‘ক্যান্সার-হৃদরোগ নিরাময়ে প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে গুরুত্ব দেয়া জরুরি’

বর্তমানে দেশে যে পরিমাণ মানুষ মারা যায় তার শতকরা ৬৭ ভাগ অসংক্রামক রোগের কারণে। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় চিকিৎসাকে গুরুত্ব দেয়া হলেও রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে না। রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা জোরদারকরণে সরকারের যে সকল মন্ত্রণালয় ও কর্তৃপক্ষ দায়িত্বপ্রাপ্ত তারাও এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করছেন না। ফলে মানুষ ক্যান্সার, হৃদরোগসহ বিভন্ন প্রাণঘাতী অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয়ে অকালে মৃত্যুবরণ করছে। এ সকল রোগের ব্যয়বহুল চিকিৎসার ফলেও বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যা সামগ্রীক উন্নয়নের জন্য প্রতিবন্ধক।
 
আজ মঙ্গলবার পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা) এর কার্যালয়ে ‘অপ্রতিরোধ্য ক্যান্সার ও হৃদরোগ: পরিবেশ বিপর্যয় ও করণীয়’ বিষয়ক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এ অভিমত ব্যক্ত করেন। পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা) এই সেমিনারের আয়োজন করে। সেমিনারে সভা প্রধানের দায়িত্ব পালন করেন পবা’র চেয়ারপারসন আবু নাসের খান। 
 
এ সময় আরো বক্তব্য রাখেন পবা’র সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী আব্দুস সোবহান, জাতীয় স্বাস্থ্য অধিকার আন্দোলনের আহ্বায়ক ডা. রশিদ-ই মাহবুব, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ডা. লেলিন চৌধুরী, পবা’র সম্পাদক এড. সৈয়দ মাহবুবুল আলম, ফেরদৌস আহমেদ উজ্জল, পুষ্টি বিশেষজ্ঞ ডা. এম ফরমুজুল হক, নাসফ এর সাধারণ সম্পাদক তৈয়ব আলী, প্রকৌশলী তোফায়েল আহমেদ, ডাব্লিউবিবি ট্রাস্ট’র প্রোগ্রাম ম্যানেজার সৈয়দা অনন্যা রহমান প্রমুখ।
 
সেমিনারে বক্তারা বলেন, দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়া নগরায়ন এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি অস্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রা, অস্বাস্থ্যকর খাদ্য গ্রহণের অভ্যাস, শরীরচর্চা, ব্যায়াম বা পর্যাপ্ত শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, অতিরিক্ত মোটা হওয়া, অনিয়ন্ত্রিত মাদক সেবন এবং ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার, পরিবেশ দূষণ, অনিরাপদ খাদ্য অসংক্রামক রোগ সৃষ্টির অন্যতম কারণ। তামাক ব্যবহার হৃদরোগ ও ক্যান্সারের অন্যতম কারণ। বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রায় শতকরা ৩৫ ভাগ মানুষ তামাক ব্যবহার করে।
 
ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর হেলথ ম্যাট্রিক্স অ্যান্ড ইভাল্যুয়েশনের হিসাবে বলা হচ্ছে, ২৫০টি রোগ ও বিভিন্ন ধরনের জখমে ২০১৬ সালে বাংলাদেশে ৮ লাখ ৪৭ হাজার ৮৯০ জনের মৃত্যু হয়েছিল। এই মৃত্যুর সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। ২০৪০ সালে এই সংখ্যা ৩২ শতাংশ বেড়ে ১১ লাখ ২৩ হাজার ৪৫০ হবে। একই প্রতিষ্ঠানের আরেকটি জরিপ থেকে জানা যায়, ১৯৯০ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন রোগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মানুষের মৃত্যু হয়। এ ছাড়া ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী মানুষের মৃত্যুর প্রধান দুটি কারণের একটি হৃদরোগ।
 
স্বাস্থ্য বিষয়ক আন্তর্জাতিক জার্নাল ল্যানচেটে বলা হয়- ২০১৩ সালে ১ লাখ ৭৮ হাজার মানুষের মৃত্যু হয় ষ্ট্রোকে এবং ১ লাখ ৬ হাজার মানুষ হার্ট অ্যাটাকে ও ২৮ হাজার মানুষ উচ্চ রক্তচাপ জনিত হৃদরোগে মারা যায়। জাপানিজ জার্নাল অব ক্লিনিক্যাল অনকোলজি (জেজেসিও) তথ্য অনুসারে বাংলাদেশে ১ কোটি ২৭ লাখ মানুষের দেহে অস্বাভাবিক কোষের বৃদ্ধি ঘটে চলেছে, চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় যা নিওপ্লাসিয়া নামে পরিচিত। এ অবস্থা চলতে থাকলে ২০৩০ সাল নাগাদ ক্যান্সারের ঝুঁকিতে থাকবে ২ কোটি ১৪ লাখ মানুষ।
বক্তারা আরো বলেন, প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যু কমাতে অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ অর্থাৎ- রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার প্রতি গুরুত্বারোপ করা জরুরী। এ লক্ষ্যে স্বাস্থ্য বিষয়ক আইন ও নীতিমালার যথাযথ বাস্তবায়নে দায়িত্বপ্রাপ্ত কতৃপক্ষকে এগিয়ে আসতে হবে। পাশাপাশি মানুষের জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত এবং সকল অবকাঠাগুলো জনবান্ধব করা এবং পরিবেশ সংক্রান্ত সকল দূষণ কমাতে অতিস্বত্ত্বর কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর পণ্য অস্বাস্থ্যকর খাবার, তামাক উৎপাদন বন্ধ এবং এগুলোর উপর স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জ আরোপ করতে হবে। পাশাপাশি তামাক কোম্পানিগুলো ও অন্যান্য বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর অস্বাস্থ্যকর খাবারের বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে এ সকল পণ্য সেবনে মানুষকে যেন আকৃষ্ট করতে না পারে, সেদিকে লক্ষ্য রাখা জরুরী। 
 
ইত্তেফাক/এমআই