কোনো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য বিনিয়োগ বৃদ্ধির বিকল্প নেই। দেশীয় উদ্যোক্তাগণের বিনিয়োগ, প্রবাসী বিনিয়োগ অথবা বৈদেশিক বিনিয়োগ—সব ধরনের বিনিয়োগই দেশের জন্য কল্যাণকর। এসব বিনিয়োগের আগে উৎপাদিত পণ্যের চাহিদা, কাঁচামালের পর্যাপ্ততা, পণ্যের বিক্রয়মূল্য, সম্ভাব্য লাভ ইত্যাদি বিষয়ে পর্যালোচনা করে উদ্যোক্তাগণ ঝুঁকি গ্রহণ করে থাকেন। বৈদেশিক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রধানত বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো পণ্যের চাহিদা, বাজার, উৎপাদন খরচ ইত্যাদি মূল্যায়ন করে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
বিশ্বের অনেক দেশই বৈদেশিক বিনিয়োগের গুরুত্ব উপলব্ধি করে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং তাদের জীবনযাত্রার মানের উন্নয়ন ঘটাতে সক্ষম হয়েছে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, মালেয়েশিয়ায় অটোমোবাইল শিল্পে প্রচুর পরিমাণ বৈদেশিক বিনিয়োগ হয়েছে এবং এ শিল্পে কর্মরত রয়েছেন ৭ লাখ মালেয়েশিয়ান নাগরিক। বৈদেশিক বিনিয়োগে আকৃষ্ট করতে কয়েকটি বিষয়ে আলোকপাত করা প্রয়োজন। ধরা যাক, জাপান অথবা দক্ষিণ কোরিয়ার বহুজাতিক কোম্পানি বাংলাদেশে ইলেকট্রনিকস এবং ইলেকট্রিক্যাল প্রোডাক্ট উৎপাদনের জন্য বিবেচনা করছে। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সম্পর্কে উক্ত বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানটির ইতিবাচক ইমপ্রেশন থাকা অপরিহার্য। পরিচ্ছন্ন দেশ, পরিচ্ছন্ন শহর, সুন্দর-মনোরম পরিবেশ ইত্যাদি কোনো দেশ সম্পর্কে ইতিবাচক ইমপ্রেশন তৈরিতে সহায়ক। মালেয়েশিয়ার সুন্দর, মনোরম ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশ বৈদেশিক বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করেছিল। অন্যদিকে, অপরিচ্ছন্ন ও অস্বাস্হ্যকর পরিবেশ কোনো দেশ সম্পর্কে নেতিবাচক ইমপ্রেশন তৈরি করে।
আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বিনিয়োগ বৃদ্ধির অন্তরায়। এর জটিলতা নিরসনে ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু করা প্রয়োজন। ভিয়েতনাম বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে এই প্রক্রিয়ার প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড হ্রাস করেছে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা হ্রাস বিনিয়োগকে আকৃষ্ট করে। মালেয়েশিয়ার উৎপন্ন গাড়ি ‘প্রোটন’ এবং ‘পেরোডুয়া’ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাওয়া যায়। আমাদের দেশে বৈদেশিক বিনিয়োগ সম্ভব হলে আমাদের পক্ষেও সম্ভব ইনশাআল্লাহ। মালেয়েশিয়ার কিছু এজেন্সি ছিল, যেগুলো সম্ভাব্য বৈদেশিক বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করেছিল এবং বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়েছিল। ঐ এজেন্সিগুলোর ছিল শক্তিশালী নেটওয়ার্ক এবং কানেকটিভিটি। শুধু বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে মালেয়েশিয়া সক্ষম হয়নি বরং বিনিয়োগকারীদের ‘সেকেন্ড হোম’ হিসেবে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে সন্তুষ্ট রাখতে সক্ষম হয়েছিল। অর্থনৈতিক জোন বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে এবং বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে সহায়তা করে। ২০১৬ সালে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক জোন কর্তৃপক্ষ—বেজা প্রতিষ্ঠার পর থেকে সাত বছরে ৯৭টি অর্থনৈতিক জোনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে উৎপাদনে গেছে আটটি জোন। যেখানে কর্মসংস্হান হয়েছে ৪১ হাজার মানুষের। এর বাইরে আরো ২৮টি জোনের উন্নয়নকাজ চলমান রয়েছে। অর্থনৈতিক জোনের জন্য ৬১ হাজার জমির অধিগ্রহণ করা হয়েছে।
ইতিমধ্যে পাঁচটি অর্থনৈতিক অঞ্চল শেখ মুজিব শিল্পনগর, মহেশখালী, শ্রীহট্ট, জামালপুর অর্থনৈতিক অঞ্চল ও সাবরাং টু্যরিজম পার্কে ১৬৮টি বিনিয়োগকারীর অনুকূলে সর্বমোট ৭ হাজার ২১৫ একর জমি ইজারা প্রদানে নির্বাচন করা হয়েছে। এগুলো বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে বলে আশা করা যায় এবং এতে বৃদ্ধি পাবে কর্মসংস্হান। আমাদের দেশের বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার জন্য বিনিয়োগ প্রণোদনা দেওয়া এবং বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। ট্যাক্সের পরিমাণ হ্রাস, রপ্তানি প্রণোদনা, হোটেলসংক্রান্ত প্রণোদনা, বিনিয়োগের স্হানসংক্রান্ত প্রণোদনা ইত্যাদি প্রচলন করা সম্ভব হলে বৈদেশিক বিনিয়োগ আকৃষ্ট করবে বলে আশা করা যায়। বাণিজ্য-সহায়ক প্রতিষ্ঠানসমূহ—যেমন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কতৃর্পক্ষ ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানের আরো কার্যকর ভূমিকা পালন করা প্রয়োজন।
বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে বিনিয়োগবান্ধব মুদ্রানীতি, রাজস্বনীতি ও বাণিজ্যনীতি প্রণয়ন প্রয়োজন। দেশে বৈদেশিক বিনিয়োগে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো এগিয়ে এলে সেখানে বাংলাদেশিদের কর্মসংস্হানের সুযোগ সৃষ্টি করা বাঞ্ছনীয়। এতে বেকারত্ব লাঘব হবে এবং আয়ের স্তর বৃদ্ধির মাধ্যমে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল হবে। প্রশিক্ষিত ও প্রশিক্ষণযোগ্য জনবল যে কোনো দেশের জন্য সম্পদ বলে বিবেচিত। স্পেশাল ইকোনমিক জোনগুলোতে পর্যাপ্ত গ্যাস, বিদু্যত্সংযোগসহ গুদামজাতকরণের পর্যাপ্ত ব্যবস্হা থাকতে হবে। বৈদেশিক বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার জন্য অবকাঠামোগত উন্নয়ন অপরিহার্য। দূষণ ও যানজটমুক্ত পরিবেশ, উন্নত সড়ক, রেল ও আকাশপথে যোগাযোগ ব্যবস্হা, স্হিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ, দুর্নীতিমুক্ত ব্যবস্হা ইত্যাদি অবশ্যই বিনিয়োগ বৃদ্ধির সহায়ক। এগুলো করতে পারলে বৃদ্ধি পাবে আমাদের দেশের ইমপ্রেশন, যা অবশ্যই বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। দেশীয় উদ্যোক্তাগণের বিনিয়োগ, প্রবাসীগণের বিনিয়োগ অথবা বৈদেশিক বিনিয়োগ যে কোনো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে একান্ত কাম্য। সঠিক পরিকল্পনা এবং এর সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমে বৈদেশিক বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধি করতে পারলে মালেয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডের মতো আমরাও আরো শক্তিশালী অর্থনীতি তৈরি করতে পারব। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়াসহ অন্যান্য দেশের বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আকৃষ্ট করা এবং বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে আমাদের বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা হতে পারে বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ টার্গেট।
বিশেষ করে, এখানে উল্লেখ করতে চাই, ঢাকা শহরের নিউমার্কেট এলাকা, শাহবাগ ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় অনেক সময় মনুষ্যবর্জে্যর দুর্গন্ধ এখনো পাওয়া যায়। ঢাকা শহরে বিপুলসংখ্যক ভবঘুরে দরিদ্র মানুষ রয়েছে এবং এ সব ভবঘুরে দরিদ্র মানুষের পুনর্বাসন ছাড়া এবং বিপুলসংখ্যক টয়লেট নির্মাণ ছাড়া শহর পরিচ্ছন্ন রাখা সম্ভব নয়। তাছাড়া জনগণের সুশৃঙ্খল ও বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ, ট্রাফিক আইন মেনে চলা, নিয়মতান্ত্রিক ব্যবস্হা, দূষণমুক্ত পরিবেশ ইত্যাদি কোনো দেশ সম্পর্কে ইতিবাচক ইমপ্রেশন তৈরি করে। ভিক্ষুকদের পুনর্বাসন প্রয়োজন। মালেয়েশিয়া বিদেশি নাগরিকগণের জন্য ইতিবাচক ইমপ্রেশন তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে, যা বৈদেশিক বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে সহায়তা করেছে। বাংলাদেশের অনেক সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে টয়লেটের মান এবং রক্ষণাবেক্ষণ যথেষ্ট ভালো নয় এবং এগুলোর উন্নয়ন প্রয়োজন এবং টয়লেট ব্যবহারকারীদের মানসিকতার পরিবর্তন প্রয়োজন। এগুলো ইমপ্রেশন তৈরিতে সহায়ক। যেখানে-সেখানে ময়লা আবর্জনা, থুতু ফেলা ইত্যাদি মানসিকতার পরিবর্তন প্রয়োজন। এ প্রসঙ্গে একটি ঘটনার বর্ণনা করতে চাই। ১৯৮৯ সালের কথা। আমি তখন অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। ছোট চাচার (তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সবে মাস্টার্স শেষ করেছেন) সঙ্গে গিয়েছিলাম মিরপুর স্টেডিয়ামে। তখন মিরপুর স্টেডিয়াম নতুন উদ্বোধন হয়েছে। স্টেডিয়াম গিয়েছিলাম প্রেসিডেন্ট গোল্ড কাপ ফুটবলের বাংলাদেশ বনাম থাইল্যান্ডের ফুটবল খেলা দেখতে। স্টেডিয়ামে ঢোকার আগে খেয়াল করলাম, একটি পাজারো গাড়িতে করে থাইল্যান্ডের কয়েক জন দর্শক এসেছেন। মনে হলো বড় কর্মকর্তাগণ হবেন। গাড়িটি স্টেডিয়ামের কাছে আসা মাত্রই গ্যালারির উপর থেকে ময়লা আবর্জনা গাড়িটিতে নিক্ষেপ করল দর্শকগণ! এ ধরনের আচরণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বিদেশি মেহমানদের সঙ্গে সুন্দর আচরণ একান্ত কাম্য। আমাদের দেশকেও আমরা সুন্দর ও মনোরম করতে পারি। আমাদের দেশের ক্যান্টনমেন্ট এলাকাগুলোর পরিবেশ খুবই চমৎকার।
পরিশেষে আমরা বলব, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য এ দেশে তাদের সুযোগ-সুবিধার প্রতি আমাদের নজর রাখতে হবে। তাদের পর্যাপ্ত বিনোদনের ব্যবস্হা করতে হবে। সর্বোপরি, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
লেখক: অধ্যাপক, ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট