ঝালকাঠি সদর উপজেলার নবগ্রাম ইউনিয়নের পরমহল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবনটি নির্মিত হইয়াছিল ২০০১-০২ অর্থবত্সরে। ইহারপর ভবনটির আর কোনো সংস্কার করা হয় নাই। বর্তমানে শ্রেণিকক্ষের ছাদের পলেস্তারা খসিয়া পড়িতেছে। পলেস্তারার আঘাতে শিক্ষার্থী আহত হওয়ার ঘটনাও ঘটিয়াছে। ছাদে বড় বড় ফাটল ধরিয়াছে। বৃষ্টির সময়ে সেই ফাটল দিয়া শ্রেণিকক্ষে পানি পড়িতেছে। দুর্ঘটনার আতঙ্কে হ্রাস পাইতেছে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের সংখ্যা; কিন্তু বিকল্প কোনো ব্যবস্থা না থাকায় জীবনের ঝুঁকি লইয়া এই ভবনেই চলিতেছে শিক্ষার্থীদের পাঠদান। একই অবস্থা ঝালকাঠির কমপক্ষে আরও ৮০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবনের। প্রসঙ্গত বলা প্রয়োজন যে, ঝালকাঠিতে মোট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রহিয়াছে ৫৮৮টি। তন্মধ্যে ৮০টি বিদ্যালয়ের ভবনকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসাবে চিহ্নিত করা হইয়াছে আগেই। দুর্ঘটনার মারাত্মক ঝুঁকি সত্ত্বেও সেইসকল বিদ্যালয়েই চলিতেছে পাঠদান কার্যক্রম। বৃহস্পতিবারের ইত্তেফাকে বরিশালে গৌরনদী উপজেলার গরঙ্গল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের যে চিত্র প্রকাশ পাইয়াছে—তাহা আরও মর্মান্তিক। বিদ্যালয়ের মূলভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষিত হইয়াছে চার বত্সর আগেই। বিদ্যালয়টির ২২৩ জন ছাত্রছাত্রীকে এখন এই প্রচণ্ড তাপদাহের মধ্যেও ক্লাস করিতে হইতেছে খোলা আকাশের নিচে। আকাশে মেঘ দেখিলেই বাজিয়া ওঠে ছুটির ঘণ্টা। আরও উদ্বেগের বিষয় হইল, কেবল গৌরনদী উপজেলাতেই ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যালয় ভবনের সংখ্যা ৪০টি। বরিশাল বিভাগেরই দুইটি জেলার যেই চিত্র এখানে তুলিয়া ধরা হইয়াছে—তাহা হইতে সারা দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলির প্রকৃত চিত্র অনুধাবন করা কঠিন নহে।
মাত্র অল্প কিছুদিন আগে বরগুনায় স্কুলভবনের বিম ধসিয়া পড়িয়া প্রাণঘাতী একটি দুর্ঘটনা ঘটিয়া গিয়াছে। প্রায় একই সময়ে কক্সবাজারসহ দেশের অন্যত্রও ঘটিয়াছে অনুরূপ একাধিক দুর্ঘটনা। সঙ্গতকারণেই অভিভাবকরা যেমন তাহাদের সন্তানের নিরাপত্তা লইয়া উদ্বিগ্ন, তেমনি কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মধ্যেও বিরাজ করিতেছে একধরনের ভীতি ও আতঙ্ক। জরাজীর্ণ ভবনে পাঠগ্রহণে অনীহার কারণে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিও হ্রাস পাইতেছে—যাহা স্পষ্টতই সরকারের অনুসৃত নীতির পরিপন্থি। ইহা বিশ্বাস করা কঠিন যে, সামগ্রিক এই বাস্তবতা সম্পর্কে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অবহিত নহেন। যেইসকল এলাকার কথা বলা হইতেছে সেখানে শিক্ষা কর্মকর্তা আছেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আছেন, সর্বোপরি আছেন একজন সংসদ সদস্যও। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান এবং উপজেলা চেয়ারম্যানেরও দায় এড়াইবার উপায় নাই। তথাপি আমরা স্থানীয় সংসদ সদস্যকেই বেশি করিয়া দায়ী করিব। কারণ সংসদ সদস্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ একজন জনপ্রতিনিধি থাকা সত্ত্বেও একটি উপজেলায় এতগুলি ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যালয় থাকে কীভাবে তাহা আমাদের বোধগম্য নহে। আবার মাসের পর মাস সেইসব বিদ্যালয়ে জীবনের ঝুঁকি লইয়া শিক্ষার্থীরা ক্লাসও করিতেছেন—ইহা কি ভাবা যায়? অবকাঠামোসহ শিক্ষার সামগ্রিক মানোন্নয়নে বর্তমান সরকারের সদিচ্ছার বিষয়টি সুবিদিত শুধু নহে, আন্তর্জাতিকভাবেও স্বীকৃত। প্রতি বত্সর বিপুল পরিমাণ অর্থও বরাদ্দ দেওয়া হইতেছে এইসকল খাতে। তাহার পরও অভিভাবক ও শিশুশিক্ষার্থীরা আতঙ্কে ভুগিবেন, তাহাদের মাথার উপর বিম ভাঙিয়া পড়িবে—এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি কিছুতেই কাম্য নহে।