৯০ বছরে চিরনিদ্রায় চলে গেলেন তিনি করোনার করাল গ্রাসে। এক জীবনের সবটুকু দিয়ে গেছেন তিনি সাত দশকের ক্যারিয়ারে। তবু মনে হয়, দীপ বুঝি নিভে যায় মন নাহি মানে যখন থেকে কান শুনতে শুরু করেছে আর মন বুঝতে শুরু করে, তখন থেকেই সন্ধ্যার গান শুনে আসছি।
সকালের গোসল সেরেই বাবা রেকর্ডারে বাজাতেন ‘চন্দন পালঙ্কে শুয়ে, একা একা কী হবে/জীবনে তোমায় যদি পেলাম না’। নাশতা দিতে দিতে বাজত ‘ঘুম ঘুম চাঁদ ঝিকিমিকি তারা/এই মাধবী রাত’। নাশতা খেতে খেতে শুনতাম ‘হয়তো কিছুই নাহি পাব/ তবুও তোমায় আমি দূর হতে ভালোবেসে যাব’। এরপর বাড়িতে এলো ভিসিআর। ফিতার ক্যাসেটে সিনেমা চলত ঘরে। সাদাকালো সিনেমায় সূচিত্রার মুখে, সন্ধ্যার কণ্ঠে যখন বাজত—‘এ শুধু গানের দিন/ এ লগন গান শোনাবার’ ভালোবাসাকে না ভালোবেসে পারা যেত না। সেই সঙ্গে যদি উত্তম কণ্ঠ মেলাত হেমন্েতর সঙ্গে, তাহলে তো চাঁদের তিথি। হেমন্ত-সন্ধ্যার কণ্ঠে যখন সূচিত্রা আর উত্তম জুটি বেঁধে গাইত—‘এই পথ যদি না শেষ হয়’, তখন সেই পথ যেন সত্যিই আর ফুরাত না।
ছোট্ট ছিলাম আমরা। কিন্তু সেই সাবলীল ভালোবাসার সিনেমায় প্যারেন্টাল রেটিংয়ের দরকার পড়ত না। সূচিত্রার কণ্ঠে ঝরে পড়া প্রেমে ছিল পরিমিতিবোধ। সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় তাতে জোছনা ছড়িয়ে গাইতেন, ‘মনে নাই, সে কি মনে নাই/ সেই সাগরবেলায় ঝিনুক খোঁটা ছলে’, ‘গান গেয়ে পরিচয়/ ওগো মোর গীতিময়’। সেই গীতশ্রী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় চলে গেলেন বসন্তের প্রাক্কালে। নিজেকে উজাড় করে গেয়ে যাওয়ার জন্য দীর্ঘ সময় পেয়েছিলেন তিনি। বয়সের ভারে গানও ছেড়ে দিয়েছেন একসময়। তবু ৮২ বছর বয়সে যখন তিনি মঞ্চে ছোট্ট করে গাইলেন, ‘জানি না ফুরাবে কবে এই পথ চাওয়া/ ছলছল আঁখি মোর জলভরা মেঘে যেন ছাওয়া’—ইউটিউবে দেখতে দেখতে দর্শক সারির অনেকের সঙ্গে আবেগে ভেসেছি আমিও।
৯০ বছরে চিরনিদ্রায় চলে গেলেন তিনি করোনার করাল গ্রাসে। এক জীবনের সবটুকু দিয়ে গেছেন তিনি সাত দশকের ক্যারিয়ারে। তবু মনে হয়, দীপ বুঝি নিভে যায় মন নাহি মানে, তবু তার পানে চেয়ে থাকি হায়, সহিতে পারি না তার এই নিভে যাওয়া, চেয়ে থাকি হায়, সহিতে পারি না তার এই নিভে যাওয়া। তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন কলকাতায় ১৯৩১ সালের ৩১ অক্টোবর। মা হেমাপ্রভা মুখোপাধ্যায় ও বাবা নরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের ঘরে। তারা ছিলেন ছয় ভাইবোন। দাদা রথীন্দ্রই প্রথম খেয়াল করেছিলেন অসম্ভব ব্যতিক্রম এক কণ্ঠ সন্ধ্যার। গানের প্রতিও ভীষণ ঝোঁক। তিনিই নিয়ে গিয়েছিলেন সংগীত আচার্য যামিনী গঙ্গোপাধ্যায়ের কাছে। তার পর থেকে সন্ধ্যার মাথায় আশীর্বাদের হাত পড়েছিল বড়ে গোলাম আলী, জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ, মুনাবার আলী খানের মতো সংগীতজ্ঞদের।
মাত্র ১৩ বছর বয়সে প্রথম গান রেকর্ড করেন গিরিন চক্রবর্তীর কথা ও সুরে। তখন রেকর্ডের দুই পাশে থাকত গান। এক পাশে ছিল ‘তুমি ফিরায়ে দিয়ে যারে’, অন্য পাশে ছিল ‘তোমার আকাশে ঝিলমিল করে চাঁদের আলো’। এরপর থেকে শত শত গান, কত বিখ্যাত কণ্ঠশিল্পীর সঙ্গে! নিজেও অনেকের সঙ্গে গেয়ে তাদের সমৃদ্ধ করেছেন। দীর্ঘ ৭৫ বছর সংগীতের আকাশে রং চড়িয়েছেন তিনি। তার আত্মজীবনী গানে মোর কোন ইন্দ্রধনুতে রেখে গেছেন সেই সব গৌরবোজ্জ্বল কথা।
ভালো থাকবেন, সুরের ইন্দ্রধনু
লেখক: কর্মকর্তা, গ্রামীণফোন লিমিটেড