জঙ্গিবাদ বিষয়টি জটিল। ইহার নিজস্ব শক্তি, নেপথ্যশক্তি, মনস্তত্ত্ব, দৃশ্যমান ও নেপথ্য উদ্দেশ্যসহ বিবিধ বিষয় লইয়া বিশ্লেষকদের মধ্যে মতপার্থক্য আছে। তবে সাধারণভাবে বলা যায়, বিশ্বের কোনো ভূখণ্ডই জঙ্গিদের তত্পরতা হইতে মুক্ত নহে। যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, জার্মানি ও ব্রিটেনের মতো শক্তিশালী দেশগুলিও জঙ্গিদের ধারাল নখর দ্বারা রক্তাক্ত হইয়াছে। সম্প্রতি শ্রীলঙ্কার মতো বাংলাদেশেও জঙ্গি ও সন্ত্রাসী হামলা চালাইবার চেষ্টা চলিতেছে বলিয়া গত বৃহস্পতিবার দেশবাসীকে সতর্ক থাকিবার আহ্বান জানাইয়াছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একইসঙ্গে তিনি জানাইয়াছেন যে, বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা যথেষ্ট সর্তকতা অবলম্বন করিয়া যাইতেছে।
এইখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, শ্রীলঙ্কায় ঘটিয়া যাওয়া জঙ্গিহানার ব্যাপারে একটি বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সতর্কবার্তা ছিল গত ৪ এপ্রিল হইতে; কিন্তু শ্রীলঙ্কায় যে এমন জঙ্গিহানা হইতে পারে তাহা যেন দেশটির পরিচালনাকারী সকল বিভাগের নিকটই অবিশ্বাস্য বলিয়া মনে হইয়াছিল। যেই কারণে জঙ্গিহানার সতর্কবার্তাকে গুরুত্বই দেয় নাই শ্রীলঙ্কা। ফলে হামলার সতর্কবার্তা লইয়া গোয়েন্দা-সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে আলোচনাও হয় নাই। এই কারণে সম্প্রতি পার্লামেন্টে শ্রীলঙ্কার প্রতিরক্ষা উপমন্ত্রী জানাইয়াছেন যে, এই হামলার ব্যাপারে তাহাদের দায় লইতেই হইবে। পার্লামেন্ট নেতা লক্ষ্মণ কিরিয়েলা আরো বেশি উষ্মা প্রকাশ করিয়া পার্লামেন্ট সদস্যদের উদ্দেশে বলেন যে, শীর্ষ কয়েকজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা উদ্দেশ্যমূলকভাবে গোয়েন্দা তথ্য গোপন করিয়াছিলেন। তথ্য হাতে ছিল; কিন্তু নিরাপত্তা কর্মকর্তারা যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করেন নাই। এমনকী বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সতর্কতার তথ্যটি শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী কেহই গ্রহণ করেন নাই।
সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে অনেক ব্যবস্থা গ্রহণের পরও বাংলাদেশে এখনো জঙ্গি হামলার ঝুঁকি রহিয়াছে—গত বত্সর সেপ্টেম্বরে এই সতর্কবার্তা উচ্চারণ করিয়াছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর। দেশটির সন্ত্রাসবাদ বিষয়ক বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, কিছু সন্ত্রাসী হামলার পর বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনী অসংখ্য সন্ত্রাসী হামলার পরিকল্পনা নস্যাত্ করিয়া দিয়াছে বটে, তবে জঙ্গিদের আর্থিক ও অন্যান্য সহায়তা দেওয়ার মতো জটিল অর্থনৈতিক বিষয়টি মোকাবিলা করিবার মতো যথেষ্ট সক্ষমতা বাংলাদেশের নাই। আমরা দেখিয়াছি যে, যখনই কোনো জঙ্গিহানা ঘটে, তাহার পর মনিটরিংয়ের যাবতীয় চিত্র প্রকাশ পায়। বাংলাদেশের হলি আর্টিজান হইতে শুরু করিয়া যুক্তরাষ্ট্রের টুইন টাওয়ারে বিমান হামলা এবং সম্প্রতি শ্রীলঙ্কায় জঙ্গিহানার পূর্বে একজন জঙ্গির অপারেশনে যাইবার ফুটেজ ঘটনার পরে প্রকাশিত হইয়াছে। স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন উঠে যে, সন্ত্রাসী হামলা প্রতিহত করিতে যেই কারণে বিবিধ ছাঁকনি বসানো হইয়াছে, তাহা যথাসময়ে দক্ষ কেউ নজরদারি এবং শনাক্ত করিতে না পারিলে সেই মনিটরিংয়ের মূল্য থাকে কি?
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর মতো আমরাও বলিতে চাহি যে, ধর্মের নামে যাহারা এইসব কাজ করিতেছে, তাহারা ধর্মকেই মানব জাতির নিকট হেয় প্রতিপন্ন করিতেছে। সুতরাং কেহ যেন বিভ্রান্ত হইয়া এই ধরনের ঘৃণ্যকাজে জড়াইয়া না পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রে যেমন ‘সি সামথিং, সে সামথিং’ স্লোগানটি ব্যাপকভাবে প্রচার করা হইয়াছে সন্দেহজনক কিছু দেখিলে নীরব না থাকিয়া কর্তৃপক্ষকে অবহিত করিবার ব্যাপারে—আমাদের সবাইকেও তেমনি সতর্ক থাকিতে হইবে।