ডাকাতিয়া নদীকে ‘বদ্ধ জলমহাল’ দেখিয়ে ইজারার চেষ্টা

রায়পুর উপজেলার প্রবহমান ডাকাতিয়া নদীকে ‘বদ্ধ জলমহাল’ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে। সেটিকে আনা হয়েছে ইজারার আওতায়। এছাড়াও পৌর কর্তৃপক্ষ ভূমি মন্ত্রণালয়ের গেজেট বিজ্ঞপ্তিকে আড়াল করে নদী ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করলে অবাধে মাছ ধরার অধিকার থেকে বঞ্চিত হন দরিদ্র জেলেরা। ফের চলতি মাসে প্রবাহিত ডাকাতিয়া নদীকে ‘বদ্ধ জলমহাল’ উল্লেখ করে মৎস্যজীবী সমিতির কাছে ইজারা দেওয়ার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে পৌর কর্তৃপক্ষ। 

অনুসন্ধানে জানা যায়, রায়পুরের ডাকাতিয়া নদীকে মূলত ইজারার আওতায় আনতেই কৌশলে পৌর কর্তৃপক্ষ এর নাম পরিবর্তন করেন। সম্প্রতি একটি মৎস্যজীবী সমিতিকে একে ইজারা বন্দোবস্ত দেওয়ার সিদ্ধান্তও হয়ে গেছে চূড়ান্ত। এ অবস্থায় শুষ্ক মৌসুমে নদীর পাড়ের ৫ হাজার একর জমিতে বোরো ধান আবাদে সেচ সুবিধা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয় মানুষ। জনস্বার্থে নদীটির ইজারা বাতিলে এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে বেশ কয়েকবার ইউএনও এবং জেলা প্রশাসক বরাবর লিখিত আবেদনও করা হয়েছে।

ডাকাতিয়া নদী রক্ষা আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত সাংবাদিক জিল্লুর রহমান বলেন, ১৯৯৭ সালের পরিবেশ সংরক্ষণ আইনে নদী ও জলাভূমিকে স্পষ্টভাবেই সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। চলমান নদীকে কোনো অবস্থায়ই বদ্ধ জলমহাল বলা যাবে না। নদীকে বদ্ধ জলমহাল হিসেবে ইজারা দেওয়া হলে পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। রায়পুরের এই ডাকাতিয়া নদী রক্ষায় আমার বিভিন্ন আন্দোলন করে কিছুটা উদ্ধার করেছি। 

এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, ২০২০ সালে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট সালাউদ্দিন রিগ্যান উন্মুক্ত নদী উল্লেখ করে ইজারা বন্দোবস্ত বাতিল করতে একটি স্বত্ব মামলা করেন। পরে এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ‘দরিদ্র জেলে সম্প্রদায়ের স্বার্থ সংরক্ষণার্থে এবং তাদের জীবিকা নির্বাহে সরকার নদী, খাল ও উন্মুক্ত শ্রেণির ছড়া; যা জলমহালের আওতায় রয়েছে সেগুলোর ইজারা বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’ পরে রিগ্যান লক্ষ্মীপুর জেলা প্রশাসক, রায়পুরের ইউএনও এবং পৌরসভার মেয়রের কাছে ঐ রায়ের চিঠি পাঠান। এতে ডাকাতিয়া নদীর কিছু অংশ উন্মুক্ত করে দেয় অবৈধ লিজ নেওয়া দখলদাররা। কিন্তু পৌরসভার অংশ আজও উন্মুক্ত হয়নি। 

রায়পুর পৌর শহরের বাসিন্দা স্বপন আহম্মেদ, আজম চৌধুরীসহ আরো কয়েক জন বলেন, বর্ষায় পৌর এলাকার নেমে আসা ঢলের পানি এই নদী দিয়েই নিষ্কাশিত হয়। এছাড়া শুষ্ক মৌসুমে নদীর বিভিন্ন স্থানে অস্থায়ী মাটির বাঁধ স্থাপন করে পানি সেচের মাধ্যমে নদীর দুই পাড়ের প্রায় ২০টি গ্রামের ৫ হাজার একর জমিতে বোরো আবাদ হয়। নদীটি ইজারা দেওয়া হলে সেচ সুবিধার অভাবে আবাদ ব্যাহত হবে। এলাকার দরিদ্র জেলেরা নদীতে মাছ ধরার অধিকারও হারাবেন। 

সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট সালাউদ্দিন রিগ্যান বলেন, ডাকাতিয়া নদী কীসের ভিত্তিতে ‘বদ্ধ জলমহাল’ করা হলো—এ বিষয়ে পৌরসভার মেয়র ও উপজেলার ভূমি কার্যালয়সহ সংশ্লিষ্ট একাধিক কার্যালয়ে গিয়ে কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেও কোনো সদুত্তর পাওয়া যায়নি।

রায়পুর পৌরসভার সচিব আবদুল কাদের বলেন, ‘বদ্ধ জলমহাল হিসেবে আমরা ডাকাতিয়া নদী ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। ডাকাতিয়া উন্মুক্ত নদী হয়ে থাকলে তা কীভাবে বদ্ধ জলমহাল হিসেবে নথিভুক্ত হলো, সেটি দেখার বিষয়। তবে মেয়র সাহেবের নির্দেশে নদীর ইজারার দরপত্র বিক্রি বন্ধ করা হয়েছে। 
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অনজন দাশ বলেন, নদী কোনোভাবেই ইজারা দেওয়া সম্ভব নয়। বিষয়টি জানতে পেরেই ডাকাতিয়া নদী ইজারার দরপত্র বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছি। বিষয়টি জেলা প্রশাসকসহ স্থানীয় সংসদ সদস্যকেও অবগতি করেছি। তাই নদী আর ইজারা দেওয়া হবে না।