পুরান ঢাকার উন্নয়নের ক্ষেত্রে ঐতিহ্য রক্ষায় রাষ্ট্রীয় প্রণোদনা দরকার

পুরান ঢাকার ঐতিহ্য রক্ষা করেই উন্নয়নের চিন্তা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক ভবন রক্ষা করতে সরকারি সহায়তা বা প্রণোদনার মাধ্যমে ভবন মালিকদের অন্যত্র জমির ব্যবস্থা করা যেতে পারে। আর সরকারী সহায়তা ছাড়া কেউই তাদের ভবন ঐতিহ্যবাহী হলেও ছাড়বে না। এ ক্ষেত্রে একটি সুপরিকল্পিত পরিকল্পনা দরকার। ইতিহাসের বিবর্তনে পুরান ঢাকার অনেক ঐতিহ্য এখন হুমকির মুখে। এগুলো রক্ষায় রাষ্ট্রীয় প্রণোদনা দরকার।

শনিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘পুরান ঢাকার ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও পুনঃউন্নয়ন: কর্তৃপক্ষের করণীয় ও বিশেষজ্ঞ ভাবনা’ শীর্ষক সেমিনারে এসব কথা বলেন বক্তারা।

ঢাকায় কর্মরত সেবা খাতের সাংবাদিকদের সংগঠন ‘ঢাকা ইউটিলিটি রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (ডুরা) এই সেমিনারের আয়োজন করে। সেমিনারে ডুরার সভাপতি মো. রুহুল আমিন এর সভাপতিত্বে প্রধান আলোচক হিসেবে গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ ও ডিটেইল এরিয়া প্ল্যানের (ড্যাপ) প্রকল্প পরিচালক মো. আশরাফুল ইসলাম। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ডুরার সাধারণ সম্পাদক শাহেদ শফিক।

মো. আশরাফুল ইসলাম বলেন, বেশিরভাগ ভবনমালিক বলেন তাদের পূর্বপুরুষদের বাড়ির ঐতিহ্য সংরক্ষণ করবেন। ভালো কথা, তবে এটি সংরক্ষণ করে আমি কী পাব? ‘আটটি থানা আর ২৩টি এলাকা জুড়ে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থানে পুরান ঢাকা। এই এলাকার উন্নয়ন ও পরিবর্তন ছাড়া রাজধানীর পরিবর্তন সম্ভব নয়। অথচ এই জায়গাটুকুতে জনঘনত্ব এতো বেশি! যেটি ভাবা যায় না। পুরান ঢাকার বড় সমস্যা হচ্ছে, পুরাতন জরাজির্ণ ভবন, ছোট আকারের কক্ষ, পর্যাপ্ত আলো বাতাসের ব্যবস্থা না থাকা এবং ঘিঞ্জি পরিবেশ। এছাড়াও পর্যাপ্ত রাস্তার অভাব, হকারদের রাস্তা দখলে রাখাতো আছেই। পানি ব্যবস্থাপনা ও ড্রেনেজ সমস্যাতো রয়েছেই।’

তিনি জানান, পুরান ঢাকা ভূমিকম্পের জন্য খুব ঝুঁকিপূণর্, কারণ সরু রাস্তা এবং দূর্বল ভবন কাঠামোর কারণে উদ্ধার অভিযানের সুযোগ নেই। এসব কারণে অগ্নিকা– ঘটলেও অতিরিক্ত ঝুঁকি থাকে। এই জন্য নির্মাণ বিধিমালা মেনে ভবন নির্মাণ করতে হবে। যদিও এটি পুরান ঢাকায় সম্ভব নয়। তাই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্লটগুলোকে একত্রিত করে ব্লক ভিত্তিক উন্নয়ন করা প্রয়োজন। প্রয়োজনে আলাদা বিধিমালা করা যেতে পারে।’ তিনি বলেন, নতুন বিধিমালায় হ্যারিটেজ রক্ষার ক্ষেত্রেও ভাবতে হবে। যারা নিজের সড়ক, উন্মোক্ত স্থান, জলাশয়, হারানো ক্ষতিগ্রস্ত মালিককে বাড়তি সুবিধা দেওয়া প্রয়োজন। ভূমি মালিকদের প্রণোধনা বা অন্যত্র জমির ব্যবস্থা করে পুন: উন্নয়ন করা যেতে পারে।’

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সভাপতি মোহাম্মদ ফজলে রেজা সুমন বলেন, পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রধান বাধা সরকারের সদিচ্ছা। বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কোন সমন্ময় নেই। তাই সরকার যদি চায় যেকোন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সম্ভব। সেমিনারে ঐতিহ্যের সংজ্ঞা আগে নির্ধারণ করতে হবে বলে মত দেন আরবান স্টাডি গ্রুপের প্রধান নির্বাহী তাইমুর ইসলাম। তিনি বলেন, একদিকে ঐতিহ্যের কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে জরাজীর্ণ ভবনের কথা বলা হচ্ছে। জরাজীর্ণ ভবনের কথা বলে করোনার সময় অনেক ভবন ভেঙে ফেলা হয়েছে। ২০০৯ সালের সরকারি তালিকা অনুযায়ী পুরান ঢাকায় ঐতিহ্যবাহী ভবন ৯৪টি। আবার ২০১৭ সালের তালিকা অনুযায়ী ৭৫টি, কিন্তু ভবন রয়েছে এক হাজার ৮৩১টি। তাই সেই তালিকা ঠিক করা উচিত।

ভবন না ভেঙেও সংরক্ষণ করা যায় জানিয়ে তাইমুর ইসলাম বলেন, সমন্বিতভাবে কাজ না করলে এই ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা যাবে না। রাজউক তার মতো ভাবছে, সিটি করপোরেশন তার মতো ভাবছে এবং প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ তার মতো ভাবছে। প্যারিস, লন্ডনের মতো অনেক শহর আছে যেখানে আধুনিকতার সব আছে পুরাতন কাঠামোকে রেখে।  ঐতিহ্য বিশেষজ্ঞ স্থপতি মোহাম্মদ সাজ্জাদ হোসেন বলেন, শুধু ভবন নয়, পুরান ঢাকার সংকীর্ণ রাস্তাও তার ঐতিহ্য। সবসময় রাস্তা ভেঙে বড় করতে হবে, বিষয়টা এমন নয়। সেখানে ফায়ার সার্ভিস বা অ্যাম্বুলেন্স প্রবেশ করতে পারবে না, তা না। সেসব গাড়ি প্রবেশের জন্য কাস্টমাইজড যানবাহনের বিষয়ও ভাবার প্রয়োজন আছে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সাধারণ সম্পাদক শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসান বলেন, ‘নগর উন্নয়নের প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে নগর পরিকল্পনাবিদ নেই। এমন হলে সঠিক পরিকল্পনা কিভাবে আসবে। এক দুইজন পরিকল্পনাবিদ দিয়ে এটি সম্ভব না। সব সেবা প্রতিষ্ঠানের উচিত পরিকল্পনাবিদদের নিয়ে কাজ করা।’ অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর পরিকল্পনা বিভাগের অ্যালামনাই আয়েশা সাঈদ বলেন, ‘পুরান ঢাকাকে পরিবর্তন করতে হলে শুরুতেই কমিউনিটিকে এক করতে হবে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। একটি বিষয় মনে রাখতে হবে, আমরা যতই বলি সিঙ্গাপুর বা কুয়ালালামপুর করে ফেলবো সেটি সম্ভব না। তবে আমাদের যা আছে তা দিয়ে নিজেদের মতো করে অবশ্যই পুন: উন্নয়ন সম্ভব।’

সভাপতির বক্তব্যে ডুরা সভাপতি মো. রুহুল আমিন বলেন, ঢাকা ইউটিলিটি রির্পোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন পেশাগত সাংবাদিকতায় মান উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে। সেবাখাতের সংবাদের ক্ষেত্রে যাতে সঠিক তথ্য মানুষ জানতে পারে সে জন্য বিভিন্ন সময় অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। আজকে পুরান ঢাকার এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিজ্ঞ আলোচকদের মূল্যায়ন এবং পরামর্শ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান মূল্যায়ন করবে বলে আমাদের বিশ্বাস।

অনুষ্ঠানে সভাপতির স্বাগত বক্তব্যের পর সংক্ষিপ্ত আলোচনা করেন ডুরার সহ-সভাপতি শফিকুল ইসলাম শামীম, অর্থ সম্পাদক শাজাহান মোল্লা সাজু, প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক বারেক হোসেন। এসময় অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ডুরার সাবেক সাধারণ সম্পাদক তোফাজ্জল হোসেন রুবেল, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জয়শ্রী ভাদুড়ী, সাংগঠনিক সম্পাদক নিলয় মামুন, প্রচার ও দফতর সম্পাদক জহিরুল ইসলাম, নির্বাহী সদস্য রফিকুল ইসলাম রনি, সানাউল হক সানি, মুসা আহমেদ।