কর্মীদের উদ্দীপনা বেসরকারি ব্যাংক উন্নয়নে চালিকাশক্তি

বাংলাদেশ ব্যাংকের ইতিহাসে এই প্রথম বেসরকারি ব্যাংক কর্মীদের বেতন-ভাতা ও চাকুরির নিরাপত্তা নিয়ে নির্দেশনা প্রদান করল যা কর্মীদের মধ্যে এক ধরনের আশার সঞ্চার করেছে। বেসরকারি ব্যাংকের সাধারণ কর্মীদের নিয়ে কথা বলার কোন প্লাটফর্ম নেই। এসব ব্যাংকের কর্মীদের বেতন ভাতা, পদোন্নতী, চাকরীচ্যুত ইত্যাদি সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের নির্বাহী ও মালিক পক্ষের উপর নির্ভর করে। আবার বিভিন্ন ব্যাংকের বেতন, পদোন্নতি কাঠামো ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধাও ভিন্ন ভিন্ন। সাধারণ ব্যাংকারদের কোন সংগঠন না থাকার ফলে সুযোগ সুবিধা নিয়ে দর কষাকষি করার সুযোগ নেই। তাই কর্মীদেরকে সব নিয়ম ও অনিয়ম মেনে নিতে হয়।

বিভিন্ন তথ্য থেকে জানা যায়, করোনাকালীন সময়ে বেসরকারি ব্যাংকের তিন হাজারের বেশি কর্মী চাকরি হারিয়েছেন। আবার অনেক ব্যাংকে বেতন ভাতা হ্রাস করা হয়েছিল। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে চাকরীচ্যুত বা পদত্যাগে বাধ্য করা কর্মকর্তাদের পুনঃনিয়োগের নির্দেশ দিয়ে এক সার্কুলার জারি করেছে। ব্যাংকারদের সর্বনিম্ন বেতন ২৮ হাজার টাকা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। ২০১৩ সালে লাইসেন্সপ্রাপ্ত চতুর্থ প্রজন্মের ব্যাংক ও পরে স্থাপিত ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক এবং আইসিবি ইসলামী ব্যাংকের এন্টিÌ লেভেলে নিযুক্ত জেনারেল সাইডের কর্মকর্তাদের ন্যুনতম বেতন-ভাতাদি হবে ৩৯ হাজার টাকা। এছাড়া ক্যাশ সাইডের কর্মকর্তাদের বেতন হবে ৩৬ হাজার টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, এর মধ্যে মূল বেতন আগামী এপ্রিল থেকে দিতে হবে। এবং অবশিষ্ট ভাতাদি দিতে হবে পরের বছরের অর্থাৎ ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক চাইলে চলতি এপ্রিল মাস থেকেই বেতন ও ভাতা দিতে পারবে।

এই ব্যাংকগুলোতে শিক্ষানবিস হিসেবে কর্মরত এন্টিÌ লেভেলের জেনারেল পদে কর্মরত কর্মকর্তাদের বেতন হবে সর্বসাকুল্যে ২৮ হাজার টাকা। এছাড়া ক্যাশ সাইডের কর্মকর্তাদের বেতন হবে ২৬ হাজার টাকা। এতে আরও বলা হয়, নতুন নির্ধারিত বেতন এবং বর্তমানে প্রাপ্ত সাকুল্য বেতনের সঙ্গে যে পার্থক্য হবে তার ন্যুনতম ৫০ শতাংশ চলতি এপ্রিল হতে দিতে হবে। আর বাকি ৫০ শতাংশ ২০২৩ এপ্রিল হতে দিতে হবে। অবশ্য চাইলে চলতি বছরের এপ্রিল থেকে এই সকল বেতন-ভাতাদি প্রদান করতে পারবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার আরও বলা হয়, ম্যাসেঞ্জার বা পরিচ্ছন্নতাকর্মী বা নিরাপত্তা কর্মী বা অফিস সহায়ক অথবা সমজাতীয় পদে সর্বনিম্ন যেকোনও পদে নিয়মিত বা চুক্তিভিত্তিক বা দৈনিক ভিত্তিতে নিয়োগকৃত কর্মচারীদের বেতন সব বিভাগীয় শহর, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর শহর এলাকায় কর্মরত কর্মচারীদের জন্য হবে ন্যূনতা বেতন ২৪ হাজার টাকা। অন্য জেলা শহরে কর্মরতদের জন্য হবে ন্যুনতম বেতন ২১ হাজার টাকা। এছাড়া অন্যান্য উপজেলায় কর্মরতদের ন্যূনতা বেতন-ভাতা হবে ১৮ হাজার টাকা।

নিঃসন্দেহে এটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। তবে এটি বাংলাদেশ ব্যাংকের কাজ নয়। কারণ, বেসরকারি ব্যাংক নীতি অনুযায়ী তাদের মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা করবে, এতে কারও কিছু বলার থাকবে না, এমনকি কেন্দ্রীয় ব্যাংকেরও নয়। কিন্তু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যখন স্বাধীনভাবে কাজ করার নামে যা খুশি তাই করে, তখন কাউকে না কাউকে হস্তক্ষেপ করতে হয়। এটা বিশ্বের উন্নত-অনুন্নত সর্বত্রই হয়ে থাকে। তাছাড়াও বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের সমগ্র মুদিবাজার ও অর্থবাজারের অভিভাবক। এখানে কোনকিছু ঘটলে তাদেরকেই প্রথম দায়িত্ব নিতে এবং জবাবদিহি করতে হয়। সেই বিবেচনায় বাংলাদেশ ব্যাংক সঠিক কাজটিই করেছে।

বিগত তিন দশকে আমাদের দেশের ব্যাংকিং খাতে বিস্তর অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। দেশে বর্তমানে ৬১টি ব্যাংক চালু আছে যার মধ্যে ৪৩টি বেসরকারি যেখানে লক্ষাধিক মানুষ কর্মরত আছেন। কিন্তু এই খাতে সব ব্যাংকের মধ্যে সামঞ্জস্য ও সবার গ্রহণযোগ্য উন্নতমানের কোন চাকরিবিধি বা মানব সম্পদ নীতিমালা (এইচআর পলিসি) তৈরি হয়নি। একথা সত্যি যে, প্রতিটা ব্যাংকেই একটি করে এইচআর পলিসি আছে ঠিকই। 

তবে সেগুলোর মধ্যে খুব একটা সামঞ্জস্য নেই এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা বা বোর্ড চাইলে খুব সহজেই যেকোন সময় পরিবর্তন করতে পারে। ফলে এগুলো অনেক ক্ষেত্রেই সকল ব্যাংকের কর্মকর্তাদের স্বার্থ রক্ষা করতে পারে না। ব্যাংক একটি সম্পূর্ণ সেবামূলক প্রতিষ্ঠান এবং আর্থিক লেনদেনই হচ্ছে তার একমাত্র সেবা। দক্ষ ও বিশ্বস্ত পেশাদার ব্যাংকারের মাধ্যমে সন্তোষজনক সেবা প্রদান করেই একটি ব্যাংক সফল হতে পারে। আর চাকরির ন্যুনতম নিশ্চয়তা ব্যতিরেকে দক্ষ ও বিশ্বস্ত পেশাদার ব্যাংকার তৈরি করা সম্ভব নয়। 

যদি একজন ব্যাংকারকে বিনা কারণে চাকরি থেকে বিদায় করা হয়, তাহলে কর্মরত অন্য ব্যাংকারদের মাঝে চরম হতাশা ও অনিশ্চয়তা বিরাজ করে। হতাশায় ভুগে বা অনিশ্চয়তার মাঝে দাঁড়িয়ে ভাল সেবাও যেমন প্রদান করা যায় না, ঠিক তেমনি ব্যাংকের স্বার্থও রক্ষা করা সম্ভব হয় না। কেননা, এজন্য ব্যাংকারদের দায়িত্ব নিয়ে এবং ব্যাংকের প্রতি নিবেদিত হয়ে কাজ করতে হয়। আর এটা একজন ব্যাংকার তখনই করবেন, যখন তিনি তার চাকরির ন্যূনতা নিশ্চয়তাটুকু পাবেন।

উন্নত বিশ্বের প্রতিটি দেশেই ফেডারেল এইচআর আইন আছে এবং সেই সঙ্গে প্রতিটা ব্যাংকেরও নিজস্ব এইচআর বিধান রয়েছে। উভয় বিধানেই নির্ধারিত সময়ের নোটিস প্রদান করে যে কোন কর্মকর্তাকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কোন ব্যাংক কাউকে চাকরি থেকে বাদ দেওয়ার ঝুঁকি নেয় না। কারণ, ব্যাংকের এই ধরনের সিদ্ধান্ত আদালত পর্যন্ত গড়ায়। যেখানে অধিকাংশ সিদ্ধান্ত ব্যাংকের বিপক্ষে যায় এবং এজন্য সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে চড়া মূল্য দিতে হয়।

ব্যাংকাররা মনে করেন, সকল বেসরকারি ব্যাংক কর্মীদের সুযোগ সুবিধার মধ্যে সামঞ্জস্য থাকলে হতাশা ও ক্ষোভ হ্রাস পাবে। একথা সত্য যে,বেসরকারি ব্যাংক মানেই সেবার মান সহ বিভিন্ন বিষয়ে তীব্র প্রতিযোগিতা লক্ষ্য করা যায়। ব্যাংক কর্মীদের মধ্যে আর্থিক সুযোগ সুবিধার সামঞ্জস্য থাকলে অনৈতিক প্রতিযোগিতা হ্রাস পেতে পারে।