ইরানের বহু নারী ক্ষুধার জ্বালা নিবারণের অন্য কোনো উপায় খুঁজে না পেয়ে, জরায়ু ভাড়া দেওয়ার মতো কষ্টকর এবং মানবেতর জীবন বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের স্বাস্হ্য কর্তৃপক্ষ সারোগেসির মাধ্যমে জন্ম নেওয়া শিশুদের কোনো পরিসংখ্যান না দিলেও, এ বিষয়টি এখন অনেকটাই খোলামেলা, লুকানো-ছাপানো কিছু নেই এবং অনেকেই ব্যাপারটি জানেন। ইরানের সমাজে আগে এমনটা ভাবাও কষ্টকর ছিল। অর্থনৈতিক সংকটের সঙ্গে যোগ হয়েছে অতিমারি, সে কারণে সমাজপতিরাও মুখে কুলুপ এঁটেছেন।
নিউইয়র্ক থেকে ইন্ডিপেন্ডেন্ট পার্সিয়ান সংবাদমাধ্যমে এ নিয়ে বিস্তারিত একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তাতে আজকের ইরানের এমন দীনতা প্রকাশ পেয়েছে। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানি অর্থনীতিতে ধস নেমেছে, মুদ্রার মূল্য কমে গেছে এবং বেড়ে গেছে মুদ্রাস্ফীতি। ফলে দারিদ্র্য ও বেকারত্বে জীবন অনেকটাই স্হবির হয়ে পড়েছে। চরম আর্থিক সংকট থেকে সাময়িক মুক্তি পেতে প্রতিদিনই ইরানের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে জরায়ু ভাড়া দিতে ইচ্ছুক নারীরা শহরের ক্লিনিকগুলোতে ভিড় করছে। দিনদিনই বাড়ছে তাদের সংখ্যা। মধ্যস্হতাকারী অর্থাত্ দালালচক্র আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপনের জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ই-কমার্স সাইট এবং অ্যাপ্লিকেশনগুলি কাজে লাগিয়ে বন্ধ্যাত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে ইচ্ছুক ধনাঢ্য দম্পতিদের মনোযোগ আকর্ষণে কোনোই ত্রুটি করছে না। এ ব্যবসায় নিয়োজিত দালালেরা একেকবার সন্তান ধারণের জন্য গর্ভ অর্থাত্ জরায়ু ভাড়া বাবদ সন্তান লাভ ইচ্ছুক দম্পতিদের কাছে ৮ কোটি টোমান অর্থাত্ প্রায় ৩০০০ মার্কিন ডলার থেকে শুরু করে, কখনো কখনো ১৫ কোটি টোমান অর্থাত্ ৫৬০০ মার্কিন ডলারেরও বেশি দাবি করে থাকে। দুঃখের বিষয়, জরায়ু ভাড়া বাবদ অর্জিত অর্থের সিংহভাগ চলে যায় দালালদের পকেটে।
আসল (বায়োলজিক্যাল) মা ছাড়া অন্য মহিলার গর্ভে ভ্রূণ থেকে ভূমিষ্ট হওয়া পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াকে সারোগেসি বলে। আর বিজ্ঞানের আশীর্বাদে এ পদ্ধতি যদিও বন্ধ্যাত্ব মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতিগুলির মধ্যে একটি হিসাবে বিবেচিত হয়, তবে যারা মানবেতর জীবনের তাড়নায় নিজেদের দেহকে এমন একটি দীর্ঘ এবং কষ্টকর প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত করেন, তাঁরা চরম মানসিক এবং শারীরিক ক্ষতির সম্মুখীন হন। অনেকেই আবার এ পদ্ধতিতে একাধিকবার সন্তান ধারণ করছেন। তাঁরা মারাত্মক স্বাস্হ্যঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছেন।
তবে সন্তান লাভে ইচ্ছুক, সন্তান উত্পাদনে অক্ষম দম্পতি ছাড়াও জরায়ু ভাড়া করতে উত্সাহী হচ্ছেন অনেক নারী যারা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই উচ্চশিক্ষিত এবং উচ্চপদে চাকরি করছেন। অর্থনৈতিক সংকট যাঁদেরকে স্পর্শ করতে পারেনি। সেইসঙ্গে আছে শারীরিক সৌন্দর্য সচেতন দেশি-বিদেশি সেলিব্রেটি তারকাদের একটি অংশ।
এককালের সমৃদ্ধ ইরান আজ দারিদ্রে্যর সঙ্গে লড়াই করছে। এমন করুণ অবস্হার জন্য কে দায়ী? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদেরকে খানিকটা পিছনে ফিরে যেতে হবে। ইরান পারমাণবিক বোমা তৈরির উদ্যোগ নিলে, ২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রসহ ছয় বিশ্বশক্তির (যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, ফ্রান্স, জার্মানি ও জাতিসংঘ) সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি করে ইরান। চুক্তি মেনে দেশটি পারমাণবিক কার্যক্রম থেকে সরে আসার ঘোষণা দেয়। বিনিময়ে তেহরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা ধাপে ধাপে প্রত্যাহারের কথা জানায় পশ্চিমা দেশগুলো। অথচ ক্ষমতায় আসার পরপরই তত্কালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর পূর্বসূরির অর্জনগুলোর প্রায় প্রতিটিকেই নস্যাত্ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। অনেকগুলো চুক্তির মধ্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল ইরানের এই পারমাণবিক চুক্তি, সেখানে পশ্চিমা মিত্রদের বেকায়দায় ফেলে এক তরফাভাবে সে চুক্তি থেকেও তত্কালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পিছু হটলেন।
তবে অনেকেই বলেন যে যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্র শক্তিগুলো পারমাণবিক অস্ত্র হ্রাসে মোটেই আন্তরিক নয়। তাদের অপছন্দের রাষ্ট্রগুলো যাতে এমন বিধ্বংসী অস্ত্রে সমৃদ্ধ না হতে পারে, সেজন্য তারা তত্পর হয়, সে দেশগুলোর বিপক্ষে অবস্হান নেয় এবং জোট বাঁধে। এমন একচোখা নীতির কারণে পারমাণবিক অস্ত্র হ্রাস সম্ভব হচ্ছে না। এ কথা সত্যি যে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার বিশ্বমানবতাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেবে। তাই এর বিস্তার রোধে পক্ষপাতহীনভাবে কাজ করতে হবে। সেইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্রদের এমন সমস্যা সমাধানে আন্তরিক হতে হবে এবং দৃষ্টান্ত স্হাপন করতে হবে। সর্বোপরি জাতিসংঘ তথা আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্হাকে পালন করতে হবে সক্রিয় ভূমিকা।
পৃথিবীতে যত রকমের কষ্ট আছে, তার মধ্যে সবচেয়ে বড় কষ্ট হচ্ছে ক্ষুধার কষ্ট। যখনি কোনো দেশে বা সমাজে প্রাণঘাতী মহামারি, যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, দুর্যোগ, অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেয় বা কোনো পরাশক্তি সে দেশটির বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধ, নিষেধাজ্ঞা জারি করে তখন পুরো দেশ এবং সমাজে তার নেতিবাচক প্রভাব প্রকট হয়। আর প্রথমে আক্রান্ত হয়, পরিস্হিতির নির্মম শিকার হয় সমাজের দুর্বল অংশ—নারী এবং শিশুরা।
বিবেকহীনতার পরিচয় দিয়ে বিশ্বমানবতাকে খণ্ডিত করা খুবই অন্যায়। পৃথিবীর এক অংশের মানুষকে অসুখী রেখে সুখী সাজা এক ধরনের আত্মপ্রতারণা। তাতে আর যাই হোক, সভ্যতার দম্ভ করা যায় না, নিজেদেরকে সভ্য বলে দাবি করা যায় না। মানবতার জন্য চরম লজ্জাকর যে একবিংশ শতাব্দীতেও জঠরজ্বালা জুড়াতে পৃথিবীর এক অংশের নারীদের জরায়ু ভাড়া দিতে হয়!
লেখক: ফ্রান্সপ্রবাসী লেখক