যে গুটিকয়েক মানুষ মানবসভ্যতায় বিশ্বরাজনৈতিক অঙ্গনে বাঁক পরিবর্তন করেছিলেন, নিঃসন্দেহে আব্রাহাম লিংকন তাদের একজন। যুক্তরাষ্ট্র তথা পশ্চিমা বিশ্বের জাতিগত বৈষম্য দূর করতে তিনি আবিভূর্ত হয়েছিলেন। ঠিক যেমন বাংলার মানুষের মুক্তির ত্রাতা হয়ে এসেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান (দুজনের মধ্যে আরো একটি সাদৃশ্য হলো, দুজনেরই দেওয়া দুটি ভাষণ বিশ্বের বুকে ইতিহাস হয়ে উঠেছে)। আব্রাহাম লিংকন ১৮০৯ সালের ১২ ফেব্র‚য়ারি, হোডজেনভিল, কেন্টাকিতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম থমাস লিংকন। মাত্র ৯ বছর বয়সে তিনি তার মা ন্যান্সি লিংকনকে হারান। শত দরিদ্রতার মধ্যেও তার পিতার উত্সাহে তিনি পড়ালেখা চালিয়ে যান। শৈশবে লিংকন কেন্টাকি, ইন্ডিয়ানা ও ইলিনয়েসে বড় হয়ে ওঠেন। শৈশবে তিনি ইন্ডিয়ানা স্কুলে পড়তেন। বন্ধুদের বই ধার করে তিনি পড়ালেখা করতেন। ১৮৩৬ সালে আইনজীবী পরীক্ষায় কোয়ালিফাই করার পর স্পি্রং ফিল্ড বারে আইন পেশায় যোগদান করেন। লিংকন ইলিনয়েস থেকে ১৮৩৪-১৮৪২ পর্যন্ত মোট চার বার স্টেট আইন সভার সদস্য নির্বাচিত হন। হুইগ পার্টির প্রার্থী হিসেবে হাউজ অব রিপ্রেজেনটেটিভ (১৮৪৭-১৮৪৯) নির্বাচিত হন (সূত্র: বিবিসি নিউজ)।
দাসপ্রথার বৈধতার বিষয়ে স্ব-স্ব স্টেটকে ক্ষমতা অর্পণ করে ‘কানসাস নেব্রাসকা অ্যাক্ট অব ১৮৫৪’ ইউএস কংগ্রেসে পাশ করা হয়। উক্ত আইনের বিরুদ্ধে উত্তরাঞ্চলের ৩৪টি স্টেটে প্রচণ্ড বিক্ষোভ প্রদর্শন করা হয়। লিংকন ১৮৫৪ সালে হুইগ পার্টি থেকে নবগঠিত রিপাবলিকান পার্টিতে যোগদান করেন। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্ত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত উন্নতি লাভ করতে থাকে। উত্তরাঞ্চলের স্টেটগুলো শিল্প বিপ্লবের ছোঁয়া লাগে। সড়ক ও জনপথ, রেলপথ উন্নয়নের কাজ দ্রুতগতিতে এগোতে থাকে। পক্ষান্তরে দক্ষিণাঞ্চলের স্টেটগুলো দাসনির্ভর কৃষি-তুলা, তামাক উত্পাদন এবং তাঁতশিল্পের ওপর নির্ভরশীল ছিল। তাদের আয়ের প্রধান উত্স ছিল দাসব্যবসা। ইতিপূর্বে কোনো প্রেসিডেন্ট দাসপ্রথা বিলুপ্তির নিমিত্তে সংবিধান সংশোধনের কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি। পক্ষান্তরে ১৮৬০ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগেই লিংকন দাসপ্রথা বিলুপ্তির পক্ষে স্পষ্ট অবস্থান নেন। উক্ত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে উত্তরাঞ্চলের জনগণের ব্যাপক সমর্থন লিংকনকে বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যায়। দক্ষিণাঞ্চলের জনগণের মধ্যে উগ্র শ্বেতাঙ্গবাদ প্রবল থাকায় এবং কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতি ক্ষোভ ও অবজ্ঞার কারণে গৃহযুদ্ধ সৃষ্টিতে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখে।
আব্রাহাম লিংকন ১৮৬১ সালের ৪ মার্চ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন (১৮৬১ সালের ৪ মার্চ-১৮৬৫ সালের ১৫ এপ্রিল)। ১৮৬১ সালের ফেব্র‚য়ারি ১২, দক্ষিণাঞ্চলের সাতটি স্টেট সাউথ ক্যারোলিনা, ফ্লোরিডা, জর্জিয়া, অ্যালাবামা, মিসিসিপি, লুইজিয়ানা, টেক্সাস মূল ইউনাইটেড স্টেট (ইউনিয়ন) থেকে বেরিয়ে ‘কনফেডারেট স্টেট অব আমেরিকা’ গঠন করে। ১৮৬১ সালের ১২ ফব্র‚য়ারি, কনফেডারেটের আর্টিলারি বাহিনী, ইউনিয়ন বাহিনীর অধীনস্থ ফোর্ট সামটার লক্ষ্য করে গোলা বর্ষণ করে। উল্লিখিত ফোর্টে ইউনিয়ন বাহিনী আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। এপ্রিল ১৫ প্রেসিডেন্ট আব্রাহম লিংকন কনফেডারেট স্টেটের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন এবং সাউথ ক্যারোলিনায় ফেডারেল বাহিনীর (ইউনিয়ন) ৫ লাখ সৈন্য প্রেরণ করেন। এরপর দক্ষিণের দাসনির্ভর চারটি স্টেট ভারজিনিয়া, নর্থ ক্যারোলিনা, আরকানসাস এবং টেনাসি ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যায়। মোট ১১টি স্টেট মূল যুক্তরাষ্ট্র থেকে বেরিয়ে জেফারসন ডেভিসের নেতৃত্বে ‘কনফেডারেট স্টেট অব আমেরিকা’ গঠন করে এবং জেফারসন প্রেসিডেন্টের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। পক্ষান্তরে উত্তারঞ্চলের ৩৪টি স্টেট দাসপ্রথা বিলুপ্তির পক্ষে প্রেসিডেন্ট লিংকনকে সর্বাত্মক সমর্থন দেন।
১৮৬২ সালের ২২ সেপ্টেম্বর, প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন ‘মুক্তির ঘোষণা’ (ইমানসিপেশন প্রক্লেমেশন) একটি নির্বাহী আদেশ ইসু্য করেন, যা ১৯৬৩ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকরের ঘোষণা দেওয়া হয়। আনুষ্ঠানিক ঘোষণায় প্রেসিডেন্ট লিংকন বলেন, উল্লিখিত স্টেটসমূহে কৃতদাস হিসেবে যারা বন্দি রয়েছেন, তারা এখন থেকে স্বাধীন, মুক্ত। দাসপ্রথা এই মুহূর্ত থেকে বিলুপ্ত বলে গণ্য হবে।
১৮৬৩ সালের ১৯ নভেম্বর, প্রেসিডেন্ট লিংকন পেনসিলভানিয়ার গেটিসবার্গের যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে এক হূদয়স্পর্শী ভাষণে বলেন, ‘আমাদের পূর্বপুরুষরা আমাদের জন্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্র উপহার দিয়েছেন। তাদের প্রতি আমরা সমগ্র জাতি ঐক্যবদ্ধভাবে দলমত, ধর্ম, বর্ণ-নির্বিশেষে যদি বিনম্র শ্রদ্ধা জানাতে পারি তবেই তাদের আত্মা শান্িত পাবে।’ তিনি বলেন, ‘গণতন্ত্র হলো জনগণের সরকার, জনগণের দ্বারা সরকার, জনগণের জন্য সরকার।’ দুই মিনিটে বদলে গেল গণতন্ত্রের সংজ্ঞা।
১৮৬৪ সালে আব্রাহাম লিংকন দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, কূটনৈতিক প্রজ্ঞা লিংকনকে সফল ও জনপ্রিয় রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। ১৮৬৫ সালের জানুয়ারি, ইউনিয়ন বাহিনীর নিকট কনফেডারেট বাহিনী পর্যায়ক্রমে পরাজয় বরণ করতে থাকে। ১৮৬৫ সালের ৯ এপ্রিল, জেফারসন ডেভিসের নেতৃত্বাধীন কনফেডারেট বাহিনীকে পরাজিত করে প্রেসিডেন্ট লিংকনের নেতৃত্বাধীন ‘ইউনিয়ন’ বাহিনী জয়লাভ করে। ৯ এপ্রিল, কনফেডারেট বাহিনীর কমান্ডার রবার্ট ই লি ‘ইউনিয়ন বাহিনীর’ কমান্ডার ইউলিশিস এস গ্রান্টের নিকট আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে গৃহযুদ্ধের অবসান হয়। গৃহযুদ্ধে প্রায় ৬ লাখ ২০ হাজার সৈন্য নিহত এবং ৩ লক্ষাধিক সৈন্য আহত হয়। এর পরের ইতিহাস আরো নিষ্ঠুর, বেদনাদায়ক ও মর্মান্তিক।
১৮৬৫ সালের ১৪ এপ্রিল, প্রেসিডেন্ট লিংকন রাতে স্ত্রী মেরির সঙ্গে ফোর্ডস অডিটরিয়ামে প্রেসিডেন্সিয়াল কেবিনে থিয়েটার দেখছিলেন। জুলিয়াস সিজার নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছিল। নাটকটি রাত ১০:১৫ মিনিটে যখন ক্লাইমেক্সে উপনীত হয় তখন হঠাত্ করে থিয়েটারের অভিনেতা জন উইলকেস বোথ (কনফেডারেটর এর কট্টর সমর্থক) স্টেজ থেকে লাফিয়ে পড়েন এবং ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে .৪৪ ক্যালিবারের ডেরেঞ্জারের পিস্তল থেকে লিংকনের মাথায় গুলি চালান। রক্তাক্ত অবস্থায় লিংকন মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। ১৮৬৫ সালের ১৫ এপ্রিল, সকালে পিটারসন হাউজে প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।
গণতন্ত্রের পুরোধা, গৃহযুদ্ধ অবসানের এবং ক্রীতদাসপ্রথা বিলুপ্তির মহানায়ক আব্রাহাম লিংকন বিশ্ববাসীর হূদয়ে চির অম্লান ও চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
লেখক: প্রাক্তন সাংগঠনিক সম্পাদক,
জাতীয় চার নেতা পরিষদ