রাজধানী মিরপুর সাড়ে ১১-এর বাসিন্দা রুবাইয়া জামান। ২০২০ সালের আগস্ট মাসে তার স্বামীর চাকরি চলে যায়। স্বামীর ৮০ হাজার টাকা বেতনের চাকরি হটাৎ চলে যাওয়ায় তাদের পরিবার পড়ে মহাবিপদে। পরিবারে বৃদ্ধ শ্বশুর-শাশুড়ি, ইংরেজিমাধ্যমে পড়া সন্তানসহ পরিবারের দায়িত্ব পালন করা স্বামীর জন্য দুরূহ হয়ে পড়ে। ঐ সময়ে চাকরি পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। ভরা করোনাকালে চাকরিদাতারাও বলতে থাকেন, ‘মহামারি চলে গেলে দেখা যাবে, এই মুহূর্তে লোক নেওয়া হচ্ছে না’। বাধ্য হয়ে সন্তানের লেখাপড়া বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন তারা। তখন রুবাইয়া অনলাইনে পেজ খুলে নারীদের পণ্যসামগ্রী বিক্রি শুরু করেন। মাত্র চার/পাঁচ মাসের ব্যবধানে রুবাইয়ার ব্যবসা বাড়তে শুরু করে।
বৈশ্বিক মহামারিতে রুবাইয়ার মতো অনেকে উদ্যোক্তা হয়ে উঠেছেন। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলেই যার প্রমাণ মেলে। বাংলাদেশে অফলাইন কিংবা অনলাইন, দুই শাখায়ই বেড়েছে নারী উদ্যোক্তার সংখ্যা। বিশেষ করে অনলাইন ব্যবহার করে অনেকে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করছেন। করোনাকালে চারদিকে যখন লকডাউন চলছিল, অনেকে চাকরি হারিয়ে দিশেহারা, তখন ঘরে বসে পরিবারের নারী সদস্য হয়ে যান উদ্যোক্তা। আর করোনাকালে লেখাপড়া, ব্যবসা-চাকরি সব ক্ষেত্র হয়ে গেছে অনলাইন নির্ভর। ফলে ঘরে ঘরে তৈরি হয়েছে নারী উদ্যোক্তা। সব মিলিয়ে এখন একটা কম্পিউটার বা মোবাইল দিয়ে ইন্টারনেটের মাধ্যমে ঘরে বসেই করা যাচ্ছে ব্যবসা। এতে করে ই-কমার্সের ঘটেছে ব্যাপক প্রসার। যে কারণে আইটি ক্ষেত্রেও বাড়ছে নারীর অংশগ্রহণ। মাহবুবা আক্তার নামে আরেক উদ্যোক্তা জানান, ‘আগে কেবল ফেসবুক খুলে পোস্ট দেওয়া, লাইক দেওয়া কিংবা মন্তব্য লেখায় মধ্যে ছিল আমার আইটি সেক্টরের জ্ঞান। কিন্তু এখন অনলাইনে ব্যবসা করতে গিয়ে কতকিছু যে শিখেছি, নিজেই বলতে পারব না। কাজের প্রয়োজনে, রাত জেগে প্রশিক্ষণ নিয়েছি আইটির অনেক বিষয়ে। ’
উইমেন অ্যান্ড ই-কমার্স ফোরাম (উই)-এর প্রেসিডেন্ট নাসিমা আক্তার নিসা বলেন, চলমান করোনাকালে ই-কমার্সে নারী উদ্যোক্তার সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ঘরে বসে আয় করা যায় বলে নারীদের কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য অনলাইন বিজনেস। করোনাকালে অনেক নারী ই-কমার্সে যুক্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে সচেতনতাও বেড়েছে। চ্যালেঞ্জও মোকাবিলা করছেন। তিনি বলেন, ২০১৭ সালে উমেন অ্যান্ড ই-কমার্স ফোরাম (উই)-এর যাত্রা শুরু। বর্তমানে এর সদস্য সংখ্যা ১১ লাখ ২১ হাজার। এদের মধ্যে নারী উদ্যোক্তা ৪ লাখ। আর এসব নারী উদ্যোক্তাদের অধিকাংশই আত্মপ্রকাশ করেছে করোনাকালীন সময়ে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, এক দশকের ব্যবধানে নারী উদ্যোক্তা দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির হোলসেল অ্যান্ড রিটেইল ট্রেড সার্ভে-২০২০-এর জরিপ ফল প্রকাশ করে বলা হয়েছিল যে, ২০১৯-২০ অর্থ বছরে নারী উদ্যোক্তার সংখ্যা ছিল দুই লাখেরও বেশি যা ২০০২-০৩ অর্থ বছরে ছিল মাত্র ২১ হাজার। এ ছাড়াও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক ব্যবহার করে ব্যবসা করছেন আরো কয়েক লাখ উদ্যোক্তা।
সরকারি ও বেসরকারি গবেষণার বিভিন্ন তথ্য মতে, দেশে প্রায় তিন দশক আগে তথ্যপ্রযুক্তির যাত্রা শুরু হলেও আইটি পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে শীর্ষ পর্যায়ে নারীর অবস্থান এক শতাংশের নিচে। তবে করোনার কারণে এ ক্ষেত্রে ঘটেছে বিপ্লব। সরকারি হিসাবে, তথ্যপ্রযুক্তিতে কর্মক্ষেত্রে ১২ শতাংশ নারী কাজ করছেন। তার মধ্যে অধিকাংশই প্রাথমিক বা মধ্যম পর্যায়ের কাজ করেন। ‘বিজনেস প্রসেস আউটসোর্স-বিপিও’ তথ্যমতে, শিল্পে দেশে ৪০ শতাংশ নারী কাজ করছেন। বিশ্বব্যাপী বিপিও শিল্পের ৮ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকার বাজারে বাংলাদেশের দখলে ৩ হাজার ৪০০ কোটি টাকা।
মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ফজিলাতুন নেসা ইন্দিরা বলেছেন, দেশের নারীরা তাদের মেধা প্রজ্ঞা ও সৃজনশীলতা এবং তথ্য প্রযুক্তির দক্ষতার মাধ্যমে ই-কমার্সে বিপ্লব সৃষ্টি করেছেন। করোনা পরিস্থিতির মধ্যে তারা ঘরে বসে ক্ষুদ্র পরিসরে উদ্যোক্তা হয়ে উঠেছেন। সরকারের ডিজিটাল সেবার বিপ্লবের কারণে অনলাইনে নারীরা এখন ব্যবসার দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন।