ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী
আমরা সব সময় মানুষের উন্নয়ন নিয়ে ভাবছি। কেউ কেউ মনে করছেন দালানকোঠার উন্নয়ন মানেই মানুষের উন্নয়ন। কারো কারো মতে শিক্ষার উন্নয়ন মানেই উন্নয়ন। আবার স্বার্থপর আর সুবিধাবাদিরা ভাবছেন নিজের উন্নয়ন মানেই উন্নয়ন। কিন্তু মানুষের মনে যে মরচে ধরেছে, মন হারিয়ে মানুষ যে আর মানুষ নেই, এটা নিয়ে বোধ হয় খুব বেশি আমরা ভাবছি না। ভাবছি না মনের উন্নয়ন নিয়ে।
আমরা এমন কিছু চাই না যেখানে মানুষকে আমাদের মানুষ বলে মনে হয় না। মার্কিন কবি এমিলি ডিকনসনের একসময় মানুষকে খারাপ বলে মনে হতে লাগল। মানুষের প্রতি তিনি বিশ্বাস হারিয়ে ফেললেন। মাত্র ২০ বছর বয়সের মানুষটার মনে হলো, দুনিয়ার মানুষগুলো ভীষণ খারাপ। এই মানুষের সঙ্গে চলা যায় না। হঠাত্ বাড়ি থেকে বের হওয়া বন্ধ করে দিলেন। অতি আপন কয়েকজন ছাড়া কারো সঙ্গে দেখা-সাক্ষাত্ করতেন না। ১৮৩০ সালে জন্ম নেওয়া এই কবির জীবিত থাকা অবস্থায় তার মাত্র সাতটি কবিতা প্রকাশিত হয়েছিল। অথচ তিনি লিখেছেন ১ হাজার ৭শ কবিতা। লিখতে পছন্দ করলেও প্রকাশে আগ্রহ ছিল না। ৫৬ বছর বয়সে এই কবির মনে হলো বেঁচে থাকার মানে নেই। তাই একদিন গলায় পাথর বেঁধে জলে ডুবে আত্মহত্যা করেন। এ ধরনের আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত আমরা চাই না। আমরা চাই অবকাঠামোগত উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মনের উন্নয়ন।
সাম্প্রতিক সময়ের দুটো ঘটনার বিষয় এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করতে চাই। ঘটনা দুটো ভিন্ন হলেও পারস্পরিক সম্পর্কের সমীকরণটার একটা মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে। নুসরাত জাহান রাফি আর সোহেল রানা দুইটি বাস্তব ঘটনার চরিত্র। ভিন্ন এ দুইটি ঘটনার সঙ্গে আগুনের একটা যোগসূত্র আছে। এ দুইজনই শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর সঙ্গে হার না মানা লড়াই করে গেছেন। নুসরাত জাহান রাফিকে যৌন হয়রানির প্রতিবাদ করতে গিয়ে আগুনে পুড়ে মরতে হয়েছে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে সে লড়েছে, প্রতিবাদী হয়েছে, যাতে তার মতো আর কাউকে অপমানিত হতে না হয়। অন্যদিকে ফায়ারম্যান সোহেল রানা নিজের জীবন বিপন্ন করে আগুনের বিরুদ্ধে লড়েছে। আগুনের গ্রাস থেকে মানুষকে রক্ষা করেছে। এ দুইটি ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে বলছে, মানুষের মনের কিংবা মানবিক উন্নয়নের জায়গাটিতে আমাদের যেভাবে কাজ করা উচিত ছিল সেভাবে আমরা করিনি। মানবিক উন্নয়নের জায়গায় মানুষের ব্যক্তিক ভোগবাদী ও স্বার্থপর মনোভাব আজ গড়ে উঠেছে। এর ফলে মানুষ নিজেকে মানবিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয়গুলো থেকে সরিয়ে ফেলছে।
উপর্যুক্ত আচরণের ক্ষেত্রে মূলত দুইটি মনস্তাত্ত্বিক বিষয় কাজ করছে। এগুলোর একটি হলো Diffusion of Responsibility এবং অন্যটি হলো Bystander Effect। Bystander Effect হচ্ছে এমন একটি মনের বিষয় যার দ্বারা মানুষ প্রভাবিত হয়ে নিজের সুরক্ষার বিষয়টি নিয়ে বেশি ভাবছে; কিন্তু সমাজের অন্য মানুষের সুরক্ষার বিষয়টি এড়িয়ে চলছে। এই ধরনের মনোভাব যে মানুষের নিজের সুরক্ষাকে নিশ্চিত করছে না এটিও মানুষ বুঝে উঠতে পারছে না। Diffusion of Responsibility হচ্ছে মনের এমন একটি বিষয় যা মানুষের প্রতি মানুষের যে মানবিক দায়বদ্ধতা রয়েছে তা থেকে তার মানকে বিরত রাখছে। এর কারণ হচ্ছে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মনের যে পরিবর্তন ঘটছে সেটি নিয়ে আমরা কোনো ধরনের গবেষণা করছি না। আবার কোন কোন উপাদানগুলো মানুষের মনকে প্রভাবিত করে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠতে সহায়তা করছে সেগুলো চিহ্নিত করে তার প্রতিকারের কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। এজন্য প্রতিটি মানুষের মনের উন্নয়ন ও আচরণগত বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়ে জাতীয় নীতিমালা গ্রহণ করা যেতে পারে। মনের উন্নয়নের জন্য গড়ে তোলা যেতে পারে পৃথক মন্ত্রণালয়।
অন্যদিকে মানুষের মধ্যে সংস্কৃতির চর্চা, খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ, শিক্ষা ক্ষেত্রে মনের বিষয়টি সহজভাবে উপস্থাপন, সততার ইতিবাচক ফলাফল, সদাচারণ, নারীর নিরাপত্তা বিধান ও এর সঙ্গে সম্পৃক্ত অন্য বিষয়গুলোর বাস্তবায়ন ঘটাতে হবে। দূর করতে হবে সামাজিক বৈষম্য। মানুষের পারস্পরিক সামাজিক বন্ধন গড়ে তুলতে হবে। এর সঙ্গে পারিবারিক বন্ধন ও দেশপ্রেমের বিষয়টিকে যুক্ত করতে হবে। বই পড়ার প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়াতে হবে। কর্মক্ষেত্রে পরস্পরের প্রতি নেতিবাচক মনোভাবের বিষয়টিকে আধুনিক মনোবিজ্ঞানের বিভিন্ন তত্ত্বের মাধ্যমে সামাধান করে মানুষের মধ্যে একত্রে কাজ করার মনোভাব গড়ে তুলতে হবে। তরুণদের আবেগের শক্তিকে মনের শক্তিতে পরিণত করে সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনসমূহ নিশ্চিত করতে হবে। মাদক ও সন্ত্রাসমুক্ত জনপদ নিশ্চিত করতে হবে। সর্বোপরি আমরা এমন একটি উন্নয়ন চাই যেখানে মনের উন্নয়ন অর্থনীতির উন্নয়নকে প্রভাবিত করবে।
n লেখক : অধ্যাপক, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর