বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজব্যবস্থা একসময় বিশ্বনন্দিত ছিল। বিশেষ করে গ্রামীণ জনগণের মধ্যে সৃষ্ট সামাজিক বন্ধন ছিল তুলনাহীন। বিদেশিরা বাংলাদেশে বেড়াতে এলে দেশে ফিরে গিয়ে এ পদশের সামাজিক সম্প্রীতির উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করতেন। বিশেষ করে তারা বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজের পারিবারিক বন্ধনকে নজিরবিহীন বলে আখ্যায়িত করতেন। বাংলাদেশের মানুষ বরাবরই ধর্মপ্রাণ, কিন্তু ধর্মান্ধ নয়। তাই তারা জাতি-ধর্ম-নির্বিশেষে মিলে-মিশে বসবাস করতেন। একজন অন্যজনের বিপদে এগিয়ে আসতেন। এজন্য তারা কোনো বিনিময় আশা করতেন না। একান্ত মানবিক বিবেচনায় এই কাজটি তারা করতেন। কিন্তু বর্তমানে আমরা ক্রমশ সেই গ্রামীণ ঐতিহ্য হারিয়ে ফেলতে বসেছি।
কথায় বলে, শহরের মানুষের হূদয়ে আবেগ কম থাকে। তাই তারা কোনো কিছুতেই সহজে আবেগপ্রবণ হন না। তারা সবকিছুই যুক্তি দিয়ে বিচার করেন এবং বৈষয়িক স্বার্থসংশ্লিষ্টতা না থাকলে কোনো কিছুতে যুক্ত হতে চান না। বর্তমানে গ্রামীণ সমাজব্যবস্থায় শহুরে রীতিনীতি ঢুকে পড়েছে। গ্রামের মানুষও এখন আর আগের মতো উদার ও পরোপকারী মনোভাবাপন্ন নেই। তারাও সবকিছুতেই স্বার্থ খুঁজে বেড়ান। ফলে সামাজিক পুঁজি হুমকির মুখে পড়েছে। এই অবস্থা চলতে থাকলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজব্যবস্থাও কৃত্রিমতায় অতিমাত্রায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়তে পারে। যদি সত্যি তা-ই হয়, তাহলে সেটা হবে জাতির জন্য খুবই দুর্ভাগ্যজনক একটি অবস্থা। বর্তমান সরকারের এই বিশেষ আর্থসামাজিক পরিকল্পনা হচ্ছে ‘শহরের সুবিধা গ্রামে নিয়ে যাওয়া’। এটি অত্যন্ত ভালো একটি উদ্যোগ। কিন্তু অনেকেই এই সহজ পরিকল্পনাকে বিতর্কিত করার জন্য ভুল ব্যাখ্যা করে থাকেন। তারা বলেন, সরকার গ্রামকে শহর বানাতে চাইছেন। এতে গ্রামীণ পরিবেশ বিপন্ন হবে, শহরের মতো গ্রামও পরিবেশদূষণের শিকার হবে। কিন্তু বিষয়টি মোটেও তা নয়। সরকার চাইছে, পিছিয়ে পড়া গ্রামগুলোর ঐতিহ্য এবং পরিবেশ-পারিপার্শ্বিকতা ঠিক রেখে তাতে প্রযুক্তি ও আধুনিকতার সংমিশ্রণ ঘটিয়ে এমন একটি পরিবেশ সৃষ্টি করা, যাতে মানুষ গ্রামে বাস করেও শহরের মতো সুবিধা পেতে পারে। এই পরিকল্পনায় গ্রামের পরিবেশ পারিপার্শ্বিকতাকে কোনোভাবেই বিপন্ন বা বিঘ্নিত করা হবে না। ভবিষ্যতে দেশের বিভিন্ন স্থানে ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপিত হতে যাচ্ছে। এগুলোর স্থাপন সম্পন্ন হলে সংশ্লিষ্ট গ্রামগুলোতে শহরের সব সুবিধা সম্প্রসারিত হবে।
বাংলাদেশের গ্রামীণ ঐতিহ্য বিশ্বব্যাপী একসময় নন্দিত এবং প্রশংসিত ছিল। কিন্তু সেই ঐতিহ্য আমরা অনেকটাই হারিয়ে ফেলতে বসেছি। এর একটি কারণ হতে পারে এই রকম যে, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের ফলে গ্রামের মানুষ এখন খুব সহজেই শহরে যাতায়াত করতে পারে। শহরে গিয়ে তারা শহুরে ঐতিহ্য ধারণ করে গ্রামে এসে সেগুলো বাস্তবায়ন করতে চেষ্টা করেন। এটাকে তারা আধুনিকতা বলে মনে করেন। আমরা অবশ্যই জাতি হিসেবে আধুনিক হব। আধুনিকতাকে ধারণ করব। কিন্তু তাই বলে গ্রামের সব ঐতিহ্যকেই যে বিসর্জন দিতে হবে, তা নয়। গ্রামের যেসব ঐতিহ্য কল্যাণমূলক তার সঙ্গে আধুনিকতার মিশ্রণ ঘটিয়ে সময়োপযোগী বলে গৃহীত হলে জাতি হিসেবে আমরা উপকৃত হতে পারব। এবার কিছু গ্রামীণ ঐতিহ্যের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে, যা সামাজিক সম্প্রীতি সৃষ্টি এবং সামাজিক পুঁজি গঠনে অত্যন্ত সহায়ক। বাংলাদেশের গ্রামীণ বিচারব্যবস্থার ঐতিহ্য সর্বজনবিদিত। এমন একটি সময় ছিল যখন হত্যাকাণ্ড বা এ ধরনের কতিপয় গুরুত্ব অপরাধ ব্যতীত অধিকাংশ অপরাধের বিচার স্থানীয়ভাবে সম্পন্ন করা হতো। গ্রামীণ বিচারব্যবস্থায় যারা বিচারকের ভূমিকা পালন করতেন, তারা ছিলেন খুবই দক্ষ এবং অভিজ্ঞতাসম্পন্ন। এরা খুব সহজেই যে কোনো সমস্যার আইনি সমাধান করে দিতে পারতেন। মূলত এ কারণেই আগেকার দিনের গ্রামীণ জনগণকে বিচারপ্রাপ্তির জন্য আদালতে যেতে হতো খুবই কম। এজন্য তাদের সময় এবং অর্থ উভয়ই সাশ্রয় হতো। কোনো কোনো গ্রাম্য বিচারক এতটাই দক্ষতা অর্জন করতেন যে, তাদের আদালতে জুরি হিসেবে আহ্বান জানানো হতো। তারা সেখানেও দক্ষতার পরিচয় দিতেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে গ্রামীণ বিচারব্যবস্থা প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পেয়েছি। আমার বাবা ছিলেন একজন গ্রাম্য বিচারক। তার নিকট বিচারের জন্য অনেকেই আসতেন। এলাকার আরো কিছু বিচারক আমাদের বাড়িতে আসতেন। তারা সম্মিলিতভাবে বিচার কার্য পরিচালনা করতেন। আমাদের বাড়িতে বসবাসের জন্য যে মূল বিল্ডিং ছিল তার বারান্দা ছিল বেশ বড় এবং প্রশস্ত। অন্তত ৫০/৬০ জন লোক সেখানে বসতে পারতেন। এখানেই এলাকার বিচারকার্যাদি সম্পন্ন করা হতো। বিচারের মজাটা হচ্ছে শেষের অংশটুকু, যখন চূড়ান্ত রায় দেওয়া হয়। এজন্যই বলা হয়, ‘খাবারের আগে আর বিচারের পিছে।’ অর্থাত্ ভালো খাবার খেতে চাইলে প্রথম বৈঠকে বসতে হবে। আর বিচারের মজা পেতে হলে বিচারের সমাপনীতে থাকতে হবে। গ্রামীণ বিচারকগণ বিভিন্ন গল্প ও মিছাইলের মাধ্যমে যেভাবে আনন্দদায়ক অবস্থায় বিচারকার্য সম্পন্ন করতেন, তা সত্যি মনে রাখার মতো। বিচারকগণ বাদী এবং আসামিরপক্ষ নিয়ে যুক্তি-তর্কে লিপ্ত হতেন। দেখা যেত, বিচারে উভয় পক্ষই অধিকাংশ সময় সন্তুষ্ট হতেন। এখন আর সেই বিচারব্যবস্থা তেমন একটা প্রত্যক্ষ করা যায় না। গ্রামীণ বিচারের মূল উদ্দেশ্য ছিল সৃষ্ট সমস্যার গ্রহণযোগ্য সমাধান বের করে পরস্পরকে মিলিয়ে দেওয়া। পরবর্তী সময়ে উভয় পক্ষ আবারও মিলেমিশে থাকতেন। বিচারকার্য সম্পন্ন করতেন বয়স্ক ব্যক্তিগণ। তরুণ বা উঠতি বয়েসি যুবকরা সেখানে উপস্থিত থাকলেও তাদের ভূমিকা ছিল দর্শক বা পর্যবেক্ষকের। কিন্তু পরবর্তী সময়ে এক পর্যায়ে স্থানীয় প্রভাবশালী যুবকরা এই বিচার ব্যবস্থায় প্রভাব বিস্তার করে। তাদের উপস্থিতি অনেক সময়ই মারাত্মক সংঘাতে পরিণত হতো। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এমন অবস্থাও হতো যে বিচারের প্রচণ্ড মারামারি শুরু হয়ে যেত। এছাড়া বিচার কার্যের মাধ্যমে অনুকূল পাওয়ার জন্য অর্থ নিয়ামক শক্তিতে পরিণত হয়। এভাবে একসময় সাধারণ মানুষ গ্রামীণ বিচারব্যবস্থার প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়ে। এখন আর গ্রামীণ বিচারব্যবস্থা তেমন একটা প্রত্যক্ষ করা যায় না। আগেকার দিনে গ্রামীণ সাধারণ মানুষের মধ্যে সুসম্পর্ক ছিল চোখে পড়ার মতো। কারো ক্ষেত্রে ধান পাকলে অথবা আলু তোলার সময় হলে গ্রামের মানুষ একত্র হয়ে সেই উত্সবের আমেজে সেই ফসল তুলে দিত। এই স্বেচ্ছাশ্রমে অংশগ্রহণকারীদের ভূরিভোজ করানো হতো। যখন পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হয়, কোনো এলাকায় শ্রমিকের অভাবে মাঠের ফসল মাঠেই নষ্ট হয়ে গেছে, তখন ভীষণ খারাপ লাগে। কারো গাছে ফল পাকলে তা পেরে দেওয়ার দায়িত্বও পালন করত গ্রামের মানুষ। এজন্য তারা কোনো বিনিময় আশা করত না। কোনো এলাকায় রাস্তা নষ্ট হয়ে গেলে অথবা ব্রিজ ভেঙে গেলে গ্রামের মানুষ ঊর্ধ্বতন কতৃর্পক্ষের দিকে তাকিয়ে না থেকে নিজেরাই সেই রাস্তা বা ব্রিজ ঠিক করত। গ্রামে কারো আর্থিক সংকট দেখা দিলে সবাই মিলে তা সমাধানের চেষ্টা করতেন। বাংলাদেশের একজন বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ যখন ক্যাডেট কলেজে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পান, তখন তার পরিবারের পক্ষে লেখাপড়া চালানোর মতো আর্থিক সামর্থ্য ছিল না। এই অবস্থায় গ্রামের মানুষ বাজারে চাঁদা উত্তোলন করে তার ভর্তির জন্য টাকা জোগান করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি দেশের শীর্ষ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে গিয়েছিলেন। তিনি সেই ছোটবেলার কথা ভোলেননি। গ্রামে জন্ম নেওয়া কত প্রতিভা যে ঝরে যাচ্ছে, তার খবর এখন আর আমরা রাখি না। অথচ একটু সহায়তার হাত বাড়ালেই এরা হয়তো দেশের জন্য অনেক কিছু করতে পারতেন।
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক এবং সামজিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক সময়ে ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করে চলেছে। এই সাফল্যকে ধরে রাখতে হলে লুপ্তপ্রায় সামাজিক পুঁজির বিকাশ ঘটাতে হবে। গ্রামকে সমৃদ্ধ করতে হলে যারা গ্রাম থেকে শহরে এসে বিদ্যার্জন করেন তাদের আবারও গ্রামে ফিরে যাওয়ার মতো অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। আগে দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি ছিল গ্রাম। কিন্তু এখন জাতীয় অর্থনীতিতে গ্রামের অবদান অনেকটাই কমে গেছে। জাতীয় অর্থনীতিতে শহরের অবদান ৬০ শতাংশেরও বেশি। কিন্তু শহরে বাস করে মোট জনসংখ্যার ৩১ শতাংশের কিছু বেশি। জনসংখ্যা এবং সম্পদের এই বৈষম্য রোধ করতে হলে আমাদের গ্রামীণ উন্নয়নের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। দেশের বিভিন্ন স্থানে যে ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন করা হচ্ছে তার বেশির ভাগই গ্রামীণ এলাকায় অবস্থিত। এসব অর্থনৈতিক অঞ্চলকে কেন্দ্র করে অর্থনৈতিক কর্মচাঞ্চল্য সৃষ্টি হবে। কাজেই ভবিষ্যতে গ্রামীণ অর্থনেতিক উন্নয়নের সুবর্ণ সুযোগ আমাদের হাতছানি দিয়ে ডাকছে। সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর জন্য আমাদের জাতীয় পর্যায়ে পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে।
লেখক: অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল ম্যানেজার, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড