পৃথিবীতে প্রতিদিন কিছু না কিছু হারাচ্ছে মানুষ, হয়তো সেটা বুঝে উঠতে পারছে না। তার পরও নীরবে, নিভৃতে, নিঃশব্দে হারিয়েই চলেছে। এভাবে হারাতে হারাতে মানুষের জীবন কোথায় গিয়ে ঠেকবে কেউ জানে না। কেউ বোঝে না। বরং সেটা অজ্ঞাতেই থেকে যেতে যেন বেশি ভালোবাসে। মানুষ সব সময় সুবিধাবাদী হয়, ভোগবাদী হয়, স্বার্থবাজ হয়, যেটা বাইরে থেকে বোঝা না গেলেও ভেতরে সেটা সব সময় কাজ করে। যেটা মানুষ হারায়, সেটা সব দিক থেকে মহামূল্যবান হলেও মানুষের স্বার্থের কাছে যখন সেটা নগণ্য হয়ে যায়, তখন মানুষ যা হারায়, মানুষ সেটা লুকাতে চায়। সেটাকে হারিয়েও মানুষ সেটা হারায়নি, এমন একটা কৃত্রিম অভিনয়ে মেতে ওঠে।
তবে একবার যা হারিয়ে যায় তা আর কখনো ফিরে পাওয়া যায় না। পৃথিবীতে হারানো খুব সহজ, খুঁজে পাওয়া খুব কঠিন। যারা মরে যায়, তাদের আর কখনো ফিরে পাওয়া যায় না। প্রকৃতির নিয়মে মানুষ একসময় জন্মে, তারপর একদিন মরে যায়। যদিও মৃত্যুর সময়টা সব সময় অজ্ঞাত থাকে। মৃত্যু কখনো মানুষের বয়স মেনে আসে না, মৃত্যুর কাছে সময় খুব মূল্যহীন হয়, মানুষ খুব অসহায় হয়। তবে বেঁচে থেকেও মানুষ অনেক সময় মরে যায়, যখন মানুষের বিবেকের মৃত্যু ঘটে। মানুষ মরে গেলে হারিয়ে যায়, কিন্তু বিবেক মরে গেলে মানুষ আর মানুষ থাকে না। মানুষের মানুষ নামের গর্ব করার মতো পরিচয়টা হারিয়ে যায়, যদিও সেটা মানুষ মেনে নিতে চায় না। ভেতরের মানুষটা তখনো যদি তার বেঁচে থাকে, তা ভেতরের মানুষটা বুঝতে পারে, সে যা হারিয়েছে, তা আর চাইলেও ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়। তার পরও তো রঙ্গমঞ্চের পৃথিবী, বাইরে মহানায়কের অভিনয়, ভেতরে খলনায়কের সক্রিয়তা। বিবেক পুড়ছে, কপাল পুড়ছে, মানুষ পচছে, এভাবেই প্রতিদিন। প্রতিদিন মানুষের মৃত্যু ঘটছে, তার চেয়ে বিবেকের মৃত্যু ঘটছে বেশি। খুব অদ্ভুত একটা সমীকরণ। যে সমীকরণের গাণিতিক কোনো মূল্য নেই। তবে দর্শনতাত্ত্বিক একধরনের অতি বায়বীয় সম্পর্ক আছে। আবেগ আর বিবেকের মধ্যে একধরনের মনস্তাত্ত্বিক লড়াই আছে। সে বৈপরীত্যের লড়াইটা মানুষকে টানতে টানতে একটা শূন্যতায় নিয়ে যায় যেখানে সবকিছুকে ঝুলন্ত মনে হয়। সে ঝুলন্ত অবস্হাটা না হারিয়ে যায়, না ফিরে পাওয়া যায়। অনেকটা অমীমাংসিত খেলার ফলাফলের মতো। যেটা সংখ্যাতত্ত্বের বিচারে পরখ করা যায় না। বরং বিবেক ও আবেগকে অতিক্রম করে কোনো একটা কাল্পনিক রেখায় ঝুলন্ত থেকে পরখ করতে হয়। বিবেক মানুষকে বাস্তববাদী করে, আবেগ মানুষকে ভেতরে ভেতরে কাঁদায়। এতটা কাঁদায় তখন মনে হয় বাস্তবতার ভেতরের কান্নাকে একটু নগ্ন করে দেখা দরকার। যেটা বাস্তব বলে মনে হচ্ছে, হয়তো সেটা বাস্তব নয়। বরং বাস্তবতার ভেতরে অদেখা আরেক বাস্তবতা, কিছুটা ভাঙাচোরা, কিছুটা খণ্ডিত-বিখণ্ডিত, যেটা বিবেক থেকে বের হয়ে এসে আবেগকে সক্রিয় করে তোলে। এমন করেই হারিয়ে যাওয়া আবেগগুলো বিবেকের ভেতরের বিন্দু বিন্দু সত্যকে উন্মোচন করতে করতে একসময় আবেগ থেকে বিবেকে রূপান্তরিত হয়। এটা এমন একটা রহস্য, যেখানে মনে হবে মানুষ সত্যের ভেতরে আছে অথচ সত্যের ভেতরের গভীর সত্যকে দেখতে পাচ্ছে না। তবে সেটা দেখবে বলে এমন একটা কাল্পনিক দুরবিন বা অণুবীক্ষণ যন্ত্র আবিষ্কারের চেষ্টা চালাচ্ছে, যেখানে বিবেকের ভেতরে আবেগ, আবেগের ভেতরে বিবেক সমান্তরাল রেখা থেকে বেরিয়ে এসে একটি রেখায় মিলিত হচ্ছে। যে মানুষটা না খেয়ে আছে, সে বোঝে ক্ষুধার যন্ত্রণা কতটুকু। এই ক্ষুধা তাকে একসময় নিঃশেষ করে দেবে। তার অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়বে। তার কাছে আবেগ ও বিবেকের চেয়ে একমুঠো খাদ্যের মূল্য অনেক বেশি। যদি সেটাই হয়, তবে বিবেক কি ক্ষুধার কাছে পরাজিত হবে? যদি মানুষটার কাছে বেঁচে থাকাটা বিবেকের চেয়ে মূল্যবান হয়, তাহলে বিবেক ক্ষুধার কাছে হার মানবে। অন্যদিকে মানুষটার কাছে বিবেক যদি মৃত্যুর চেয়ে মূল্যবান হয়, তাহলে ক্ষুধা বিবেকের কাছে হার মানবে। তখন প্রশ্ন আসতে পারে, বিবেক যদি মানুষের বেঁচে থাকার মতো মৌলিক অধিকারকে নিশ্চিত করতে না পারে, তাহলে সে বিবেকের মূল্যই-বা কতটুকু। তবে পৃথিবীর ইতিহাস বলছে, মানুষ কখনো কখনো মৌলিক অধিকারের চেয়ে তার ভেতরে লালিত বিশ্বাস ও মূল্যবোধকে বেশি প্রাধান্য দেয়। হয়তো এটা একধরনের ব্যতিক্রম। ব্যতিক্রম কোনো নিয়মের মধ্যে পড়ে না, তার পরও ব্যতিক্রম যে উদাহরণ তৈরি করে তা মানুষকে নতুন পথ দেখায়। নতুন চিন্তার জন্ম ব্যতিক্রম থেকেই হয়, যা কালক্রমে মানুষ থেকে মানুষে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে স্হানান্তরিত হয়ে বাস্তবতার জন্ম দেয়। ব্যতিক্রম এভাবেই একদিন দিনবদলের বার্তা নিয়ে নিয়মে পরিণত হয়।
সময়টা ৩৯৯ খ্িরষ্টপূর্ব। অ্যাথেন্সের আদালতে হাজির করা হলো সক্রেটিসকে। যুবকদের পথচু্যত করা এবং প্রচলিত ধর্মের অবমাননার অভিযোগ আনা হলো তার বিরুদ্ধে। অথচ এই অভিযোগগুলো ছিল ভিত্তিহীন। একটা অনেক বড় মনের মানুষ ছিলেন তিনি অথচ নিজেকে মাছির সঙ্গে তুলনা করতেন। যিনি জানতেন যে, তিনি কিছুই জানেন না। নিজেকে ছোট করে ভাবতে শিখেছিলেন বলেই হয়তো এত বড় মাপের মানুষ হয়েছেন।
গ্রিসের রাজারা বলতেন, ঈশ্বরের প্রতিনিধি তারা। তারা যা বলছেন, সেটা ঈশ্বরের কথা। সেই বিচারে ঈশ্বরের সমান সম্মান ও মর্যাদা পাওয়াটা তাদের অধিকার। কিন্তু সক্রেটিস রাজাদের এ ধরনের যুক্তিহীন মনোভাবকে কখনো মেনে নেননি। বরং তিনি বলতেন ‘না, কখনোই না। মানুষ কখনো ঈশ্বর হতে পারে না। এটা মানুষের সঙ্গে একধরনের প্রতারণা। সব মানুষই ঈশ্বরের সৃষ্টি। ঈশ্বরের কাছে রাজা-প্রজা সবাই সমান।’
গ্রিক দর্শনের জন্মদাতা ছিলেন তিনি। সে দর্শন আর গ্রিক দর্শন থাকেনি বরং তা কালক্রমে বিশ্বজনীন দর্শনে পরিণত হয়েছে। তিনি জানতেন, তিনি কোনো অপরাধ করেননি, কিন্তু তাকে অপরাধী বানানো হয়েছে। কারণ একটাই—ঈর্ষা, অহংকার, বিদ্বেষ।
তিনি যে তার প্রতিভার শক্তিতে রাজাদেরও ছাড়িয়ে গেছেন। সম্রাটদের সম্রাটদেরও ছাড়িয়ে গেছেন। সৃজনশীল চিন্তার সঙ্গে ক্ষমতা কি কখনো পেরে উঠেছে? কখনোই পারেনি। ক্ষমতাধর মানুষ ইতিহাসে টিকে থাকে না, সৃষ্টিশীল মানুষরাই টিকে থাকে। এটাই প্রকৃতির নিয়ম। প্রকৃতির অমোঘ বিধান। আদালতে দাঁড়িয়ে অসংকোচিত চিত্তে সক্রেটিস বললেন, ‘অ্যাথেন্সের মানুষ, আমি তোমাদের শ্রদ্ধা করি ও ভালোবাসি। কিন্তু তার চেয়ে বেশি দায়বদ্ধ ঈশ্বরের প্রতি। যতক্ষণ জীবন ও সামর্থ্য আছে, দর্শনচর্চা এবং শিক্ষাদান থেকে কেউ আমাকে থামাতে পারবে না। কখনো বদলাব না আমার এই পথ। যদি বহুবার মৃত্যুবরণ করতে হয়, তবুও না।’
বন্দি করা হলো সক্রেটিসকে। হেমলক পানে মৃত্যুদণ্ডের সাজার ঘোষণা এলো। মানুষের পৃথিবীর প্রহসনের বিচার ছিল সেটা। প্রকৃতি নীরবে কেঁদেছে, গুমরে গুমরে মরেছে। তার পরও কিছ~ বলেনি সে সময়। কারণ প্রকৃতি অপেক্ষা করে। অপেক্ষার পর অপেক্ষা করে। তারপর সবার অলক্ষ্যে একদিন ফুঁসে ওঠে। প্রকৃতি তার মতো বিচার করে। কারাগার থেকে সক্রেটিস ইচ্ছা করলে ক্রিটোর সহায়তায় পালাতে পারতেন। তা তিনি করেননি। আদালতে তাকে বলা হয়েছিল, তিনি যদি রাজাদের বিরুদ্ধে না বলেন, তাদের ঈশ্বরের প্রতিনিধি হিসেবে মেনে নেন এবং তার দর্শন ও মতামত প্রচার থেকে বিরত থাকেন, তবে তাকে ক্ষমা করা হবে। কিন্তু সক্রেটিস তার বিশ্বাস ও দর্শনকে ত্যাগ করেননি।
তিনি যদি সবকিছু মেনে নিতেন, তবে হয়তো মৃত্যু থেকে মুক্তি পেতেন, কিন্তু নিজের বিবেককে হত্যা করতেন। সক্রেটিসের মৃত্যু মিথ্যাকে সত্য, সত্যকে মিথ্যা হতে দেয়নি। কখনো কখনো সত্যের জন্য মরতে হয়। প্রকৃতির বিচারটা খুব অদ্ভুত এখানেই। যারা সেদিন সক্রেটিসকে অপরাধী বানিয়েছিল, সময়কে সাক্ষী রেখে প্রকৃতি তাদের অপরাধী হিসেবে প্রমাণিত করেছে।
প্রকৃতি সে অপরাধীদের আস্তাকুঁড়ে ছুড়ে ফেলেছে আর মৃত্যুঞ্জয়ী কিংবদন্িততে পরিণত করেছে সক্রেটিসকে। ভাবা যায়, কত বছর আগের ঘটনা। মানুষ ভাবে, সময় যত ক্ষেপণ করা যাবে মানুষ তত বিষয়টিকে ভুলে যাবে। এটা মানুষের ভুল ধারণা। প্রকৃতি সব সময় জেগে থাকে। মানুষ নিজের স্বার্থে ভাবে, প্রকৃতি ও সময় হারিয়ে যাক। কালের গর্ভে বিলীন হোক। মানুষকে গোলকধাঁধায় ফেলতে প্রকৃতি ও সময় মানুষ যেটা চায়, সেটাই হয়তো করে। বোকা মানুষ ভাবে, প্রকৃতি ও সময় হারিয়ে গেছে। অথচ তারা মানুষের আশপাশেই থাকে, তবে বোধশক্তিটা কেড়ে নেয় চিরতরে।
প্রতিদিন মানুষ ভালোবাসা, মায়া, মমতা, অনুভূতি, সহানুভূতি, সুখ, দুঃখ, সহমর্মিতা, সহনশীলতা, সততা, সরলতা, নৈতিকতা ও সম্পর্কের মতো অমূল্য সম্পদগুলো হারাচ্ছে। অর্থ, সম্পদ, অবৈধতা, রং, নেশার মোহে ডুবছে মানুষ, ডুবছে আর ডুবছে, খুব গভীর থেকে গভীরে। পচনশীল মন ভাবছে, এগুলোই বুঝি সুখ, অথচ এগুলোই তো অসুখ। যে অসুখের কোনো ওষুধ নেই, চিকিত্সা নেই।
লেখক: শিক্ষাবিদ, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর