প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ এখন বিশ্বব্যাপী একটা সমস্যা। শ্রীলঙ্কার মতো বাংলাদেশেও জঙ্গি ও সন্ত্রাসী হামলা চালানোর অনেক চেষ্টা চলেছে। তবে আমাদের গোয়েন্দা সংস্থা এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যথেষ্ট তত্পরতা ও সতর্কতা অবলম্বন করায় তা ব্যর্থ হয়েছে। দেশবাসীকেও এ ব্যাপারে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘কে কোথায় সন্ত্রাসী-জঙ্গিবাদি কর্মকাণ্ডের সঙ্গে লিপ্ত সেটা শুধু গোয়েন্দা সংস্থাই নয়, আমাদের দেশবাসীকেও সতর্ক থাকতে হবে এবং এদের খুঁজে বের করে সঙ্গে সঙ্গে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাকে জানাতে হবে। আমরা দেশে শান্তি চাই। শান্তিপূর্ণ পরিবেশ হলেই দেশ এগিয়ে যাবে।’ গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ঢাকা-রাজশাহী রুটে বিরতিহীন আন্তঃনগর ট্রেন ‘বনলতা এক্সপ্রেস’র উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদকে উন্নয়ন-অগ্রগতির অন্তরায় এবং একটি বৈশ্বিক সমস্যা আখ্যায়িত করে এর বিরুদ্ধে সকলকে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, মাত্র কয়েকদিন আগেই শ্রীলঙ্কায় যে ঘটনা ঘটল-সবচেয়ে দুর্ভাগ্য অনেকগুলো শিশু সেখানে মারা যায়। বাংলাদেশের শিশু জায়ান চৌধুরীকে (আওয়ামী লীগ প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম এমপির নাতি) হারাতে হয়েছে এই জঙ্গি সন্ত্রাসীদের কর্মকাণ্ডের কারণে। বাংলাদেশেও এই ধরনের ঘটনা ঘটানোর অনেক চেষ্টা চলছে। তবে আমাদের গোয়েন্দা সংস্থা এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করে যাচ্ছে। এ সময় পাঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের কালোরাতের কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সে সময় বিদেশে থাকায় আমরা দু বোন প্রাণে বেঁচে গেলেও সেদিন বঙ্গবন্ধু পরিবারের আর কেউ বাঁচেনি। শেখ ফজলুল হক মনির ছোট ভাই শেখ ফজলুল করিম সেলিমের মেয়ের প্রথম সন্তান এই জায়ান। তাঁকে এভাবে আজকে জীবন দিতে হলো। আমরা চাই না এ ধরনের কোনো শিশুর মৃত্যু।
আন্দোলনের নামে বিএনপি-জামায়াতের ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, রেলের নতুন নতুন বগি কিনেছি সেগুলো আগুন দিয়ে পুড়িয়েছে। বাস কিনেছি, সেগুলো পুড়িয়েছে। তাছাড়া প্রাইভেট গাড়ি, বাস, ট্রাক, লঞ্চ এমন কিছু নেই যা অগ্নি সন্ত্রাসের কবলে ধ্বংস হয়নি। সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ মানুষের জীবনও। ছোট শিশু, নারী, পুরুষ, অন্তঃসত্ত্বা মহিলা কেউ তাদের হাত থেকে রেহাই পায়নি। বাবা দেখেছে চোখের সামনে ছেলে পুড়ে যাচ্ছে, স্ত্রী দেখেছে চোখের সামনে স্বামী পুড়ে মারা যাচ্ছে, মা দেখেছে ছেলে বা কন্যা পুড়ে যাচ্ছে- এই রকম ভয়াবহ চিত্র আমরা বাংলাদেশে দেখেছি। আমরা চাই না এ জাতীয় ঘটনা বাংলাদেশে আর ঘটুক। ইসলামকে শান্তির ধর্ম হিসেবে আখ্যায়িত করে একযোগে সারা দেশের সব মসজিদে জুমার খুতবায় সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে মানুষকে সচেতন করতে ইমামদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ধর্মের নামে যারা সন্ত্রাস করে, হত্যা করে তারা মানুষের ঘৃণা-অভিশাপ ছাড়া কিছু পায় না। জুমার খুতবায় সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে কুরআন-হাদিসের আলোকে আলোচনা করবেন। আজ শুক্রবার প্রতিটি মসজিদে শ্রীলঙ্কার এই বোমা হামলা এবং জায়ান চৌধুরীর নিহত হওয়ার ঘটনায় এবং এর আগে নিউজিল্যান্ডের দুটি মসজিদে গুলি চালিয়ে মুসলমানদের হত্যার ঘটনায় আপনারা দোয়া কামনা করবেন।
যমুনা নদীর ওপর বঙ্গবন্ধু সেতুতে নতুন করে আরেকটি রেল সংযোগ করে দেওয়ার বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে বিশ্বব্যাংক। এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যমুনা নদীর ওপর বঙ্গবন্ধু সেতুতে রেল সংযোগ দিতে গিয়ে যাদের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি আমাকে কথা বলতে হয়েছিল, সেটা হলো বিশ্বব্যাংক। আর তারা এখন আমাদের নতুনভাবে প্রস্তাব দিয়েছে, সেতুর সঙ্গে যে রেল আছে, সেটা ছাড়াও আলাদা করে একটা রেল সেতু যমুনা নদীর ওপর করে দিতে চায়। এত দিন পরে তারা বুঝল যে এটার প্রয়োজন কত বেশি।’
রাজশাহী-ঢাকার মধ্যে প্রথম বিরতিহীন ট্রেন ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ নাম দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নিজেই। হুইসেল বাজিয়ে এবং সবুজ পতাকা উড়িয়ে ট্রেনটির আনুষ্ঠানিক যাত্রা ঘোষণা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আসন্ন ঈদ ও রাজশাহীর আমের কথা মাথায় রেখে এ সময়ে ট্রেনটির উদ্বোধন করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মো. মাহবুব আলী, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক এ সময় গণভবন প্রান্তের মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব মো. নজিবুর রহমান ভিডিও কনফারেন্স সঞ্চালনা করেন। রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশন প্রান্তে ভিডিও কনফারেন্সে রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন এবং রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন বক্তৃতা করেন।
প্রধানমন্ত্রীর সাংবাদিক সম্মেলন আজ
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ শুক্রবার বিকাল ৪টায় সাংবাদিক সম্মেলনে বক্তব্য রাখবেন। সদ্য সমাপ্ত ব্রুনাই দারুসসালামে তিন দিনের সরকারি সফরের অর্জন ও সফলতা তুলে ধরতে গণভবনে এই সাংবাদিক সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে। লিখিত বক্তব্যের পর সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দিবেন প্রধানমন্ত্রী। ব্রুনাইয়ের সুলতান হাজি হাসানাল বলকিয়ার আমন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী ২১ থেকে ২৩ এপ্রিল ব্রুনাই সফর করেন।
অধিক হারে খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প স্থাপনের ওপর গুরুত্বারোপ
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ-বিদেশের বাড়তি চাহিদার কথা বিবেচনা করে দেশে অধিকহারে খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প কারখানা স্থাপনের ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেছেন, সরকার গঠন করার পর থেকেই ব্যাপকভাবে বেসরকারি খাতকে আমরা উন্মুক্ত করে দিয়েছি এবং সারাদেশে একশটি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলছি। সেই সঙ্গে প্রতিটি এলাকায় খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে তোলার নির্দেশ দিয়েছি। গতকাল বৃহস্পতিবার গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ৭টি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতাধীন ইনস্টিটিউট এবং স্থাপনার উদ্বোধনকালে তিনি একথা বলেন।
উদ্বোধনকৃত ইনস্টিটিউট এবং স্থাপনাগুলো হচ্ছে- মত্স্য ডিপ্লোমা ইনস্টিটিউট, গোপালগঞ্জ, মত্স্য ডিপ্লোমা ইনস্টিটিউট, কিশোরগঞ্জ, মত্স্য ডিপ্লোমা ইনস্টিটিউট, বেলকুচি, সিরাজগঞ্জ, জাতীয় প্রাণিসম্পদ ও পোল্ট্রি ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউট এবং আঞ্চলিক রোগ অনুসন্ধান গবেষণাগার, গোপালগঞ্জ, হ্যাচারিসহ আঞ্চলিক হাঁস প্রজনন খামার, কোটালিপাড়া, গোপালগঞ্জ, সরকারি ভেটেরেনারি কলেজ, বেলকুচি, সিরাজগঞ্জ এবং মাল্টি চ্যানেল স্লিপওয়ে ডকইয়ার্ড, মত্স্য বন্দর, চট্টগ্রাম।
তিনজনকে প্রধানমন্ত্রীর ৬৭ লাখ টাকা অনুদান
দুইজন বীর মুক্তিযোদ্ধাসহ তিনজনকে ৬৭ লাখ টাকা অনুদান দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল সন্ধ্যায় জাতীয় সংসদ ভবনে তাদের হাতে অনুদানের চেক তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী। এর মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা ও মুজিবনগর সরকারের কর্মচারী মো. ইয়াকুব হোসেন খানকে ২৫ লাখ টাকা এবং মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ মোহাম্মদ ইমরানকে ১০ লাখ টাকার চেক দেওয়া হয়। তাদের দু’জনকেই চিকিত্সার জন্য এই অর্থ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধা মতিয়ার রহমানের স্ত্রী শিরিনা রহমানকে দেওয়া হয়েছে ৩২ লাখ টাকা। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ক্যান্সারে ভুগছেন।