খুচরা বাজারে আলুর কেজি ১৫ টাকা, কৃষক পাচ্ছেন কত?

মৌসুমের শুরুতেই রংপুরের বাজারে দরপতন হয়ে ৪ টাকায় নেমেছে প্রতি কেজি আলুর দাম। এই কম দামে আলু বিক্রি করে লোকসান গুনতে হচ্ছে কৃষকদের। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারে এই দামে আলু বিক্রি করে দিশেহারা রংপুরের কৃষকরা। আলুচাষের ব্যয় তোলা তো দূরের কথা ক্ষেত থেকে আলু তুলে ভ্যান ভর্তি করে বাজারে আনার খরচই উঠছে না। 

রংপুর নগরীসহ জেলার বিভিন্ন খুচরা বাজারে প্রতি কেজি আলু বিক্রি হচ্ছে ১৫/২০ টাকা। কৃষকের কাছ থেকে চার টাকা কেজিতে আলু কিনে লাভবান হচ্ছেন পাইকার, আড়তদার ও খুচরা ব্যবসায়ীরা। এদিকে আলু বিক্রি করে দিশেহারা সেই কৃষকরাই।

রংপুর কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে রংপুর জেলায় রেকর্ড পরিমাণ জমিতে আলু চাষ হয়েছে। এ বছর কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল ৫৩ হাজার ৫৪০ হেক্টর জমি। অতীতের রেকর্ড ভেঙে আলু চাষ হয়েছে ৫৪ হাজার ৭০০ হেক্টর জমিতে। আলু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ২৫ লাখ মেট্রিক টন। যা দেশের মোট চাহিদার চার ভাগের এক ভাগেরও বেশি।

এ মৌসুমে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন আগাম আলু চাষীরা। লাভ তো দূরের কথা, বরং বড় ধরনের লোকসান গুনতে হচ্ছে তাদের। তাদের এক বিঘা জমিতে আলু চাষ করতে খরচ পড়েছে ১২ থেকে ১৫  হাজার টাকা। সেখানে এক বিঘা জমির আলু বিক্রি করে ১০ হাজার টাকাও উঠেছে না তাদের। কার্ডিনাল আলুর কেজি বিক্রি হচ্ছে ১০ থেকে ১১ টাকা। যা গত বছর বিক্রি হয়েছিল ৪০ টাকা দরে। চড়া সুদে দাদন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ঋণ নিয়ে পরিশোধ করতে পারছেন না তারা। চাহিদার তুলনায় বেশি চাষ হওয়ায় মহাজনরাও আলু নিতে আগ্রহী না। ফলে পানির দামে আলু বিক্রি করতে হচ্ছে। 

potato

রংপুর সদর উপজেলার পালিচড়া গ্রামের সাহেকুল ইসলাম ও তার ভাই জামিনুল ইসলাম ছয় বিঘা জমিতে আগাম আলু চাষ করেছেন। ফলন ভালো হয়েছে। কিন্তু আলু বিক্রি করতে পারছেন না। প্রতি কেজি আলু উৎপাদনে খরচ পড়েছে ৮ টাকারও বেশি। এখন সেই আলু চার-পাঁচ টাকা কেজিতে বিক্রি করছেন। তারা জানান, প্রতিবছর আলু ক্ষেতে বিভিন্ন জায়গা থেকে পাইকাররা এসে আলু কিনে নিয়ে যেতেন। কিন্তু এবার পাইকারের দেখা নেই। এনজিও থেকে সুদে টাকা নিয়ে আলু চাষ করেছি। এখন টাকা পরিশোধ করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। একই কথা জানালেন মরনেয়া গ্রামের আলু চাষি মমেনা বেগম ও সাহেব আলী।  

রংপুরের পাইকারি সবজির বাজার মিঠাপুকুরের পালিচড়া হাটে গিয়ে দেখা যায়, ৩৫০ থেকে ৩৮০ টাকা আলুর মণ বিক্রি করছেন আড়তদাররা। হিসাবে কেজি পড়ে আট থেকে নয় টাকা। মূলত পাইকারদের কাছ থেকে আলু কিনেন আড়তদাররা। কৃষকদের কাছ থেকে চার টাকা কেজিতে আলু কিনে আড়তদারদের কাছে ছয়-সাত টাকা বিক্রি করেন পাইকাররা। তারা জানান, আলু কেনার পর পরিবহন ও শ্রমিক খরচসহ দুই-তিন টাকা খরচ বেশি পড়ে। এ কারণে ছয়-সাত টাকায় বিক্রি করতে হয়।

জানা যায়, রংপুর নগরীর আলুটারী, মাহিগঞ্জ, নবদীগঞ্জসহ আশপাশের এলাকায় আলু চাষ বেশি হয়। প্রতি বিঘায় আলু চাষে ১২ থেকে ১৫  হাজার টাকা খরচ হয়। এরমধ্যে অনেকেই আগাম আলু চাষ করেন। তারা আগে তুলে আগে বিক্রি করে দেন। আবার অধিকাংশ চাষী আলু পরে তোলেন। এগুলো নিজেদের বাড়িতে সংরক্ষণ করেন কেউ কেউ। আবার অনেকেই হিমাগারে রেখে দেন। দাম বাড়লে বিক্রি করেন।

আলুর বাজার অনুসন্ধান করে দেখা যায়, ক্ষেত থেকে আলু তুলে বাজারে এনে পাইকার কিংবা আড়তদারের কাছে চার-পাঁচ টাকা কেজি বিক্রি করেন একজন কৃষক। সেই আলুর কেজি ছয়-সাত টাকায় আড়তদারের কাছে বিক্রি করেন পাইকার। এই আলু ব্যবসায়ীর কাছে নয় থেকে ১০ টাকা বিক্রি করেন আড়তদার। ব্যবসায়ী সেই আলু নিয়ে খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করেন ১৩ থেকে ১৪ টাকায়। খুচরা ব্যবসায়ী সেই আলুর কেজি ভোক্তাদের কাছে বিক্রি করেন ২০ টাকা দরে।

শহরের পাইকারি আলু ব্যবসায়ী সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবদুল মান্নান বলেন, আমরা সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে আলু কিনি না। আমরা সবজির পাইকারি হাট থেকে আলু কিনি। সেখান থেকে কিনে আনার পর পরিবহন খরচ, কর্মচারির বেতন, দোকান ভাড়া, কুলি খরচসহ সব মিলিয়ে কেজিতে এমনিতেই দুই থেকে তিন টাকা বেশি পড়ে। এজন্য নয় থেকে দশ টাকা কেজিতে বিক্রি করতে হয়। এখানে আমাদের সীমিত আয়।

রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক ওবায়দুর রহমান মন্ডল বলেন, এবার রংপুরে রেকর্ড পরিমাণ জমিতে আলু চাষ হয়েছে। আবহাওয়া ভালো হওয়ায় রোগবালাই না থাকায় বাম্পার ফলন হয়েছে। তবে আগাম আলুর চাষ বেশি হওয়ায় কৃষকরা দাম পাচ্ছেন না। খুব কম দামে আলু বিক্রি করতে হচ্ছে তাদের। 

তিনি আরও বলেন, গত বছর দেশে আলু উৎপাদন হয়েছে এক কোটি ১০ লাখ টনের বেশি। চাহিদা ছিল ৮০ লাখ টন। চাহিদা পূরণ হওয়ার পরও অতিরিক্ত ৩৫ লাখ মেট্রিক টন আলু থেকে গেছে। রংপুরে চলতি মৌসুমে ৫০০ কৃষককে বিদেশে রফতানি উপযোগী আলু চাষের ওপর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। দেশের চাহিদা মিটিয়ে অতিরিক্ত ৩০ থেকে ৩৫  লাখ টন আলু রফতানি করা গেলে কৃষকরা ন্যায্য দাম পাবে।