এত বেশি সুদে ঋণ নিয়ে ব্যবসা করা সম্ভব নয় :অর্থমন্ত্রী

অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেছেন, ব্যাংকিং খাতের অবস্থা খুব ভালো আছে এটা বলব না, তবে খুব খারাপ অবস্থায় রয়েছে এটাও বলা যাবে না। এই খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে হবে। তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাতে সুদ হার অনেক বেশি। এত সুদে ব্যবসা করা সম্ভব নয়। পৃথিবীর কোনো দেশে ১৫, ১৬, ১৭ শতাংশ সুদ নেই। এত সুদে ঋণ নিয়ে বিনিয়োগকারীরা ব্যবসা করতে পারেন না। আমরা সুদ হারকে যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনব। এই হার এমন হবে যাতে সবাই উপকৃত হয়। যারা আমানত রাখেন তারাও যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সে বিষয়টিও দেখা হবে।

গতকাল বৃহস্পতিবার শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে প্রাক বাজেট আলোচনায় অর্থমন্ত্রী এ কথা বলেন। দেশের এনজিও প্রতিনিধি, ইলেক্ট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার সম্পাদক ও সাংবাদিকবৃন্দের সঙ্গে প্রাক বাজেট আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। অর্থসচিব আব্দুর রউফ তালুকদার অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন। আলোচনায় অর্থমন্ত্রী বলেন, আগামী অর্থবছরের বাজেটে পুঁজিবাজারের জন্য কিছু না কিছু প্রণোদনা থাকবে। দেশের শেয়ারবাজারে এখন দুটি পক্ষ রয়েছে। একটি পক্ষের অবস্থা সিংহের মতো আরেকটি পক্ষের অবস্থা ছাগলের বাচ্চার মতো। তারা কিভাবে প্রতিযোগিতা করবে? আমার ভয় হয়, এ মুহূর্তে পুঁজিবাজারে ৫০ কোটি নয়, যদি ৫০ হাজার কোটি টাকাও দেওয়া হয় তাহলেও হারিয়ে যাবে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, না বুঝে এই বাজারে বিনিয়োগ করা ঠিক নয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পুঁজিবাজারে পতনের পর ঘুরে দাঁড়াতে ত্রিশ বছর সময় লেগেছে। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, হংকং, কোরিয়া, মালয়েশিয়ার মতো দেশে পুঁজিবাজার ঘুরে দাঁড়াতে ত্রিশ বছর সময় লেগেছে। আমাদের মাত্র দশ বছর পার হলো। এখনো বিশ বছর সময় হাতে আছে। তিনি বলেন, আমরা পুঁজিবাজার নিয়ে আর গালিগালাজ শুনতে চাই না। এখন ব্যবস্থা নেবো। পুঁজিবাজারের উন্নতি ছাড়া কোনো দেশ উন্নত হয়নি। আমার উপর আস্থা রাখুন।

ব্যাংকিং খাতের বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, খেলাপি ঋণের বিপরীতে অনেক ব্যাংক কোনো উদ্যোগ নিতে পারছে না। মামলা করতে পারছে না। এসব বিষয়ে উদ্যোগ নিবে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি। ব্যাংক ঋণে সুদের হার বেশি। মন্ত্রী বলেন, আমার উপর বিশ্বাস রাখুন। অসততা আমাকে স্পর্শ করেনি, করবেও না। সাধারণ মানুষের প্রতি আমার দায়বদ্ধতা রয়েছে। ব্যবসায়ীদের নিয়েই আমাদের চলতে হবে। ব্যবসায়ী ছাড়া বিনিয়োগ কী করে হবে, কর্মসংস্থান কি করে হবে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের ৪ কোটি মানুষ কর দেওয়ার যোগ্য হলেও  কর দেয় মাত্র ২৯ লাখ। যারা আয়কর দেয় তারা শুধু কর দেবে, আর যারা কর দেয় না তারা দেয়ই না। এজন্য ভ্যালু এ্যাডেড ট্যাক্স নির্ধারণ করা হবে। আগামী বাজেটে সঞ্চয়পত্রের সুদে পরিবর্তন হবে না উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, আমরা চাই যারা প্রকৃত অর্থে সঞ্চয়পত্রের সুবিধা পাওয়ার যোগ্য তারাই পাক। কিন্তু লক্ষ্যের তুলনায় সঞ্চয়পত্র বহুগুণে বেড়ে গেছে। এই খাতে যারা অর্থবিনিয়োগ করছে তাদের অর্থের উত্স জানা উচিত। তিনি বলেন, আগামী ৫ থেকে ১০ বছর দেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এসময় হাজার হাজার শিল্প স্থাপন হবে। আগে অবকাঠামোর সমস্যা ছিল এখন সেটি কেটে গেছে।

আলোচনায় অংশ নিয়ে দৈনিক প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান বলেন, সংবাদপত্রের পাঠক সংখ্যা ক্রমেই কমে আসছে, বিজ্ঞাপন কমে আসছে। এর ফলে আয়ও কমে যাচ্ছে। অনলাইনেও আয় তেমন নেই। সংবাদপত্র প্রকাশে বিভিন্ন খাতে ব্যয় বাড়ছে। ভ্যাট আইনে সংবাদপত্রে ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া আছে। এরপরেও এ খাতে ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট আদায় করা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এ কর প্রত্যাহার করতে হবে। এই শিল্পে করপোরেট ট্যাক্স কমানোর প্রস্তাব করেন তিনি। সাংবাদিকদের বাড়িভাড়া হিসেবে পরিশোধিত অর্থেও শতভাগ করমুক্ত রাখার দাবি জানান তিনি। দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনের সম্পাদক নঈম নিজাম বলেন, কিছু মানুষ ঋণের নামে লুটপাট করছে। খেলাপিরা মাফ পেয়ে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

এছাড়াও প্রাক বাজেট আলোচনায় অংশ নেন প্রধানমন্ত্রীর সাবেক তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা আব্দুল্লাহ আবু সাঈদ, সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী, ডরপ এর চেয়ারম্যান মো. আজহার আলী তালুকদারসহ বিভিন্ন এনজিও প্রতিনিধিরা।