১৯২১ সালের কথা। সৈয়দ মুজতবা আলী বিশ্বভারতীতে ভর্তি হতে এলেন। তখন মুসলিম ছাত্র ভর্তির ব্যাপারে অনেক আশ্রমিকেরই আপত্তি ছিল। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তো জহুরি। তাঁর চোখ মহামূল্যবান রত্নটিকে চিনতে ভুল করেনি। রবীন্দ্রনাথের ইচ্ছেতেই সব বাধা পেরিয়ে অবশেষে আশ্রমিকের তকমা জুটল সৈয়দ মুজতবা আলীর। গুরুদেবের সঙ্গে মুজতবা আলীর নিম্নোক্ত আলাপচারিতায় সেই সংকটের আভাস পাওয়া যায় বেশ ভালোভাবেই।
— মুজতবা আলীকে রবীন্দ্রনাথ বলছেন, ‘বলতে পারিস সেই মহাপুরুষ কবে আসবেন কাঁচি হাতে করে?’
মুজতবা লিখেছেন, ‘আমি তো অবাক। মহাপুরুষ তো আসেন ভগবানের বাণী নিয়ে, অথবা শঙ্খ, চক্র, গদা, পদ্ম নিয়ে। কাঁচি হাতে করে?’
রবীন্দ্রনাথ বললেন, ‘হাঁ হাঁ কাঁচি নিয়ে। সেই কাঁচি দিয়ে সামনের দাড়ি ছেঁটে দেবেন, পেছনের টিকি কেটে দেবেন। সব চুরমার করে একাকার করে দেবেন। হিন্দু-মুসলমান আর কতদিন আলাদা হয়ে থাকবে?’
কী মর্মান্িতক দুঃখের বিষয়—সৈয়দ মুজতবা আলীর মতো লেখককে পাকিস্তান এবং ভারত—উভয় দেশেই হেনস্হা হতে হয়েছে! তাঁর জন্ম হয় পিতার কর্মস্হল আসামের করিমগঞ্জ। তিনি প্রথমে ছিলেন ব্রিটিশ ভারতীয়, পরবর্তীকালে পাকিস্তানি, আবার হলেন ভারতীয় এবং সবশেষে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর হলেন বাংলাদেশি।
১৯৪৭ সালের আগস্টে দেশভাগের পর সৈয়দ মুজতবা আলী ১৯৪৯ সালের জানুয়ারিতে পূর্ব পাকিস্তানের বগুড়া কলেজে অধ্যক্ষ পদে যোগ দেন। কিন্তু তিনি প্রগতিশীল মতবাদে বিশ্বাসী থাকায় এবং পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা সম্পর্কে সরকারি নীতির বিরোধিতা করায় রোষানলে পড়েন পাকিস্তান সরকারের। গ্রেফতারি এড়াতে বাধ্য হয়ে তিনি চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে ১৯৪৯ সালের আগস্টে ভারতে ফিরে আসেন। এরপর কখনো অধ্যাপনা, কখনো ইন্ডিয়ান কাউন্সিল ফর কালচারাল রিলেশন্স-এর সচিব পদে, কখনো বা বেতার কেন্দ্রে স্টেশন ডাইরেক্টর পদে কর্মরত ছিলেন (১৯৪৯-১৯৫৬)। অতঃপর ১৯৬১ সালের আগস্টে বিশ্বভারতীর রিডার হিসেবে যোগ দেন। কিন্তু সেখানেও চরম দুঃখজনক ঘটনা ঘটে। ১৯৬৫ সালে যখন ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ বাধে তখন শান্িতনিকেতনে কিছু কুচক্রী সৈয়দ মুজতবা আলীর বিরুদ্ধে কুত্সা রটায় যে, তিনি নাকি পাকিস্তানের চর! কারণ তাঁর পরিবার থাকে পাকিস্তানে, তাঁর স্ত্রী পাকিস্তান সরকারের চাকুরে, তাহলে তিনি এখানে (ভারতে) কেন?’
এসব খবর শুনে ভারতের তত্কালীন শিক্ষামন্ত্রী হুমায়ুন কবির (বিশিষ্ট লেখক এবং ‘চতুরঙ্গ’ সাহিত্য পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা-সম্পাদক) দিল্লি থেকে ফোন করে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। কিন্তু অপপ্রচারকারীরা থেমে থাকেনি। তাদের প্ররোচনায় স্হানীয় পুলিশ একদিন মুজতবা আলীর বাড়িতে তল্লাশি চালায়। বেআইনি কিছু না পেলেও পুলিশবাহিনী তাঁর ভারতীয় পাসপোর্ট বাজেয়াপ্ত করে নিয়ে যায়। বিষয়টি স্বয়ং ভারতের তত্কালীন তথ্যমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কানেও গিয়েছিল। শুনে তিনি অত্যন্ত ক্ষিপ্ত হয়ে মুজতবা আলীকে পাসপোর্ট ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেন।
কিন্তু সমস্ত অবিশ্বাসের বিষয়টায় সৈয়দ মুজতবা আলী মনে প্রচণ্ড আঘাত পান ও অপমানিতবোধ করেন। মনের ওপর এসব ঘটনা এতটাই চাপ ফেলে যে, ১৯৬৫-৬৬ সময়কালে পরপর তিনবার তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। এরপর বাংলাদেশ স্বাধীন হলে চলে আসেন ঢাকায়। গ্রহণ করেন বাংলাদেশের নাগরিকত্ব।
বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী, কিছুটা প্রতিষ্ঠানবিরোধী, বর্ণময় এই মানুষটির জীবন পুরোপুরি রবীন্দ্ররসে জারিত। তিনি এ ব্যাপারে লিখেছেন—‘এ আমি নিশ্চয় করে জানি যে, আমার মনোজগত্ রবীন্দ্রনাথের গড়া...।’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ কবিতা এবং ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ প্রবন্ধ তাঁর মুখস্ত ছিল। বৈঠকি মেজাজটা তাঁর সহজাত, সব রকম লেখায় সর্ব অবয়বে তা প্রতিফলিত। সেইসঙ্গে যুক্ত হয়েছে রসজ্ঞান এবং বৈদগ্ধ। বহু ভাষাবিদ পণ্ডিত সৈয়দ মুজতবা আলী আরবি, ফারসি, উদুর্, সংস্কৃত, মারাঠি, গুজরাতি, ইংরেজি, ফরাসি, ইতালিয়ান, জার্মান ইত্যাদি ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেন। ভাষাতত্ত্ব ও ধর্মতত্ত্বে তাঁর অসাধারণ পাণ্ডিত্যের জন্যে তিনি ‘বিশিষ্ট বিশেষজ্ঞ’-এর স্হান অধিকার করেন।
ব্যঙ্গ ও রঙ্গ-রসিকতা তাঁর প্রায় সব ধরনের লেখায় অপূর্ব ফল্গুধারায় প্রবাহিত। ভ্রমণকাহিনি, উপন্যাস, সাহিত্য সমালোচনা ও মননশীল প্রবন্ধ মিলিয়ে তাঁর বিপুল সংখ্যক রচনায় পাণ্ডিত্য ও সৃজনশীলতার বিচিত্র অভিব্যক্তি লক্ষণীয়। দেশে-বিদেশে, পঞ্চতন্ত্র, চাচা কাহিনী, ময়ূরকণ্ঠী, জলে-ডাঙায়, শবনম, টুনিমেঘ, বড় বাবু, শহর-ইয়ার, কত না অশ্রুজল তাঁর রচিত উল্লেখযোগ্য গ্রম্হ।
তাঁর ছিল অপার হিউমার-বোধ। শত কষ্টেও হাস্যরস পরিত্যাগ করেননি। ড. আশরাফ সিদ্দিকী একটি লেখায় জানিয়েছেন, ঢাকায় ১৯৭০ সালে এক আড্ডায় সৈয়দ মুজবতা আলী তাঁকে শুনিয়েছিলেন—‘দুনিয়ার কে কে হাসিতে ডক্টরেট? হাসতে পারতেন কারা কারা? হাসিও একটা আর্ট। হাসতেন নজরুল ইসলাম। যাকে বলে কাঠফাটা হাসি। হাসতেন ডি. এল. রায়। প্রমথ চৌধুরী। প্রমথ বিশী। কিন্তু ‘র-ব’ আদ্যাক্ষরধারীরা হাসতে জানতেন না। র মানে রবীন্দ্রনাথ, ব মানে বুদ্ধদেব ইত্যাদি।’
‘মুজতবা আলীর রসবোধ’ প্রবন্ধে রশীদ করীম লিখেছেন, ‘মুজতবা সাহেব হাসপাতালে, শরীরের ডান দিকে পক্ষাঘাত। দেখে খুব খারাপ লাগল, কিন্তু মুজতবা সাহেব নিজে যথারীতি ফুর্তির ফোয়ারা, একটু পরেই মনে হলো, একজন রোগীকে দেখতে আসিনি, এসেছি একটি উত্সবে, পাণ্ডিত্য আর হূদয়বেত্তার সঠিক আনুপাতিক মিশেলে যিনি হাস্যরসকে বাংলা সাহিত্যে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন...।’
রসগোল্লার মতো অপূর্ব রসজারিত সৈয়দ মুজতবা আলী ১৯৭৪-এর ১১ ফেব্রুয়ারি ঢাকাতে চিরনিদ্রায় শায়িত হন।