প্রেম এবং দ্রোহের সুরসম্রাট 

বাউল শাহ আবদুল করিম ছিলেন গণমানুষের গীতিকার এবং ছিলেন মানবতাবাদী এক সৃষ্টিশীল মানুষ। ভাটি অঞ্চলের বিস্তীর্ণ জনপদ এবং সেখানকার প্রান্তিকজনের জীবনকে তিনি শিল্প-সাধনায় যেভাবে তুলে এনেছেন তা এক কথায় অনবদ্য। তাঁর সৃষ্টিশীলতা বহুমাত্রিক। সাধারণ মানুষের প্রেম, দ্রোহ এবং দৈনন্দিন সংগ্রামকে তিনি গভীরভাবে অনুভব করতে পারতেন। ভাবের, সাধনার এবং জীবনসংগ্রামের অসংখ্য নদী-সরোবর পার হয়ে তিনি মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছেন। এবং আজো করে চলেছেন। বাউল-জীবন বেছে নিলেও আধুনিক চিন্তাচেতনার অনুরণন ছিল শাহ আবদুল করিমের গানে—তাঁর দার্শনিকতা আমাদের চিন্তারাজ্যকে নিবিড়ভাবে স্পর্শ করে। তিনি তাঁর একাধিক সাক্ষাত্কারে বলেছেন, একদিন পৃথিবীটা বাউলের পৃথিবী হবে। 

ফকির লালন সাঁই, রাধারমন, দুরবিন শাহ, দেওয়ান হাছন রাজাসহ অনেকের গানেই অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন শাহ আবদুল করিম। তবে গান রচনা এবং সুরারোপের ক্ষেত্রে স্বতন্ত্র এক ধারার সৃষ্টি করেছিলেন তিনি। ভাটির প্রকৃতি এবং হাওর অঞ্চলের দিগন্তবিস্তারী উদারতার সন্ধান মেলে তাঁর শিল্প-সাধনায়। বাউল হয়েও তিনি শোষণের বিরুদ্ধে জেগে ওঠার বারতা নিয়ে মুক্তিকামী মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন; বিপন্ন মানুষকে দুঃখজয়ের মন্ত্র শুনিয়ে গেছেন। 

প্রেম কিংবা বিরহ বাউল গানের বিষয়বস্ত্ত হিসেবে ঘুরেফিরে বারবার এলেও আবদুল করিমের গানে যেন সেই বিচ্ছেদের তীব্র যন্ত্রণা হৃদয়ের গভীরতম প্রদেশকে স্পর্শ করে—‘বিচ্ছেদের আগুনে পুড়ে কলিজা অঙ্গার।’ প্রেম যেমন তাঁকে প্রবলভাবে সুখী করে, তেমনি তা এক ধরনের শূন্যতাও তৈরি করে। ‘আমি ফুল বন্ধু ফুলের ভ্রমরা/কেমনে ভুলিবো আমি বাঁচি না তারে ছাড়া’ কিংবা ‘তোমরা কুঞ্জ সাজাও গো আজ/আমার প্রাণনাথ আসিতে পারে’ অথবা ‘আসি বলে চলে গেল বন্ধু আইলো না’—অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম মনে করেন, প্রেমের সঙ্গে আরাধনার একটি যোগসূত্র আছে—যা শাহ আবদুল করিমের সহজিয়া গানে শুদ্ধরূপে প্রতিভাত হয়েছে। 

আবদুল করিম বাউল গানের মধ্য দিয়ে অসাম্প্রদায়িকতা এবং সাম্যের চর্চা করে গেছেন সারাটা জীবন। ধর্মকে প্রাতিষ্ঠানিকতার আবর্তে না রেখে উদারনৈতিক জীবনাচরণের ফলে বহুবার ফতোয়া এসেছে তাঁর ওপর। ওয়াজ মাহফিলগুলোতে রাতভর তাঁকে কদর্য ভাষায় আক্রমণ করা হতো বলে বিভিন্ন সাক্ষাত্কারে তিনি উল্লেখ করেছেন। এমনকি স্ত্রী সরলা (আফতাবুন্নেসা) ও শিষ্য আকবরের মৃত্যুর পর জানাজা পড়াতে আপত্তি জানিয়েছেন তত্কালীন মসজিদের ইমাম। এসব ঘটনায় তিনি যারপরনাই কষ্ট পেয়েছিলেন বলে অনেক জায়গায় বলে গেছেন। এমনকি শুধু গান গাওয়ার ‘অপরাধে’ তাঁকে একবার গ্রাম থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল বলেও জানা যায়। 

রাজনীতি সচেতন মানুষ ছিলেন বাউল আবদুল করিম। সাতচল্লিশের দেশভাগ, বাহান্নোর ভাষা আন্দোলন, চুয়ান্নোর যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তাঁর গান ভাটি অঞ্চল তথা দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষকে আলোড়িত করেছে। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মাওলানা ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও আবদুস সামাদ আজাদসহ আরো অনেক খ্যাতিমান নেতার সামনে একই মঞ্চে গান গেয়েছেন তিনি। ১৯৫৭ সালে টাঙ্গাইলের সন্তোষে কাগমারি সম্মেলনে অংশ নিয়েছিলেন শাহ আবদুল করিম। সেখানে কবিয়াল রমেশ শীলের সঙ্গে একমঞ্চে গান গেয়ে মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীরও প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন। ভাসানী সেদিন তাঁকে বলেছিলেন, ‘ব্যাটা, গান ছাড়বে না, সাধনা চালিয়ে যাও। একদিন গণমানুষের শিল্পী হবে তুমি।’

শাহ আবদুল করিমের প্রতি শেখ মুজিবের ছিল গভীর ভালোবাসা। দুই ভূমিপুত্রের পারস্পরিক শ্রদ্ধার সম্পর্কের মাত্রা খানিকটা বুঝে নেওয়া সম্ভব বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনী থেকে। সুনামগঞ্জে তিনি প্রথমবার গিয়েছিলেন ১৯৫৬ সালের ২৬ নভেম্বর। ঐদিন বিকেলে এক জনসভায় ভাষণ দেন তিনি। সে সমাবেশে যোগ দিয়ে শাহ আবদুল করিম শেখ মুজিবকে নিয়ে স্বরচিত একটি গান পরিবেশন করেন। গানটি এমন: ‘পূর্ণচন্দ্রে উজ্জ্বল ধরা/চৌদিকে নক্ষত্রঘেরা/জনগণের নয়নতারা/শেখ মুজিবুর রহমান/জাগ রে জাগ রে মজুর-কৃষাণ।’

বঙ্গবন্ধু প্রকাশ্যেই বলতেন, ‘আমি করিম ভাইয়ের গানের খুবই ভক্ত।’ পঁচাত্তর-পরবর্তী বাস্তবতায় যখন বঙ্গবন্ধুর নামটা পর্যন্ত উচ্চারণ করতে শঙ্কিত ছিল সবাই, সেই অনুর্বর সময়ে পরাক্রমশালী শাসকদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে বাউল করিম যে কোনো গানের আসরে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানিয়ে তাঁর পরিবেশনা শুরু করতেন।

বাউল ঐতিহ্যের একনিষ্ঠ সাধক শাহ আবদুল করিম শেকড়সন্ধানী একজন বিরলপ্রজ মানুষ ছিলেন। তিনি তাঁর সৃষ্টির মধ্য দিয়ে প্রবল এক অনুপ্রেরণা হয়ে বেঁচে আছেন, থাকবেন—যতদিন বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতি বেঁচে থাকবে।