আনোয়ারায় সন্ধ্যা নামলেই বেড়ে যায় হাতি আতঙ্ক 

কারো বসতবাড়ি ভাঙছে, কারো ভাঙছে দোকানপাট, খেয়ে ফেলছে গাছপালা, নষ্ট করছে ফসলি জমি। কখনো ঘরে দিচ্ছে হানা, কখনোবা রাস্তায় দিচ্ছে পাহারা। এইভাবে সন্ধ্যা নামলেই প্রতিদিন হাতির আতঙ্কে জানমাল নিয়ে শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার বৈরাগ, বারশাত, বটতলী ও বারাখাইন ইউনিয়নের মানুষেরা। 

শিল্পকারখানা প্রতিনিয়ত গিলে খাচ্ছে পাহাড়, সংকুচিত হয়েছে বসবাসের স্থান, বেড়েছে খাদ্য সংকট। এই কারণেই সন্ধ্যা নামলেই উপজেলার বৈরাগ ইউনিয়নের দেওয়ান বাজার, গুয়াপঞ্চক, খানবাড়ী, মোহাম্মদপুর, বদলপুরা, বন্দর, বারশত ইউনিয়নের কবিরের দোকান, পশ্চিমচাল, কান্তিরহাট, বটতলী ইউনিয়নের জয়নগর, ছিরাবটতলী, গুচ্ছগ্রাম, জয়নালপাড়া ও বারখাইন ইউনিয়নের হাজীগাঁও গ্রামে অবাধে হানা দিচ্ছে হাতির দল। মাঝেমধ্যে দিনের আলোতেও এসব এলাকার ফসলি জমিতে বিচরণ করতে দেখা যায় তাদের।

স্থানীয়রা জানান, গত বছর পাঁচেক আগে বাঁশখালীর পাহাড় থেকে বন্যহাতির একটি দল দেয়াং পাহাড় এবং আশপাশের পাহাড়ে অবস্থান নেয়। সন্ধ্যা হলেই তারা খাদ্যের সন্ধানে কর্ণফুলী উপজেলার বেশকটি এলাকা এবং আনোয়ারা উপজেলার বৈরাগ, বারশাত, বটতলী এবং মাঝেমধ্যে বারখাইন ইউনিয়নে নেমে এসে মানুষের ঘরবাড়ি, দোকানপাট, গাছপালা নষ্ট করে। গবাদি পশু এমনকি মানুষের ওপরও হামলা করে। গত পাঁচ বছরে মসজিদের ইমাম, পাহারাদার, প্রতিবন্ধীসহ আনুমানিক কর্ণফুলী ও আনোয়ারা উপজেলার ১৭ জনের প্রাণহানি এবং অর্ধশতাধিক লোক আহত হয়েছেন বলেও স্থানীয়রা জানান।

সর্বশেষ গত ২ ফেব্রুয়ারি (বুধবার) ভোররাতে উপজেলার বৈরাগ ইউনিয়নের গুয়াপঞ্চক এলাকায় তাণ্ডব চালিয়ে রফিকুল ইসলামের মুদির দোকানের মালামাল নষ্ট করে ফেলে এবং একই দিনে মোহাম্মদ উল্লাহপাড়ার ওসমান গণির বাড়ির নিরাপত্তা বেষ্টনী দেওয়াল ভেঙে ফেলে। এর আগে ২২ জানুয়ারি (শনিবার) বৈরাগ ইউনিয়নের উত্তর গুয়াপঞ্চক এলাকায় দিদারুল আলমের বসতঘর ও সেলিম হকের দোকান ভাঙচুর করে। 

স্থানীয় চায়ের দোকানদার উমর বলেন, সন্ধ্যা হলেই হাতি নিয়ে খুবই আতঙ্কে থাকি আমরা। প্রতিদিন এরা পাহাড় থেকে নেমে আমাদের ফসল, ঘরবাড়ি, দোকানপাট ভাঙচুর করছে। 

হাতি তাড়ানোর জন্য পাহারাদার দেওয়া হলে তাতেও কোনো কাজ হচ্ছে না। হাতির পাহারা দিতে গিয়ে হাতির আক্রমণের শিকার হয়েছে অনেকেই। গত বছর হাতি তাড়াতে গিয়ে গুয়াপঞ্চক মোহাম্মদ উল্লাহ গ্রামের হাতি তাড়ানো টিমের নেতা আবু বক্কর হামলা শিকার হয়েছেন। এ বিষয়ে বৈরাগ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. নোয়াব আলী বলেন, গত কয়েক বছর ধরে পাহাড় থেকে বন্যহাতির দল নেমে এখানকার মানুষের অনেক জানমালের ক্ষয়ক্ষতি করে আসছে। 

কয়েক মাস আগে থেকে উপজেলার গুচ্ছগ্রাম এলাকায় বন্যহাতির একটি দল অবস্থান নেয় বলে শুনেছি। সেখান থেকে প্রতি রাতে কোনো না কোনো গ্রামে হামলা চালাচ্ছে হাতিগুলো। হাতির আতঙ্কে রাত কাটাছে এলাকাবাসী। এ বিষয়ে বন বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবহিত করেছি। তারা ব্যবস্থা নেবেন বলে জানিয়েছেন।

আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শেখ জোবায়ের আহমেদ বলেন, বন্যহাতির দল গত কয়েক বছর ধরে আনোয়ারা উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে হানা দিচ্ছে। এই বিষয়ে অনেক অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি বন বিভাগকে জানিয়েছি। বন বিভাগের চট্টগ্রাম দক্ষিণ রেঞ্জ কর্মকর্তা মিজানুর রহমানও একই কথা জানান। 

তিনি বলেন, খাদ্য সংকটে হাতিগুলো লোকালয়ে নেমে আসছে। হাতির খাবার জোগান দিতে একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। হাতির হামলায় ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। 

চট্টগ্রাম বিভাগীয় বন কর্মকর্তা সফিকুল ইসলাম বলেন, প্রতিনিয়ত বনভূমি ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় হাতির আবাসস্থল ও খাদ্যের সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে খাবারের সন্ধানে তারা লোকালয়ে নেমে আসছে। তাতে মানুষের মুখোমুখি হয়ে পড়ায় ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে।

গ্রামের রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছে বন্যহাতি। ছবিটি গুয়াপঞ্চক এলাকা থেকে তোলা