বাংলার নিভৃত পল্লীর মেয়েরা নকশিকাঁথার অনিন্দ্য শিল্পের রূপকার। নকশিকাঁথার ইতিহাসকে এক মলাটে তুলে এনেছেন গবেষক ও সংগ্রাহক মালেকা খান। নকশিকাঁথার পুঙ্খানুপুঙ্খ ইতিহাস নিয়ে লোক ও কারুশিল্প বিশেষজ্ঞ মালেকা খান রচনা করেছেন ‘নকশিকাঁথা: বাংলাদেশের নন্দিত শিল্পের স্মারক’ শীর্ষক সচিত্র গ্রন্থ।
সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের গবেষণা প্রকল্পের অংশ হিসেবে নকশিকাঁথার নিয়ে গবেষণা করেন মালেক খান। বইটি প্রকাশ করেছে নারীবিষয়ক পত্রিকা পাক্ষিক অনন্যা।
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে সোমবার বিকেল ৪টায় গ্রন্থটির মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, চিত্রশিল্পী শিল্পী হাশেম খান, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব আক্তারী মমতাজ, জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক আব্দুল মান্নান ইলিয়াস প্রমুখ।
দৈনিক ইত্তেফাক ও পাক্ষিক অনন্যা সম্পাদক তাসমিমা হোসেনের সভাপতিত্বে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন বইটির লেখক মালেকা খান। আলোচনা পর্ব শেষে সংগীত পরিবেশন করেন লালন সম্রাজ্ঞী খ্যাত শিল্পী ফরিদা পারভীন।
অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, নকশিকাঁথা একটি জীবন্ত শিল্প। কোনো না কোনোভাবে এটি এখনও টিকে আছে। এই শিল্প সকলের উৎসাহ ও প্রচেষ্টায় টিকে থাকবে। সত্যিকার নকশিকাঁথা বিকশিত হওয়ার জন্য এই ধরনের প্রকাশনার প্রয়োজন আছে।
চিত্রশিল্পী হাশেম খান বলেন, গ্রন্থটি নকশিকাঁথার উপর আকর গ্রন্থ হিসেবে থেকে যাবে। প্রকাশক-সম্পাদক তাসমিমা হোসেন এই মহতী কাজের পৃষ্ঠপোষক হিসাবে অসামান্য দায়িত্ব পালন করেছেন। মালেকা খান নিষ্ঠার সঙ্গে নশকিকাঁথার ভেতরে গিয়ে বিশদে কাজটি করেছেন। সচিত্র বইটি নিজেই একটি 'নকশিকাঁথা' হয়ে উঠেছে। নিজেদের সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখার জন্য আমাদের সাবধান হতে হবে। নকশিকাঁথা বাণিজ্যিক করতে গিয়ে এর প্রকৃত শিল্পমূল্য যেন অটুট থাকে সেদিকে আমাদের খেয়াল রাখতে হবে।
আক্তারী মমতাজ বলেন, নকশিকাঁথা ইউনেস্কো কর্তৃক স্বীকৃত বিশ্ব-ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে মনোনীত হবে বলে আমি বিশ্বাস করি। আমাদের দেশের ঐতিহ্যবাহী সম্পদ নকশিকাঁথা নিয়ে একটি সমৃদ্ধ প্রকাশনা এটি। মালেকা খান অসাধারণ কাজ করেছেন। তিনি এই বিষয়ের যোগ্য ব্যক্তি। আমাদের ঐতিহ্যকে ধারণে প্রবাহমান ধারা তৈরি করতে গ্রন্থটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
জাদুঘরের মহাপরিচালক মো. আব্দুল মান্নান ইলিয়াস বলেন, নকশিকাঁথা নিয়ে চমৎকার একটি প্রয়াস। গ্রন্থটি আমাদের নকশিকাঁথার গভীরে নিয়ে যাবে। নকশিকাঁথাকে বিশ্ব সংস্কৃতির ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার জন্য ইউনেস্কোতে প্রয়োজনীয় কাজগপত্র জমা দেওয়া হচ্ছে।
IMG0
নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করতে এসে মালেকা খান বলেন, এই প্রকাশনাটি আমার দীর্ঘদিনের অধ্যাবসায় ও অনেক মানুষের সহযোগিতার ফসল। শক্তিশালী ও আস্থাবান মানুষ অনন্যা সম্পাদক তাসমিমা হোসেনের কারণে আজ আলোর মুখ দেখলো। আমার অন্তর থেকে কিছু না আসলে লিখতে পারি না, নকশিকাঁথা বিষয়ক গ্রন্থটি আমার ভেতরের তাগাদা ও অসংখ্য মানুষের প্রেরণায় লেখা। নানা মাত্রায় নকশিকাঁথার ইতহিাস বর্ণিত হয়েছে গ্রন্থটিতে।
সভাপতির বক্তব্যে তাসমিমা হোসেন বলেন, নারীদের সংসারের দক্ষতা তার জন্য ব্যবসা করে আয় করার পথ তৈরি করে দিয়েছে। ঘরে বসে নারীরা যে আয় করতে পারেন সে ক্ষেত্রে মালেকা খান একজন উদ্যোক্তা হিসেবে পথিকৃতের ভূমিকা পালন করে এসেছেন। লোকশিল্পের প্রসারে তার অবদান অনস্বীকার্য। সারাজীবনের নানা অর্জনের পর মালেকা খানের আরেকটি সংযোজন নকশিকাঁথা নিয়ে এই গবেষণাকর্ম।
‘নকশিকাঁথা: বাংলাদেশের নন্দিত শিল্পের স্মারক’ বইটিতে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন থেকে শুরু করে বিভিন্ন শিল্পী এবং একেবারে প্রান্তিক পর্যায়ের নকশিকাঁথা বোনা নারীর অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে।
এসব বিষয়ের মধ্যে রয়েছে: ‘বাংলাদেশের নকশিকাঁথা: অতীত দিনের কথা’, ‘নকশিকাঁথা: পথিকৃৎজন’, ‘নারীর অবদান’, ‘কাঁথার সাংস্কৃতিক অবদান’, ‘নকশার শ্রেণিবিভাগ ও বৈশিষ্ট্য’, ‘নকশিকাঁথা : শিল্পও শিল্পী’, ‘নকশার প্রতীক, কাঁথার মোটিফ, নকশিকাঁথার ঐতিহ্য, কথাসাহিত্যে কাঁথা, একাত্তরে কাঁথার ভূমিকাসহ মোট ৪০ বিষয়ভিত্তিক অধ্যায়। নকশিকাঁথার বৈচিত্র্যময় ছবি বইটিকে আরো সমৃদ্ধ করেছে। আর্ট পেপারে মুদ্রিত সম্পূর্ণ রঙিন ২৮০ পৃষ্ঠার বইটির মূল্য রাখা হয়েছে ১ হাজার ৫০০ টাকা।
ইত্তেফাক/আরকেজি