আলোচিত হওয়া, ভাইরাল হওয়া 

বর্তমানে যোগ্য-দক্ষ, জ্ঞানী-গুণী হওয়া নয়, ফেসবুকনির্ভর নতুন একটা সম্প্রদায় তৈরি হয়েছে, যাদের একমাত্র ধান্দা হলো বিখ্যাত হওয়া, আলোচিত হওয়া, ভাইরাল হওয়া। বিখ্যাত ও আলোচিত হতে তাদের মধ্যে সব সময় একটা ছটফটানি কাজ করে। তারা সারাক্ষণ খবর হতে চায়, আলোচনায় থাকতে চায়। অন্যের মাথা ফাটাতে না পারলে এরা নিজের মাথা নিজে ফাটিয়ে হলেও খবরের আইটেম হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিখ্যাত বা আলোচিত হওয়ার জন্য সোশ্যাল মিডিয়ায় এভাবে মরিয়া চেষ্টা চালানোটা একটা ব্যাধি। এটা একধরনের মানসিক রোগ, বিকার। তবে বিকারই হোক, আর যা-ই হোক, এ ধরনের মানুষের সংখ্যা এবং তাদের অনুরাগী-অনুসারীর পরিমাণ কিন্তু একেবারে কম নয়।

এই নবপ্রজন্মের আলোচিত ও বিখ্যাত ব্যক্তিরা আলোচিত-সমালোচিত হতে কতগুলো বিশেষ প্রক্রিয়া অবলম্বন করেন। চাইলে যে কেউ এই প্রক্রিয়া অবলম্বন করে বিখ্যাত হতে পারেন।

বিখ্যাত বা আলোচিত হওয়ার জন্য প্রথমেই নিজেকে ‘আলাদা’ ও ‘ব্যতিক্রমী’ হিসেবে প্রমাণ করতে হবে। এজন্য প্রয়োজনে নিজের বস্ত্র বিসর্জন দিতে হবে। প্রয়োজনে ‘হেঁট মুণ্ডু ঊর্ধ্বপদ’ হতে হবে। ‘প্রথাবিরোধী’ হওয়ার নামে সবকিছুতে ‘ভিন্ন মত’ দিতে হবে। সরকার, বিরোধী দল তো বটেই, পারলে নিজের মাকেও গালি দিতে হবে।

বিখ্যাত ও আলোচিত হতে বিভিন্ন উচ্চমার্গীয় বিষয়ে অবোধ্য আলোচনা করতে হবে। লিখলে এমন কিছু লিখতে হবে, যা পাঠক সহজে বুঝতে পারবে না। কঠিন কঠিন ও আনকোড়া শব্দ ব্যবহার করতে হবে, যেন পাঠকরা মনে করেন, আহ্, লোকটার কী ট্যালেন্ট!

ভিশন থাকতে হবে। থিওরি অব এভরিথিংয়ের মতো সব কলাকে কেন্দ্রীভূত করে ‘আমার কলাই শ্রেষ্ঠ’ নামক বুকে মোচড় দিয়ে ওঠা বিজ্ঞপ্তি হতে হবে ভিশন। নিজের সমাজ বাস্তবতা বিষয়ে উদাসীন থাকলে ক্ষতি নেই। কিন্তু খাবলা খাবলা তত্ত্বীয় জ্ঞান ঝেড়ে দেওয়ার দক্ষতা থাকতে হবে। কিছু কিছু কোটেশন ঝাড়তে হবে। এক্ষেত্রে জিজেক ও চমস্কির মতো কিছু বিদেশি বুদ্ধিজীবীর কোটেশন ইংরেজি থেকে গুগল ট্রানসলেটরের মাধ্যমে অনুবাদ করে নিতে হবে, যা হবে হাস্যকর, খাপছাড়া এবং অবোধ্য। হ্যাঁ, ভাষা ব্যবহারে সতর্ক থাকতে হবে। প্রচলিত ভাষাকে বলাত্কার করতে হবে। কথ্য-অকথ্য গুরুচণ্ডাল-আঞ্চলিক-সাধু মিলিয়ে কিম্ভূত এক খিচুড়ি ভাষা ব্যবহার করতে হবে।

সমাজ উন্নয়নে কোনো ভূমিকা থাকুক বা না থাকুক, সবকিছুতে মত-মন্তব্য অবশ্যই থাকতে হবে। বাক্যবাগীশ হতে হবে। তর্কের কচকচিতে পারদর্শী হতে হবে। এ তর্ক হতে হবে লক্ষ্যহীন, শুধু তর্কের জন্য তর্ক। উদ্ভট ও উত্কট বিষয়ে আবেগপ্রবণ আলোচনা করতে হবে। যে কোনো আলোচনায় যৌনতাকে টেনে আনতে হবে। নারী ও নারীবাদীদের গালি দিতে হবে। আর নারীবাদী হলে প্রতিনিয়ত পুরুষদের বিরুদ্ধে শানিত বাক্য প্রয়োগ করতে হবে। নিজের অন্তরে যা-ই থাক, আলোচনার সময় বড় বড় দর্শন মেশাতে হবে। ক্রসফায়ারের বিরোধিতা করতে হবে। মৃতু্যদণ্ড যে মানবতা ও সভ্যতাবিরোধিতা তা নিয়ে সরব হতে হবে। ধর্ষণকারী, যুদ্ধাপরাধী, জঙ্গিদেরও যে মানববাধিকার আছে, তা উদাহরণ ও দৃষ্টান্তসহ তুলে ধরতে হবে। কিন্তু কেউ যদি জিগ্যেস করে—ভাই, আজ যদি তোমার পরিবাবের কেউ রেপ হতো তাহলে কি তুমিও তখনো এত সব থিওরি কপচাতে? তখনই জবাব দিতে হবে : নিজের পরিবার হলে শালা রেপিস্টের টুঁটি টিপে ছিঁড়ে দিতাম!

যে কোনো জঙ্গি আক্রমণ, জঙ্গিবাদী তত্পরতাকে প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয় দিতে হবে। কে মারল, সেটাকে আড়াল করে কেন মারল, সেটা নিয়ে তুমুল আলোচনা করতে হবে। যদি বলেন, ভাই তুমি কি তাহলে দরজায় তালা দাও বাড়ির বাইরে যাবার সময়? উত্তর দিতে হবে : তোমার মতো আবালের সঙ্গে তর্ক করতে নেই, এই দুইয়ের রেফারেন্স ফ্রেম আলাদা, সেটাই যার বোঝার ক্ষমতা নেই, তারা যে কেন তর্ক করতে আসে!

শব্দের প্রচলিত উচ্চারণ বর্জন করে ভিন্ন উচ্চারণ চালু করতে হবে। ফেসবুক হবে ‘ফেইক বুক’। ভল্টেয়ারকে বোদলেয়ার বলতে হবে। প্লেটোকে বলতে হবে প্লাতো।

ইতি-নেতি সবকিছুতে বাগড়া দিতে হবে। ব্যক্তিগত আক্রমণ করতে হবে। সমস্ত শালীনতা ও রুচিকে পদদলিত করে আপত্তিকর, নোংরা গালিসূচক শব্দ ব্যবহারে পারঙ্গম হতে হবে। গালিই হবে বুলি। খিস্তি-খেউর হবে অলংকার।

খুঁজে খুঁজে ব্যতিক্রমী বিষয় খুঁজে বের করতে হবে। প্রয়োজনে লুঙ্গি, শাড়ি, গামছা ইত্যাদি নিয়ে কথা বলার নামে এগুলোর ব্যবহারকারী এবং এই বস্ত্র দিয়ে যা ঢেকে রাখা হয়, তা অনাবৃত করে চুলকে দিতে হবে।

গান-বাজনা না বুঝলেও এ ব্যাপারেও মন্তব্য করতে হবে। খ্যাতিমান কোনো শিল্পী মারা গেলে বলতে হবে :‘সুর আছে, স্বর নাই, কণ্ঠ আছে দরদ নাই, আওয়াজ আছে ভাষা নাই।’ এ ধরনের ভাসা-ভাসা মন্তব্যের পর সিদ্ধান্েত আসতে হবে :‘সে আসলে কুনু শিল্পীই নহে।’

অতি অবশ্যই নিজেকে সবজান্তা মনে করতে হবে। আর নিজের একটা ঘরানা বা পরিমণ্ডল গড়ে তুলতে হবে। এজন্য কিছু বিপথগামীকে টার্গেট করে একত্রে মৌজ-মাস্তি করতে হবে, তাদের মধ্যে সবজান্তা মনোভাব জাগ্রত করে ‘ফ্যান’ বানাতে হবে। যাদের কাজ হবে একে-অপরের পিঠ চুলকে দেওয়া। নিজেরা যে যা বলবেন, করবেন তাকেই শাবাশি দিতে হবে, ‘হলো অনবদ্য’ বলে পিঠ চাপড়ে দিতে হবে। নিজেদের এই ক্ষুদ্র পরিমণ্ডলের বাইরে সবাইকে চরম অশ্রদ্ধা করতে হবে। নিজেকে ছাড়া সবাইকে তুচ্ছ, ক্ষুদ্রজ্ঞানে অবজ্ঞা করতে হবে। অন্যসব জ্ঞানী-গুণীকে ধামাধরা, পা-চাটা বলে সম্বোধন করতে হবে।

মৌলবাদ, ধর্মান্ধতা নিয়ে কুয়াশামাখা অবস্হান গ্রহণ করতে হবে। মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতির লবকুশদের ওপর ‘রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস’, তাদের দারিদ্র্য, বঞ্চনা নিয়ে প্রতিনিয়ত আবেগঘন স্ট্যাটাস রচনা করতে হবে। হিন্দু হলে হিন্দুদের মুণ্ডপাত করে বক্তব্য দিতে হবে। পক্ষান্তরে মুসলমান হলে নিজ সম্প্রদায়কে কটাক্ষ করে মত-মন্তব্য প্রকাশ করতে হবে।

প্রতিটি লেখায় থাকবে বিভ্রান্িত। কিছু বাস্তব কিছু মনগড়া আর কিছু আকর্ষণীয় বিষয়ের মিশ্রণে এই বিভ্রান্িত সৃষ্টি করতে হবে। অত্যন্ত সচেতনভাবে কদর্য ভাষা প্রয়োগ করতে হবে। যৌনতা ও যৌনাঙ্গসংক্রান্ত সব শব্দকে মুখের বুলিতে পরিণত করতে হবে। এটাকে অভ্যাসে পরিণত করতে হবে। কিছুদিন অভ্যাস করলে তারপর বড়-ছোট, আত্মীয়-অনাত্মীয়, দূরের বন্ধু বা কাছের বন্ধু পত্রপত্রিকা কি সামাজিক মাধ্যম, সবখানে এই সব শব্দরাশি নর্দমার পানির মতো উদ্গীরণ হতে থাকবে।

এ প্রসঙ্গে মনে পড়ছে বহুকাল আগের এক গল্প। একবার এক ভদ্রলোকের প্রবল বাসনা হলো লন্ডনে গিয়ে পাকাপাকিভাবে বসবাস করবেন। তাতে অসুবিধা হওয়ারও কথা নয়। কারণ বাপ-দাদা যে পরিমাণে সম্পত্তি রেখে গিয়েছে, তাতে তিনপুরুষ বসে বসে খেতে পারবে। সমস্যা দেখা দিল খাওয়া নিয়ে। তখন ইংল্যান্ডে ভাত বা ভাতের হোটেল ছিল না। ভাত পাওয়া যেত না। কিন্তু ভেতো বাঙালির ভাত ছাড়া চলবে কীভাবে?

তাহলে উপায়? এক পরম হিতাকাঙ্ক্ষী বন্ধু উপদেশ দিল, ‘এটা কোনো অসুবিধাই নয়। তোর তো লন্ডন যাওয়ার ঢের দেরি। এখন থেকেই নিয়মিত পাউরুটি খাওয়া অভ্যাস করে ফ্যাল।’

বন্ধুর আশ্বাস বলে কথা! অগত্যা তাই-ই শুরু করে দিল। অচিরে পাউরুটিতেই রীতিমতো অভ্যস্ত হয়ে উঠল, ভাতের জন্য আর কোনো অভাব বোধ করত না।

কিন্তু ঘটনাক্রমে বেচারির শেষ পর্যন্ত আর লন্ডন যাওয়া হয়ে ওঠেনি, কিন্তু খাদ্যের তালিকায় ভাতের পরিবর্তে পাউরুটি স্হায়ী আসন নিয়ে নিয়েছে। তা আর পালটাতে পারেনি। প্র্যাকটিস বলে কথা!

আলোচিত ও বিখ্যাত হওয়াটাও এখন তেমন প্র্যাকটিসের ব্যাপার। অনেকেই সফল হয়েছেন। চেষ্টা করলে আপনিও পারবেন। সত্যি কথা বলতে কি, আলোচিত কিংবা বিখ্যাত হওয়ার জন্য তত বেশি জ্ঞানের দরকার হয় না। ইচ্ছে এবং প্র্যাকটিসটাই আসল।

লেখক: রম্যরচয়িতা