে খাঁজে কোথাও একটু প্রশস্ত পথ কোথাও বা সরু পথ। একসঙ্গে ২-৩ জন ওঠানামা করা যায় না। দাঁড়িয়ে অন্যকে সাইড দিতে হয়। ট্রেকিং-এর সময় সঙ্গে করে খাওয়ার সেলাইন, পানি ও গ্লুকোজ নিয়ে যেতে হয়। কোরাল, পাথর, বালি আর বাতাসে আর্দ্রতার জন্য প্রচুর ঘাম হয়। শরীর থেকে লবণ বের হয়ে রক্তের চাপ কমে যেতে পারে। আবহাওয়া আর্দ্র থাকলেও দুর্ঘটনার সম্ভবনা থেকে যায়, কারণ নিচে নামার পথটা অনেক খাড়া, একটু স্লিপ করলেই বিপত্তি ঘটে যেতে পারে। মিনিট বিশেক পর প্রচণ্ড গরম আর তাপে একসময় মনে হলো বৃষ্টির মতো পানি ঝরছে গা থেকে। নিচে নামতে গিয়ে শরীরের ক্লান্তি আর অবসাদে মনে হলো আবারও একইপথে ফিরতে হবে।

ডাইনোসর বিচের সামনের তিন দিকের সৌন্দর্য যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে। নীল স্বচ্ছ পানিতে জোয়ারের সময় সিক্রেট পথটি ডুবে যায়। পানিতে ভরে যায় ডাইনোসরের নিচের দিকের গোপন সুরঙ্গ পথটি। তৃষিত মুগ্ধ নয়নে চারপাশের সবুজ আর নীলের জলরাশি দেখছিলাম, দেখছিলাম প্রকৃতি আর ওপরের নীল আকাশকে। প্রচণ্ড তাপদাহে আর ঝকঝকে রোদে ক্যামেরায় কিছুই দেখতে পাচ্ছিলাম না। আমি ওই পানিতে হেঁটে হেঁটে কিছুদূর গিয়ে একদম সামনে থেকে সাগরের ঢেউয়ের খেলা দেখে প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম ফেরার জন্যে। আমাদের হাতে সময় সীমিত, সেল ফোনে নেটওয়ার্ক পাওয়া যাচ্ছে না তাই অনুভব করছিলাম নুসা লেম্বোগানে থাকা ভ্রমণসঙ্গীরা আমাদের জন্য দুশ্চিন্তায় আছে। তাছাড়া কুটায় ফেরার উদ্দেশে আমাদের ফার্স্ট বোট ছেড়ে যাবে বিকাল সাড়ে ৪টায়। ঘড়িতে যখন ১১ :৩০টা তখন আর দেরি না করে সিক্রেট বিচ থেকে মই ধরে ওপরে উঠতে শুরু করি। ডাইনোসরের মাথায় উঠে ক্লান্ত-শ্রান্ত শরীর মাধ্যাকর্ষণ বলের বিপরীত দিকে ঠেলে এগোতে থাকি গন্তব্যে। অতিরিক্ত ঘামের কারণে শরীরে কোনো শক্তিই যেন অবশিষ্ট নেই। মুখের ভেতরে একটা কাঁচা আমের ললিপপ পুরে রেখেছিলাম যেন গলা শুকিয়ে না যায়। তবুও অতিরিক্ত ঘামে আর গরমে গলা শুকিয়ে যেন কাঠ।

আমরা আবার চলা শুরু করলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই ডাইনোসর সিক্রেট বিচের নীলাভ-সবুজ পানি আমাদের সামনে দৃশ্যমান হলো। এই পথ পাড়ি দিতে আমাদের ৪০ মিনিট সময় লাগল। বিচে নামার একদম শেষ পর্যায়ে পর্যটকদের সুবিধার জন্য একটা মই লাগানো আছে, সেই মই বেয়ে আমরা কেলিংকিং সিক্রেট বিচে পা রাখলাম।

বিচের একপাশে কিছু গাছ রয়েছে। অনেক পর্যটক সেখানে বসে বিশ্রাম নিচ্ছে। তেমন মানুষ নেই, সর্বমোট ১২-১৫ জন হবে। ছায়াঘেরা গাছের একপাশে কিছু স্থানীয় মানুষ কোমল পানীয় ও পাহাড়ি ফলের পসরা সাজিয়ে বসে আছে। আমাদের হাতে সময় কম তাই ছায়াঘেরা গাছের নিচে একটু বিশ্রাম নিলাম।

চারপাশের মনোরম পরিবেশের সৌন্দর্য ভাষায় বর্ণনার অতীত। দু পাশ ঘিরে বিশাল উঁচু পাহাড়, পাহাড়ের গায়ে সবুজ গাছপালা আর নীল আকাশ আর নীলাভ সমুদ্রের জলরাশি মিলেমিশে একাকার। হঠাত্ ঘড়ির দিকে নজর গেল। প্রায় ১২ :০০টা, আমাদের বিদায়ঘণ্টা বেজে গেছে। আমাদের যেতে হবে, নুসা পেনিডা থেকে লেম্বাগানে তা নাহলে বালিতে ফিরে যাওয়ার ফার্স্ট বোট রেখেই চলে যাবে।

আর দেরি না করে তত্ক্ষণাত্ রওনা হয়ে গেলাম। এবার আমাদেরকে অভিকর্ষ বল ভেদ করে ওপরের দিকে বেয়ে উঠতে হবে। হাতের ওপর ভর দিয়ে দিয়ে ওপরে উঠতে লাগলাম। উঁচু-নিচু সিঁড়ি; প্রায় ৪০ মিনিট পাহাড়ি পথ বেয়ে গন্তব্যের প্রায় ৯০ শতাংশ অতিক্রম করার পরই ঘটল বিপত্তি। অতিরিক্ত ঘামে রক্তচাপ কমে যাওয়ায় চোখ অন্ধকার হয়ে যায়। সিঁড়ির একপাশে বসে জোরে জোরে নিঃশ্বাস ছেড়ে বাতাস থেকে অক্সিজেন নিচ্ছিলাম। সূর্যের কথামতো মাথা কিছুক্ষণ নিচের দিকে ঝুঁকে অপেক্ষা করছিলাম। ক্রমেই দৃষ্টিসীমা ঝাপসা থেকে স্পষ্ট হয়ে আসে। আবারও পথ চলতে শুরু করে ১০ মিনিটের মধ্যে ওপরের উঠে আসলাম। লবণের অভাব পূরণের জন্যে ডাউস সাইজের দুটো ডাব খেয়ে নিলাম। বরফ ঠাণ্ডা পানিতে হাতমুখ ধুয়ে রেস্তোরাঁ থেকে হালকা কিছু খেয়ে নিলাম। রেস্তোরাঁর পাশেই ছিল একটা কালোজামের গাছ। হাতের নাগাল থেকে কয়েকটা জাম পেরে মুখে দিতেই মিষ্টি স্বাদের রসে ভরে গেল মুখ। রেস্তোরাঁয় কথা বলে আরো কিছু জাম পেরে নিলাম নুসা লেম্বাগানে থাকা কন্যা ভোর আর সঙ্গীদের জন্য। প্রয়োজনীয় শক্তি সঞ্চয়ের জন্যে পথে নাসি গোরেং আর কিচেন সাটো দিয়ে আগেভাগেই মধ্যাহ্নভোজ সেরে নিলাম।

প্রায় ১ :৩০ মিনিটে চড়াই-উতরাইয়ের পর মোটরবাইকে আমরা নুসা পেনিডায়—ব্যালাবন হারবার জেটিতে পৌঁছে একটা স্পিডবোটে ৩০ মিনিটে ফিরে আসি ইয়েলো ব্রিজে। ব্রিজের অপর পাশের নুসা কেনিঙ্গনের ব্লু লেগুন আর সিক্রেট ব্রিজে যাওয়ার লোভ সংবরণ করে ফিরে আসি নুসা লেম্বাগানের মহাগিরিতে অপেক্ষারত ভ্রমণসঙ্গীদের কাছে।

বিকাল ৪ :৩০ মিনিটে আমাদের ফার্স্ট বোট দুর্বার গতিতে ভারত মহাসাগরের বুক চিরে এগিয়ে যায় সেনোর বোট জেটিতে। যতই এগিয়ে যাচ্ছিলাম ততই বিষণ্নতায় মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে আসছিল।

প্রায় হাঁটু পানিতে নেমে আমরা ঘাটে চলে আসি। এদিকে ড্রাইভিং পার্কে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল দুটো এভেঞ্জা ব্রান্ডের গাড়ি। গল্প করতে করতে ঘণ্টাখানেকের মধ্যে ফিরে আসি কুটা বিচে আমাদের বাকুম বিচ রিসোর্টে।

এই দ্বীপগুলোতে যেতে হলে ফার্স্ট বোটে যেতে ভ্রমণকারীদের যা করতে হবে :

ফার্স্ট বোটে করে যেতে হবে। বালিতে সেনোর নামে একটা বোট ঘাট আছে। ওখান থেকেই এসব দ্বীপে যাওয়ার জন্য ফার্স্ট বোট সার্ভিস পাওয়া যায়। সকাল ৭:০০ থেকে শুরু করে বিকেল ৪:৩০ পর্যন্ত বোটসার্ভিস চলে। ইন্দেনেশিয়ান মুদ্রায় ৪৫০,০০০/- থেকে ৫৫০,০০০/- রুপিয়া বা বাংলাদেশি টাকায় ২৮৫০/- থেকে ৩৪৫০/- এর ভেতর এসব দ্বীপে যাওয়া-আসার টিকেট পাবেন। অনলাইনে অথবা হোটেলের আশপাশের বিভিন্ন স্থানীয় দোকান থেকে এসব দ্বীপে যাওয়ার জন্য তথ্য পাওয়া যাবে। এসব দ্বীপে যাওয়ার জন্য মূলত কিছু প্যাকেজ পাওয়া যায়, অথবা এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য ভালোভাবে জেনে নিজে নিজেই সব ব্যবস্থা করা যায়।

 

সতর্কতা :

সবুজ বিচ্ছিন্ন দ্বীপটি ছবির মতো সুন্দর আর পরিচ্ছন্ন। তাই পরিচ্ছন্ন দ্বীপটিকে কোনোভাবে অপরিচ্ছন্ন করা উচিত নয়। কোরাল দ্বীপে পলিথিন ব্যবহারে সতর্ক থাকতে হবে। শরীরের পানিশূন্যতা এড়ানোর জন্যে ট্রেকিংয়ের সময় সঙ্গে করে খাওয়ার সেলাইন, পানি ও গ্লুকোজ নিয়ে যেতে হবে।

(আলোকচিত্র : আফতাব সিদ্দিকী সূর্য)