ধরা যাক, ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির দিন গুলি চলল না, রক্তঝরার ঘটনা ঘটল না। কল্পবিজ্ঞানে যেমনটি দেখা যায়, তেমনই এক টাইম মেশিনে করে পাকিস্তানপ্রেমী বিশেষ কেউ গিয়ে তত্কালীন পাকিস্তানি শাসকদের বলল, ‘তোমরা করছটা কী? এই একটা ঘটনা তোমার দেশকে ভেঙে পূর্ব-পশ্চিম আলাদা করে দেবে। সাবধান হও। আমি ভবিষ্যৎ পৃথিবীতে গিয়ে দেখে এসেছি, তোমরা মারাত্মক ভুল করছ।’ এ কথা শুনে পাকিস্তানি শাসকরা ১৪৪ ধারা তুলে নিল।
একুশেতে রক্ত ঝরার পর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী যা যা মেনে নিয়েছিল তা-ই তা-ই রক্তঝরার আগেই মেনে নিল। তারা বুঝতে পারল, খুব বড় ভুল হয়ে যাচ্ছিল। সুতরাং ২১ ফেব্রুয়ারির রক্তঝরার আগেই তারা বলল, ‘তাই তো, তোমরা বাঙালিরা সংখ্যায় সংখ্যাগুরু। সুতরাং শুধু উর্দু তো রাষ্ট্রভাষা হতেই পারে না। উর্দুর পাশাপাশি বাংলাও রাষ্ট্রভাষা হবে।’ অর্থাৎ পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী আটচল্লিশ থেকে বাহান্ন পর্যন্ত ভাষা নিয়ে যা যা ভুল করেছে, তার কিছুই করল না। এবং এসব ভুল না করলে পরের ভুলগুলোও করার সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে যায়। অর্থাৎ বিকাশ ঘটল না বাঙালি জাতীয়তাবাদেরই। তখন কী হতো? একাত্তরে স্বাধীনতাযুদ্ধ কি হতো?
বড় প্রশ্ন বটে। তবে একুশের ঘটনা না ঘটলে কী হতে পারত এবং ঐ একটা ভুল না করলেও আর কী কী ভুল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী করত—তা গবেষণা করে বের করা খুব সহজ নয়। তার কারণ, তারা তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষকে পুরোপুরি মানুষই মনে করত না। পূর্ব বাংলার লোককে ভীষণ হীনচোখে দেখত, মনে করত—এদের কোনো শিক্ষা, সংস্কৃতি, আভিজাত্য নেই; এমনকি এরা সাচ্চা মুসলমান না, হিন্দুয়ানি মুসলমান। আমরা এর কিছুটা আগের ইতিহাসের দিকে দৃষ্টিপাত করতে পারি।
সাতচল্লিশে দেশভাগের পর তত্কালীন পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার ৫৬ শতাংশ জনগণের মাতৃভাষা ছিল বাংলা। আর উর্দুভাষীরা ছিল তত্কালীন নিখিল পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার শতকরা মাত্র ৭ ভাগ। কিন্তু শাসকরা ছিল প্রধানত উর্দুভাষী আর প্রশাসনের উচ্চপদস্হরাও উর্দুভাষী। এই দ্বিমুখী ক্ষমতার খেয়ালিপনায় নতুন রাষ্ট্রের রাষ্ট্রভাষা প্রসঙ্গকে অমীমাংসিত রেখেই উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ভুল চেষ্টা শুরু করা হয়। কোনো রকম নীতি নির্ধারণ না করেই তারা পূর্ব পাকিস্তানে টাকা, মনি-অর্ডার ফরম, ডাকটিকিট, রেল-লঞ্চ-স্টিমারের টিকিট ইত্যাদিতে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দু আর আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবে ইংরেজি ভাষা ব্যবহার করতে থাকে। সংখ্যাগুরু বাংলাভাষীর কাছে যাচ্ছে সংখ্যালঘুর উর্দু, বাংলা সেখানে অনুপস্হিত।
সুতরাং পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকরা তাদের জাত্যভিমান এবং একরোখা নীতির কারণে একের পর এক ভুল করতই। বাহান্ন তথা একুশের ভাষা আন্দোলন তো শুধু ভাষাকেন্দ্রিক নয়। প্রধানত চারটি স্লোগানের ভিত্তিতে প্রকাশ পেয়েছিল এ আন্দোলন। স্লোগান চারটি হচ্ছে—‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’, ‘রাজবন্দীদের মুক্তি চাই’, ‘শহীদ স্মৃতি অমর হোক’ এবং ‘সর্বস্তরে বাংলা চালু কর’। স্পষ্টতই এই আন্দোলনের নেপথ্যে ছিল রাজনীতি, অর্থনীতি, বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি। এজন্য একুশের প্রতিটি স্লোগান বাঙালি জাতিগোষ্ঠীর জন্য তাত্পর্যমণ্ডিত। এই চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়েই ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ছয়দফা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন এবং ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধে জয়লাভ বাংলার জনগণের পক্ষে সম্ভব হয়েছিল। একুশের আন্দোলনের সুদূরপ্রসারি ফল কেবল আমরা একা পাইনি, একুশে এখন সমস্ত পৃথিবীর মানুষের জন্য এক অপূর্ব অনুপ্রেরণার নাম। একুশে এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জাতিরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাই হয়েছে সেই জাতির মাতৃভাষাকে রাষ্ট্রভাষা ও জাতীয় জীবনের ভাষা হিসেবে গ্রহণ ও জীবিকার সঙ্গে যুক্ত করার মাধ্যমে। সেই সূত্রে মাতৃভাষার উন্নতি ও শ্রীবৃদ্ধি তাদের গর্ব ও অহংকারের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। এই চিত্র আমরা দেখতে পাই যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি এবং চীন-জাপানের মতো রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে। সুতরাং ভাষাভিত্তিক জাতিরাষ্ট্র গঠন করাটা আমাদের জন্যও নিঃসন্দেহে বিশাল এক শক্তি। তবে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে এসে এ কথাটা বিশেষভাবে বলা দরকার যে, ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত পাকিস্তান আমলে তত্কালীন পূর্ব বাংলায় পাকিস্তানি ভাবাদর্শকে পরাজিত করা সম্ভব হলেও আমরা এখন দেখতে পারছি সেই ভাবাদর্শ সম্পূর্ণরূপে নির্মূল হয়নি। সুতরাং একুশের আরেক ধরনের সংগ্রাম এখনো অব্যাহত আছে। আশার কথা এই যে, আমাদের অস্থিমজ্জায়, ভাষায়, সংস্কৃতিতে এবং ইতিহাসে একুশের ভাষা-চেতনা গাঢ় হয়ে মিশে আছে। একুশের মধ্যেই বাঙালির জাতীয় চেতনা ও আবেগ এখনো প্রচণ্ড শক্তিরূপে বিরাজিত। একটি মানবিক, অসাম্প্রদায়িক ও কল্যাণকর রাষ্ট্র গঠনে এই শক্তিকে আমাদের কাজে লাগাতেই হবে।
[লুইজিয়ানা, যুক্তরাষ্ট্র]