মানুষ হবার কঠিন যুদ্ধ

ড. এজাজ মামুন

প্রায় দুহাজার বছর আগে দার্শনিক অ্যারিস্টটল মানুষকে বিচার বুদ্ধিসম্পন্ন প্রাণী বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, এই প্রাণীটি নিজেদের উন্নতির জন্য জ্ঞান আহরণ করে এবং নৈপুণ্য আর যুক্তিকে উপজীব্য করে বেঁচে থাকে। কিন্তু মানুষকে অন্য অসংখ্য প্রাণিকুলের মাঝে সবচে বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন ও যোগ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে এক দীর্ঘপথ অতিক্রম করতে হয়েছে। নৃতাত্ত্বিকরা মানুষের এই দীর্ঘপথ পাড়ির এক অনবদ্য চিত্রও এঁকে ফেলেছেন। পশুদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে লাখ লাখ বছর পাড়ি দিয়েছে মানুষ আর তাদের বিচারবুদ্ধি কাজে লাগিয়ে যোগ্য হয়েছে। এই পৃথিবীর অসাধ্য অনেক কিছুই জয় করেছে তারা।

বেঁচে থাকার তাগিদে আদি মানুষ সংঘবদ্ধ হয়েছিল। ফ্রান্সের টেরা আমাটায় চার লাখ বছরের পুরনো আবাসনের পুনর্নির্মাণের চিত্র তার প্রমাণ বহন করে। যদিও এই প্রচেষ্টা এখনো চলমান, তারপরও প্রকৃতিকে বুঝে, জেনে, কাজে লাগিয়ে মানুষ গৃহস্থ হয়েছে মোটে ১২ হাজার বছর আগে। মানুষ সভ্যতার বিকাশ ঘটিয়েছে। পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র সাজিয়েছে।

যদিও জীবতাত্ত্বিক পার্থক্য খুব বেশি নয়, তবুও মানুষ আর পশুর মধ্যে বিশেষায়িত ভৌতিক কিছু পার্থক্য রয়েছে। যেমন, মানুষ একমাত্র প্রাণী যে কথা বলতে পারে। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন ভাষায় তাদের কথা বলার ব্যুত্পত্তি রয়েছে। একমাত্র মানুষই দুই পায়ে ভর দিয়ে সোজা হয়ে চলতে পারে। মানুষই এক মাত্র প্রাণী যে কিনা নিজেকে পোশাক দিয়ে আচ্ছাদিত করে। মানুষই একমাত্র প্রাণী যে রন্ধনশৈলী ব্যবহার করে খাবার প্রস্তুত করে। আর মানুষের রয়েছে অসাধারণ মগজ বা বুদ্ধিমত্তা যা অন্যান্য প্রাণী থেকে মানুষকে স্বতন্ত্র করে তুলেছে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো—মানুষের মগজ আর মনন এক নয়। মানুষের মগজে যে ৮৬ বিলিয়ন নিউরোন কোষ রয়েছে তা আদৌ মানুষের মননে কোনো ভূমিকা পালন করে কিনা তাও এখনো অনেকটা অজানাই রয়ে গেছে।

বুদ্ধিমত্তা মানুষের মনকে কীভাবে কতটুকু তাড়িত করবে তা নির্ণয় করার কোনো কৌশল কিংবা মাপকাঠিও নেই। অথচ এই মানুষ ভবিষ্যেক তৈরি করে। জীবের জীন সম্পাদনা থেকে শুরু করে মহাকাশকে জানার এক অসীম পথ পাড়ি দিয়েছে মানুষ। তারপরেও থেমে নেই তার যাত্রা। কল্পনা আর উদ্ভাবনীশক্তি মানুষকে অন্যান্য প্রাণী থেকে স্বাতন্ত্র্য করে তুলেছে। আর মানুষের সৃষ্টিশীলতার সীমা আকাশ ছুঁয়েছে। সব মিলিয়ে বলা যায় মানুষ তার আপন মহিমায় অনন্য। এর পরেও মানুষ হবার সবচে বড় মাপকাঠি হলো—মানুষ কতটুকু মনুষ্যত্ব অর্জন করেছে। আর এই অর্জনটা মানুষ কত মেধাবী, কত শক্তিশালী তার কোনোটা দিয়েই পরিমাপ করা যায় না। মনুষ্যত্বহীন মানুষ আর পশু সমান।

কতগুলো অনুপম মাপকাঠি যাকে মূল্যবোধ আর আচরণবিধি বলা যেতে পারে তা পশু আর মানুষের মাঝের পার্থক্যগুলোকে স্পষ্ট করেছে। পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র যাই বলি না কেন, মানুষকে এগুলো মেনে চলতে হয়। আর এগুলোকে আবর্তন করেই মানুষের ভবিষ্যত্ তৈরির পথ আলোকিত হয়। সহমর্মিতা, অনুকম্পা, সম্মান, ভালোবাসা, সহানুভূতির আলোতে ক্রোধ, ঘৃণা, হিংস্রতা, লোভ আর মনের মধ্যকার অন্ধকারকে দূর করার মাঝেই মনুষ্যত্ব নিহিত। ভালো আর মন্দ, সততা আর শঠতা, সভ্যতা আর অন্ধকার এসবকে বিচার করতে না পারলে মানুষ আর মানুষ থাকে না, মানুষে আর পশুতে কোনো ফারাক থাকে না। বিবেক বা এসব বিচার করবার শক্তিই মানুষকে মনুষ্যত্বের সন্ধান দিতে পারে।

আমরা এক বিভীষিকাময় বর্তমান পাড়ি দিচ্ছি। বিজ্ঞানের অনন্ত অগ্রগতির মাঝে আমরা পাশবিকতা, অন্যায়, জুলুম, ঘৃণা, কদার্যতার এক মহাসাগরে হাবুডুবু খাচ্ছি এখন। আমাদের মনুষ্যত্ব বারবার ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে, হার মানছে অসংখ্য হিংস্রতার আঘাতে। এই অন্ধকার দূর করে শ্রেষ্ঠ জীব হিসেবে বহু বছরের অর্জিত বিজয় ধরে রাখায় একনিষ্ঠ প্রত্যয়কে সামনে নেওয়াই এখন আমাদের একমাত্র ব্রত হওয়া উচিত।

মানুষ চাইলেই মানুষ হতে পারে না। মানুষ হবার জন্য যে দীর্ঘ ও পরিশ্রমী সাধনা রয়েছে তা আমাদের অহর্নিশি চালিয়ে যেতে হবে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অমোঘ বাণীটি যেন আমরা বিস্মৃত না হই। তিনি বলেছেন—‘বিশ্ববিধাতা সূর্যকে অগ্নিশিখার মুকুট পরিয়ে যেমন সৌরজগতের অধিরাজ করে দিয়েছেন, তেমনি মানুষকে যে তেজের মুকুট তিনি পরিয়েছেন দুঃসহ তার দাহ। সেই পরম দুঃখের দ্বারাই তিনি মানুষকে রাজগৌরব দিয়েছেন; তিনি তাকে সহজ জীবন দেননি। সেইজন্যেই সাধন করে তবে মানুষকে মানুষ হতে হয়; তরুলতা সহজেই তরুলতা, পশুপক্ষী সহজেই পশুপক্ষী, কিন্তু মানুষ প্রাণপণ চেষ্টায় তবে মানুষ।’ একটা সুন্দর বাসযোগ্য পৃথিবীর জন্য আমাদের মানুষ হবার কঠিন যুদ্ধ চালিয়ে যেতেই হবে।

n লেখক : প্রবাসী লেখক, বিজ্ঞানী