জীবিত অবস্থায় কোভিড মুক্ত পৃথিবী দেখে যেতে চেয়েছিলেন লতা মঙ্গেশকর। সেই কোভিডই কেড়ে নিলো তাকে। ৩৩ বছর বয়সে নিভৃত বিষক্রিয়াও যে মানুষটিকে কেড়ে নিতে পারেনি, কোভিড-নিউমোনিয়ার জোড়া ধাক্কা আর সামলাতে পারলো না লতার শরীরখানা।
মৃত্যুকে বড় ভয় পেতেন লতা। লাশের সামনে গিয়ে দাঁড়ালে রক্তচাপ বেড়ে যেত কয়েক গুণ। এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘চোখের সামনে মৃত্যু দেখলেই আমার প্রেশার বেড়ে যায়। চিকিৎসক সাফ বলে দিয়েছেন বাড়ি বসে দুঃখ করুন। মৃতদেহের কাছে যাবেন না।’ ধর্ম বলে, আত্মা নাকি অবিনশ্বর? তবে? শেষের কয়দিনও চিকিৎসককে অনুরোধ জানিয়েছিলেন, তাকে নিয়ে অকারণ হইচই যেন না হয়। অসুস্থতার খবর ছড়াতেই দেশ-বিদেশে শুরু হয়েছিল যজ্ঞ। নিজের বাড়িও বাদ যায়নি। তবু, চলে গেলেন তিনি…।
লতা মঙ্গেশকরের প্রথম নাম হেমা। ১৯২৯ সালে ইন্দোরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন লতা। পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে লতা মঙ্গেশকর ছিলেন সবচেয়ে বড়। তার বাবা পণ্ডিত দীনানাথ মঙ্গেশকর মরাঠি ও কোঙ্কিণী সংগীত শিল্পী ছিলেন, পাশাপাশি অভিনয়ও করতেন। ছোটবেলায় বাড়িতে কে এল সায়গল ছাড়া আর কোনো ছবির গান গাওয়ার অনুমতি ছিল না। গায়িকা নয় মাত্র ১৩ বছর বয়সে অভিনেত্রী হিসাবে কাজ করেছিলেন লতা মঙ্গেশকর। সেইসময় বাবাকে হারান গায়িকা, পাঁচ ভাই-বোনের কথা ভেবে ওই বয়সেই হাল ধরেন সংসারের।
বোন আশার সঙ্গে তার প্রতিযোগিতা নিয়ে বারেবারেই সরব হয়েছে দেশি-বিদেশি মিডিয়া। লতা অবশ্য শেষদিনেও বলেছেন, ‘আশা নিজের মতো গেয়েছিল বলেই আমায় ছায়া হয়ে থাকেনি।’ রানু মন্ডলকে নিয়ে মাতামাতিতে শেষবয়সেও যেমন অসন্তুষ্ট হয়েছেন লতা আবার ঠিক তেমনি কলকাতা সমদীপ্তা মুখোপাধ্যায়ের কন্ঠে মোজারটের সিম্ফনি শুনে প্রাণখোলা প্রশংসাতেও ভরিয়ে দিয়েছেন অনায়াসে। অথচ তার ‘অবসর’ নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন। বিরাট কোহলি তিনি হতেই পারতেন, কিন্তু তিন সেই পথ বেছে নেননি। করতে চেয়েছিলেন কাজ।
বছর কয়েক আগেও তার বাংলা গান রেকর্ড করেছেন লতা। ১৩ বছরের মেয়ে যে অনুশীলন, স্বশ্বাসন আয়ত্ত করেছিল তিলে তিলে জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও সেই নিয়মই লালন করেছেন তিনি। ‘লতা মঙ্গেশকর মিউজিক কোম্পানির অধিকর্তা, সুরকার ময়ূরেশ পাই একবার এক সাক্ষাৎকারে সেই বাংলা গান রেকর্ডের দিন প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘লতাজিকে বলেছিলাম, আপনি লাঞ্চ করে নিন, তারপর আমরা কারেকশনগুলো ঠিক করে নেব।’ শুনে বললেন, ‘যে দিন রেকর্ডিং থাকে আমি তো সে দিন কিছু খাই না। ভরপেটে রেকর্ডিং হয় নাকি! স্রেফ চায়ে পিতি হুঁ। তুমি আমার জন্য পারলে আধ বাটি স্যুপ আনিয়ে দাও।’ দীর্ঘ কেরিয়ারে দেরি করে সেটে আসা ছিল অপছন্দের।
গানের রয়্যালটি নিয়ে হয়েছিলেন সরব। অথচ ডিপ্লোম্যাটিক আখ্যাও বয়ে বেড়াতে হয়েছে আজীবন। সত্যিই কি তিনি পলিটিক্যালি কারেক্ট ছিলেন লতা? ঘনিষ্ঠরা বলেন, নিভৃত জীবন বেছে নিলেও সোশ্যাল মিডিয়া সম্পর্কে ৯২-তেও ওয়াকিবহাল ছিলেন লতা। প্লে ব্যাক সিঙ্গিংয়ে বর্তমান সময়ে এক্সেলেন্সের পরম্পরার ধরে রাখতে না পারা নিয়েও হয়েছে সরব। আবার নিজের গান ১০০ বছর পরেও লোকের মনে থাকবে কিনা তা নিয়েও প্রকাশ করেছেন সন্দেহ। কেন? বলেছিলেন, ‘যুব সমাজের মনোযোগের স্থায়িত্ব এখন বড় কম’। অভিমান না চরম সত্য? নিভৃতে থেকেও নিভৃতে থাকেননি লতা। সঙ্গীত জগতের সুচিত্রা সেন চাইলে হতেই পারতেন তিনি, তবু শেষদিনেও সঙ্গীতকে আঁকড়েই বাঁচতে চেয়েছেন সুরসম্রাজ্ঞী।
লতা মঙ্গেশকরের অবদানের জন্য ২০০১ সালে তার হাতে তুলে দেওয়া হয় ভারতের সর্বোচ্চ সম্মান ভারতরত্ন, এম. এস. সুব্বুলক্ষ্মীর পর এই পদক পাওয়া তিনিই দ্বিতীয় সঙ্গীতশিল্পী। ২০০৭ সালে ফ্রান্স সরকার লতা মঙ্গেশকরের গুণমুগ্ধ হয়ে ফ্রান্সের সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মাননা লেজিওঁ দনরের অফিসার খেতাবে ভূষিত করে। মোট ৩টি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, ১৫টি বাংলা চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি পুরস্কার, ৪টি শ্রেষ্ঠ নারী নেপথ্য কণ্ঠশিল্পী বিভাগে ফিল্মফেয়ার পুরস্কার, ২টি বিশেষ ফিল্মফেয়ার পুরস্কার, ফিল্মফেয়ার আজীবন সম্মানা পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কার অর্জন করেছেন। আর সঙ্গীত জগতে তার অবদান, এক কথায় একটি অধ্যায়, যা আজীবন শিল্পজগত ও মানুষের মমনে অতোপ্রতভাবে জড়িয়ে থাকবে।