ছোটকাগজে বড় স্বপ্নের হাতছানি

ছোটকাগজ হিসেবে পরিচিতি পেলেও কাগজ কিন্তু ছোট নয়। বড় বড় সাহিত্যিক, কবি, দার্শনিকের জন্ম হয়েছে ছোটকাগজে লিখে। ব্যক্তিগত কিংবা ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর স্বতন্ত্র চিন্তাধারাকে প্রকাশের ইচ্ছা থেকেই লিটল ম্যাগাজিন বা ছোটকাগজের জন্ম। সংক্ষেপে একে অনেকেই ‘লিটল ম্যাগ’ও বলে থাকে। প্রতিটি বই প্রকাশের সঙ্গে যুক্ত থাকে লগ্নী, যুক্ত থাকে লেখকের নামের সঙ্গে বাজারে বিকোবার প্রশ্ন। এসবের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েই সৃষ্টি হয়েছে লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলন। বাংলা সাহিত্যের অনেক বড় লেখক উঠে এসেছেন এই লিটল ম্যাগাজিনে লেখার মধ্য দিয়ে।

শিল্প-সাহিত্যচর্চার বিকাশে লিটল ম্যাগাজিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। বুদ্ধিবৃত্তিক ও সৃজনশীল চর্চার সঙ্গে সম্পৃক্ত বিভিন্ন সংগঠন বা গোষ্ঠীর মুখপত্র হিসেবেও লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশ পেয়ে থাকে। দেশে ষাটের দশক থেকে একুশের চেতনাকে ধারণ করে লিটল ম্যাগাজিন চর্চা প্রসার লাভ করে। বিশিষ্ট কবি, লেখক, বুদ্ধিজীবীরা কোনো না কোনোভাবে একসময় ছোটকাগজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আশির দশকে বাংলাদেশে লিটল ম্যাগাজিন চর্চা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

ছোটকাগজকর্মীরা ইতিবাচক ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির নতুন ধারা, নতুন মত এবং মতবাদ চর্চা ও ঘোষণার ক্ষেত্রে ছোটকাগজ-সংশ্লিষ্ট মত ও ধারণার সপক্ষে অগ্রগামী ভূমিকা পালন করে থাকে।

প্রতি বছরই বইমেলায় লিটল ম্যাগাজিন চত্বরকে ঘিরে সারা দেশের লেখক-সাহিত্যিকদের আসর দেখা যায়। বইমেলাকে ঘিরে কিছু কিছু লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশও হয়। তার পরও আগের সেই প্রকাশের উচ্ছ্বাস যেন খঁুজে পাওয়া যায় না। তাহলে আধুনিকতার স্রোতে লিটল ম্যাগাজিন কি হারিয়ে যেতে বসেছে? এমন প্রশ্নের উত্তরে লেখকরা বলছেন, লিটল ম্যাগাজিন অনেক বের হচ্ছে এটা ঠিক। কিন্তু এই ম্যাগাজিনকে ঘিরে যে নতুন ভাবনা উঠে আসতে দেখা যেত সেটা এখন দেখা যাচ্ছে না। বরং লিটল ম্যাগাজিন হয়ে উঠেছে আত্মপ্রতিষ্ঠার মাধ্যম। অনেক সময় তা চরিত্র বদলে লাভজনক ব্যবসাতেও পরিণত হতে দেখা যাচ্ছে।

অপরদিকে, সামাজিক মাধ্যমে যোগাযোগ সহজ হয়ে যাওয়ায় অনেকেই বিভিন্ন গ্রুপে নিজেদের লেখা পোস্ট করছেন। এর ফলে, ছোটকাগজ প্রকাশের আগ্রহ কমে আসছে। পত্রিকা প্রকাশ করে তা চিন্তাশীল মানুষের হাতে পৌঁছানোর যে কষ্টকর পথ, সেখান থেকে মুক্তি দিচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো।

এ প্রসঙ্গে নব্বইয়ের দশকের বিশিষ্ট ছোটকাগজ ‘প্রতিশিল্প’র অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, কবি সৈকত হাবিব বলেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সবকিছু বদলায়। আমাদের বদলের ইতিবাচক দিকটি গ্রহণ করতে হবে। প্রকাশনা যখন সহজ হয়ে এলো তখন লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশের মাত্রাও বাড়তে দেখা গেছে। তখন অনেক বাজে লেখাও ছাপা হওয়া শুরু হয়েছে। এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম যখন মানুষকে কাছাকাছি নিয়ে আসছে তখন তাকে অবলম্বন করেও লিটল ম্যাগাজিন ‘ধারণা’ বেড়ে উঠতে পারে। এতে কোনো ক্ষতি নেই। বরং বেশি মানুষের কাছে নিজের ভাবনাকে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে।

দেখা যাচ্ছে, লিটল ম্যাগাজিনের নামে যেসব প্রকাশনা বেরোচ্ছে সেগুলো প্রধানত সংকলন। আবার বিভিন্ন লেখকের নামে বিশেষ সংখ্যা প্রকাশের প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে। এসব প্রকাশনাকে লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশনা হিসেবে দেখানো হচ্ছে। কিন্তু এসব প্রকাশনা কোনোভাবেই ‘লিটল ম্যাগ’ নয়।

কবি সৈকত হাবিব বলেন, ভালো মানের লিটল ম্যাগাজিনের খুব অভাব। সুন্দর ছাপা, ডিজাইন দেখা যাচ্ছে। কিন্তু নতুন নতুন চিন্তা নিয়ে কাউকে উঠে আসতে দেখা যাচ্ছে না।

এ প্রসঙ্গে কবি, প্রাবন্ধিক পিয়াস মজিদ বলেন, আমরা লিটল ম্যাগাজিন আর সংকলন বা বিশেষ সংখ্যাকে গুলিয়ে ফেলছি। লিটল ম্যাগাজিনে তরুণ লেখকের নতুন আঙ্গিক, নতুন ধারার লেখা প্রকাশিত হয়। আমরাও লিটল ম্যাগাজিনে লিখে লিখে নিজেদের বিকশিত করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু এখন সেটা দেখা যাচ্ছে না। এখন সাহিত্যের নামে একধরনের দুবৃ‌র্ত্তায়ন চলছে। এমনও দেখা যাচ্ছে, বিভিন্ন ব্যক্তি নিজের নামে বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করছে তার অর্থায়নও করছে তারাই। এতে লিটল ম্যাগাজিনের মূল চরিত্র নষ্ট হচ্ছে।

পিয়াস মজিদ আরো বলেন, তবে আশার কথা হচ্ছে, খুব কম হলেও কিছু ভালো কাগজ বের হচ্ছে। যেখানে আমরা ভালো লেখা পাই।

ছোট কাগজের শুরু

পাশ্চাত্যে লিটল ম্যাগাজিনের গোড়াপত্তন হয় রালফ ওয়াল্ডো ও মার্গারেট ফুলার সম্পাদিত ‘দি ডায়াল’-এর মাধ্যমে। লিটল ম্যাগাজিনের আরেক প্রভাবশালী পত্রিকা ছিল ইংল্যান্ড থেকে প্রকাশিত ‘সেভয়’। ভিক্টোরিয়ার পুঁজিবাদী ব্যবস্হার বিরুদ্ধে সোচ্চার কণ্ঠস্বর ছিল এই পত্রিকা। সাহিত্যক্ষেত্রে বিশের শতকের গোড়ার দিকে সবচেয়ে নামি লিটল ম্যাগাজিন ছিল ‘পোয়েট্রি’, যাকে বলা হতো ‘এ ম্যাগাজিন অব ভার্স’ বা কবিতার পত্রিকা। এটি শুরু হয় ১৯১২ সালে, যার সম্পাদক ছিলেন হেরিয়েট মনরো ও এজরা পাউন্ড। এই ম্যাগাজিন এতই জনপ্রিয় ছিল যে, এখানে কোনো নতুন কবির লেখা ছাপা হলে তাকে আর কখনো পেছন ফিরে তাকাতে হতো না।

পাশ্চাত্যের আদলে বাংলায় প্রথম লিটল ম্যাগাজিন প্রবর্তন করে প্রমথ চৌধুরী। তার সম্পাদিত সবুজপত্র (১৯১৪)-কে আধুনিক লিটল ম্যাগাজিনের আদি রূপ বলে গণ্য করা হয়। অবশ্য অনেকের মতে, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত বঙ্গদর্শন (১৮৭২) বাংলা ভাষায় প্রথম লিটল ম্যাগাজিন। পরবর্তীকালে কল্লোল (১৯২৩), শনিবারের চিঠি (১৯২৪), কালিকলম (১৯২৭), প্রগতি (১৯২৭), পূর্বাশা (১৯৩২), বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত কবিতা (১৯৩৫) পত্রিকা লিটল ম্যাগাজিন প্রবাহকে বেগবান করে।

রাজধানীতে চলছে লিটল ম্যাগাজিনের প্রদর্শনী

রাজধানীর শিল্পকলা একাডেমির উদ্যোগে দেশে প্রথমবারের মতো আয়োজন করা হয়েছে লিটল ম্যাগাজিন প্রদর্শনী। সেখানে সারা দেশের প্রায় ২০০টি লিটল ম্যাগাজিনের ৮০০-এর বেশি সংখ্যা স্হান পেয়েছে।

এ প্রসঙ্গে শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী বলেন, ছোটকাগজ থেকে শিল্প-সাহিত্যের সমকালীন গতি-প্রকৃতি ও প্রবণতা সম্পর্কে ধারণা লাভ করা যায়। শিল্প-সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রে ছোটকাগজ প্রকাশের ধারাবাহিকতা রাখাটা অত্যন্ত জরুরি। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি দেশে বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত ছোটকাগজ নিয়ে প্রদর্শনী আয়োজনসহ গুরুত্বপূর্ণ ছোটকাগজকে সম্মাননা জানানো, ‘লিটল ম্যাগাজিন প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে। এটি নিয়মিতভাবে করা হবে।

শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় চিত্রশালার গ্যালারি ৬-এ চলছে এ প্রদর্শনী। প্রদর্শনীতে স্হান পেয়েছে— চিহ্ন, লিরিক, চর্যাপদ, অনিন্দ্য, বইয়ের জগত্, একবিংশ, জংশন, অমিত্রাক্ষর, ঘাস ফুল নদী প্রভৃতি। প্রদর্শনী চলবে আগামী সোমবার পর্যন্ত।