চালের ক্রমাগত মূল্যবৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি উপজেলা পর্যায়ে ওএমএস চালু হয়েছে। ১ হাজার ৭৬০ জন ডিলারের মাধ্যমে খোলা বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে চাল ও আটা। এর আগে থেকেই ঢাকা ও বিভাগীয় শহরগুলোতে নির্ধারিত মূল্যে বিক্রি করা হচ্ছে সরকারি চাল ও আটা। ওএমএসের মাধ্যমে বিক্রি করা চালের দাম ৩০ টাকা কেজি এবং আটার কেজি ১৮ টাকা। ওএমএস যাতে সঠিকভাবে পরিচালিত হয়, সেজন্য খাদ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরে মনিটরিং টিম গঠন করা হয়েছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও অনুরূপ মনিটরিং টিম গঠনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এখন চালের মজুত সর্বকালের সর্ববৃহত্। সরকারি গুদামে সংরক্ষিত চালের পরিমাণ প্রায় ১৬ লাখ মেট্রিক টন। সেই সঙ্গে গম আছে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ মেট্রিক টন। ধান আছে ৩৮ হাজার মেট্রিক টন। সব মিলে প্রায় ২০ লাখ মেট্রিক টন খাদ্যশস্যের মজুত রয়েছে। তাছাড়াও আমন ধান কাটা কেবলই শেষ হয়েছে। বাজারে আমন ধানের চাল আসতে শুরু করেছে। ইতিমধ্যে চাল আমদানি করা হয়েছে প্রায় পৌনে ৯ লাখ টন। গমও আমদানি করা হয়েছে প্রায় সাড়ে ২০ লাখ টন। তার পরও বাজারে চাল ও আটার দাম বাড়ছে। এর উপযুক্ত ব্যাখ্যা অনুসন্ধান করা প্রয়োজন।
সরকারের কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ পরিবেশিত তথ্য অনুসারে ২০২০-২১ সালে মোট চাল উৎপাদিত হয়েছে ৩৮৬ লাখ টন। এর আগের বছর উৎপাদিত হয়েছিল ৩৬৬ লাখ টন। এবার আমন ধানের উৎপাদন ভালো হয়েছে। নূ্যনতম পক্ষে ১ কোটি ৫০ লাখ টন চাল যুক্ত হয়েছে আমন ধান থেকে। তাতে বাজারে চালের সরবরাহ কম আছে বলে ধরে নেওয়ার কোনো কারণ নেই। তার পরও বাড়ছে চালের দাম। এখন ঢাকার বাজারে মোটা চালের দাম ৪৫ থেকে ৫০ টাকা কেজি। মাঝারি চালের দাম প্রতি কেজি ৫৫-৬০ টাকা। চিকন চালের দাম ৭০-৮০ টাকা। সুগন্ধি সরু চালের দাম ১০০ টাকার ওপরে। বাংলাদেশে আমন ধান একটি গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যশস্য। মোটা ধান উৎপাদনের ৩৭ শতাংশই আসে আমন মৌসুমে। এই মৌসুমের শেষ প্রান্েত এসে চালের দাম স্হিতিশীল থাকার কথা, বাড়ার কথা নয়। তদুপরি আমদানিকৃত চাল ও গমের কথা বিবেচনায় নিলে বর্তমানে চালের দ্রুত মূল্য বৃদ্ধির বিষয়টি অস্বাভাবিকই মনে হবে। সাধারণত উৎপাদন কম হলে এবং বাজারে চালের সংকট থাকলে দাম বাড়ে। কিন্তু প্রাপ্ত পরিসংখ্যান থেকে উৎপাদন ও বিতরণে কোনো ঘাটতি পরিলক্ষিত হয় না।
প্রশ্ন হচ্ছে, আমাদের প্রয়োজন মেটানোর জন্য কত লাখ মেট্রিক টন চালের চাহিদা আছে? বাংলাদেশ পরিসংখ্যান বিভাগের হিসাব অনুসারে মাথাপিছু ১৫২ কেজি চালের প্রয়োজনীয়তা ধরে নিয়ে আমাদের বার্ষিক চালের চাহিদা নিরূপণ করা যায়। বর্তমানে দেশে ১৭ কোটি মানুষ আছে। তাতে বার্ষিক খাদ্যচাহিদা দাঁড়ায় ২ কোটি ৫৮ লাখ মেট্রিক টন চাল। এর সঙ্গে বীজ ও অপচয় এবং পশুখাদ্য বাবদ ১৫ শতাংশ যোগ করে মোট চালের প্রয়োজন দাঁড়ায় ২ কোটি ৯৬ লাখ টন বা প্রায় ৩ কোটি টন। দৈনিক চালের চাহিদা আরো বেশি বিবেচনায় নিয়ে মাথাপিছু দৈনিক আধা কেজি বা বার্ষিক জনপ্রতি ১৮২.৫০ কেজি হিসেবে চালের চাহিদা দাঁড়ায় ৩ কোটি ১০ লাখ ২৫ হাজার মেট্রিক টন। বীজ, অপচয় ও পশুখাদ্য হিসেবে আরো ১৫ শতাংশ যোগ করা হলে মোট চাহিদা দাঁড়ায় ৩ কোটি ৫৬ লাখ ৭৮ হাজার মেট্রিক টন। এ পরিমাণ চাল আমরা প্রতি বছরই উৎপাদন করছি। এর পরও বাজারে আসছে আমদানিকৃত চাল ও গম। তার পরও মূল্য বৃদ্ধির হেতু কী? আমাদের মোট উৎপাদনের যে হিসাব প্রতি বছর দেওয়া হয় তা সঠিক আছে তো? ২০১৯-২০ সালে দেশে মোট খাদ্যশস্য উৎপাদন হয়েছে ৪ কোটি ৩০ লাখ মেট্রিক টন। এর মধ্যে চাল ৩ কোটি ৬৬ লাখ টন। ২০২০-২১ অর্থবছরে মোট খাদ্যশস্যের উৎপাদন হয়েছে ৪ কোটি ৫৫ লাখ মেট্রিক টন। এর মধ্যে চাল ৩ কোটি ৮৬ লাখ টন। তার পরও আমদানি করতে হচ্ছে বিপুল পরিমাণ চাল ও গম। ২০২০-২১ অর্থবছরে আমদানি করা হয়েছে ৬৭ লাখ টন চাল ও গম। এর মধ্যে চাল ১৩.৫৯ লাখ টন। এবার ইতিমধ্যেই আমদানি করা হয়েছে ২৯ লাখ টন খাদ্যশস্য। তার মধ্যে চালের পরিমাণ ৮ লাখ ৭৭ হাজার মেট্রি টন। মোটা দাগে প্রতি বছর গড়ে আমরা চাল আমদানি করছি ১০ থেকে ১৫ লাখ টন, গম ৫০ থেকে ৬০ লাখ টন এবং ভুট্টা ২০ থেকে ২৫ লাখ টন। এর পরও আমরা খাদ্যোত্পাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ বলে দাবি করছি। অন্যদিকে চালের দাম, আটার দাম হুহু করে বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাতে জীবনধারণ কঠিন হয়ে পড়ছে সাধারণ মানুষের। সাম্প্রতিক তথ্য থেকে দেখা যায়, চালের মূল্যস্ফীতির পরিমাণ সাধারণ মূল্যস্ফীতির চেয়ে দ্বিগুণের বেশি। গত বছর এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ছয় মাসে চালের মূল্যস্ফীতির হার ছিল ১৫.৮২ শতাংশ। এ সময় সাধারণ মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৫.৬৪ শতাংশ। দরিদ্র পরিবারগুলোর ক্ষেত্রে তাদের মাসিক আয়ের প্রায় ৭০ শতাংশ ব্যয় হয় খাদ্যের পেছনে। এ জনগোষ্ঠীর চাল ভোগের পরিমাণ অন্যদের তুলনায় বেশি। তাই চলের মূল্যস্ফীতি দরিদ্র জনগণের প্রকৃত আয় কমিয়ে দেয়। খাদ্য ব্যয় বৃদ্ধি পেলে তা মিটিয়ে অবশিষ্ট অর্থ দিয়ে অন্যান্য খরচ মেটাতে তাদের হিমশিম খেতে হয়। অনেক সময় অন্য মৌলিক প্রয়োজনগুলো তাদের অপূর্ণই থেকে যায়। বর্তমানে বাজারে চালের যে দাম তা খুবই অস্বাভাবিক। প্রশ্ন হচ্ছে, চালের দাম প্রতি কেজি কত টাকা হওয়া উচিত? এ প্রশ্নের উৎতর খুঁজতে হলে চালের উৎপাদন খরচ জানা দরকার। সরকারি প্রতিষ্ঠানের হিসাবে গত আমন মৌসুমে চালের উৎপাদন খরচ ছিল প্রতি কেজি ৩৮ টাকা। ধান ২৫ টাকা। গত বোরো মৌসুমে ছিল প্রতি কেজি চালের উৎপাদন খরচ ৩৭ টাকা, ধানের ২৫ টাকা। এর সঙ্গে ২০ শতাংশ মুনাফা যোগ করা হলে ধানের প্রতি কেজি দাম ৩০ টাকা এবং চালের প্রতি কেজি দাম ৪৪ টাকা হওয়া উচিত। দেশে উৎপাদনকারী কৃষক এ দাম কখনই পায়নি। কিন্তু ভোক্তারা তার চেয়ে অনেক বেশি মূল্য দিয়ে বাজার থেকে চাল কিনে নেয়। লাভবান হয় মধ্যস্বত্বভোগী ব্যবসায়ী, চালকল মালিক ও আড়তদার। তাদের কারসাজি অনুধাবন করা যায়। কিন্তু সরকারের অব্যবস্হাপনার কারণে এর প্রতিবিধান সম্ভব হয় না।
সরকার প্রতি বছর ধান ও চাল সংগ্রহ করে খাদ্য মজুত গড়ে তোলার জন্য। এর পরিমাণ গড়ে মোট উৎপাদনের ৫/৬ শতাংশের বেশি নয়। উৎপাদন মৌসুমে ধান ও চালের দাম নিচে নেমে যাওয়া এবং অন্য সময় খাদ্যশস্যের মূল্য বৃদ্ধি ঠেকাতে সংগ্রহের পরিমাণ কমপক্ষে মোট উৎপাদনের ১০ শতাংশ হওয়া উচিত। বর্তমানে ধান ও গমের মোট উৎপাদন প্রায় ৪ কোটি টন। সে মোতাবেক সরকারি সংগ্রহ হওয়া উচিত কমপক্ষে ৪০ লাখ টন খাদ্যশস্য। প্রতি মাসে আমাদের দেশে গড়ে প্রায় ২৫ লাখ টন খাদ্যশস্যের প্রয়োজন হয়। এটি আমাদের নূ্যনতম মজুত থাকা দরকার। সংকটকালে চাল বিতরণ বৃদ্ধি পেলে তা যেন কোনোক্রমেই সাড়ে ১২ লাখ টনের নিচে নেমে না যায়, সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, চালের সরকারি মজুত ১০ লাখ টনের নিচে গেলে অসাধু ব্যবসায়ীরা কারসাজির সুযোগ পায় এবং বাজারমূল্য বৃদ্ধির পাঁয়তারা শুরু করে। এবার আমন মৌসুমে ৩ লাখ টন ধান ও ৫ লাখ টন সেদ্ধ চাল কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সরকার। ১৬ জানুয়ারি পর্যন্ত ৪ লাখ ৪৫ হাজার টন চাল সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে। ধান সংগ্রহ করা হয়েছে মাত্র ৪২ হাজার টন। অর্থাত্ এবারের সরকারি খাদ্যশস্য ক্রয়ে লাভবান হয়েছে চালকলের মালিক ও ব্যবসায়ীরা, কৃষকরা নয়। অসাধু ব্যবসায়ীরা অনেক সময় চালের ব্র্যান্ড নাম ভুয়া দেখিয়ে বেশি দামে বাজারে চাল বিক্রি করছে। উদাহরণস্বরূপ, ‘মিনিকেট’ চালের কথা বলা যায়। এ নামে বাংলাদেশে কোনো ধানের জাত নেই। মোটা ও মাঝারি চাল ছাঁটাই করে মিল মালিকরা ভোক্তাদের মিনিকেট বলে প্রতারণা করছে। মোটা চাল বারবার মিলে পলিশিং করা হলে তা সরু ও ঝকঝকে হয়। ব্রি ধান ২৮, ব্রি ধান ২৯ ও ব্রি হাইব্রিড ধান ছেঁটে ও কেটে মিনিকেট বানানো হয় বলে জানা গেছে। তাতে মিলারদের লাভ হয় বেশি। আসলে মিনিকেট শব্দটা এসেছে মিনিকিট থেকে। ১৯৯৫ সালে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মধ্যে ‘শতাব্দী’ জাতের ধানবীজ ও কিছু কৃষি উপকরণ একটি ছোট প্যাকেটে করে উপহার দেওয়া হয়। ঐ ছোট প্যাকেটটিকে বলা হতো মিনিকিট। সেখান থেকেই মিনিকেট নামের উৎপত্তি। এ নামে বাংলাদেশ ধান গবেষণা প্রতিষ্ঠান বা অন্য কোনো গবেষণা ও উচ্চশিক্ষা-প্রতিষ্ঠান উদ্ভাবিত এবং সরকার অনুমোদিত কোনো জাতের ধান নেই। অটোরাইস মিল মালিকরা মোটা ধান কেটে ও ছেঁটে তা মিনিকেট বলে চালিয়ে দিচ্ছেন। এখানে নাজির এবং পাইজাম চালের কথাও বলা যায়। এ জাতগুলো পুরোনো। স্হানীয় জাতের ধান থেকে এ চালের উৎপত্তি। এখন এ জাতের ধান অনেকটাই বিলুপ্ত। সচরাচর এগুলোর চাষ করে না কৃষকগণ। বাজারে নাজির নামের যে চাল আসে তা স্হানীয় নাইজারশাইল বা নাজিরশাইল থেকে আসে না। ব্রি ধান ৪৯ থেকে তৈরি করা চালকে বলা হচ্ছে নাজির। এগুলো প্রতারণার শামিল। আইন করে এ ধোঁকাবাজি বন্ধ করা উচিত অবিলম্বে।
আমাদের একটা প্রবণতা আছে, খাদ্যশস্যের উৎপাদনের পরিমাণ স্ফীত করে এবং ভোগের পরিমাণ কম করে দেখানো, যাতে উদ্বৃত্ত বা স্বয়ম্ভরতা জানান দেওয়া যায়। খাদ্যের জন্য আমরা পরমুখাপেক্ষী নই বলে দাবি করতে পারি। স্হিতিশীল মূল্য ও আমদানি-নীতির জন্য তা ক্ষতিকর। দেশের উৎপাদন পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং তা বাস্তবায়নের জন্যও এটা নেতিবাচক সংকেত দিতে পারে। দেশের খাদ্যনিরাপত্তার স্বার্থে আমাদের মোট উৎপাদন ও ভোগের পরিমাণ সঠিকভাবে নির্ণয় করা উচিত। এক্ষেত্রে বিবিএস যে হিসাব উপস্হাপন করছে তার নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে অনেক প্রশ্ন আছে। ২০২১-২০২২ অর্থবছরের আউশ ও আমন উৎপাদনের চূড়ান্ত হিসাব এখনো তারা প্রকাশ করেনি। এদের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে দেশের উৎপাদন, আমদানি ও খাদ্যবিতরণ পরিকল্পনা সঠিকভাবে প্রণয়ন করা দুষ্কর। ভবিষ্যত্ প্রক্ষেপণও হবে প্রশ্নবিদ্ধ। দেশের স্বার্থে নির্ভরযোগ্য তথ্যের জন্য মাঠ পর্যায়ে সঠিক গবেষণা প্রয়োজন। দেশবাসীর সামনে প্রকৃত তথ্য পরিবেশন করা আবশ্যক।
লেখক: কৃষি অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও শিক্ষাবিদ