মানুষের স্রোত থামছিল না। সন্ধ্যা নামার আগে তো এত বড় বইমেলাকেও কম মনে হচ্ছিল। সকাল থেকে রাত অবধি মেলার সময়সীমা শেষ হয়ে যাওয়ার পরও বইপ্রেমীদের স্রোত ছিল বাঁধভাঙা জোয়ারের মতো। গতকাল ছিল বইমেলার প্রথম ছুটির দিন। আর ছুটির দিন মানেই চিরচেনা জনস্রোত। কিন্তু করোনাকাল এসে বইমেলায় মানুষের ঢলের কথা ভুলিয়ে দিয়েছিল প্রায়। কাল বইমেলা সেই পুরোনো রূপ ফিরে পেল। পাঠকের আনাগোনায় বইমেলা জমজমাট। মেলার চতুর্থ দিনে নতুন বই এসেছে ১৭৭টি।
মেলার দুয়ার খুলে গিয়েছিল সকাল ১১টায়। যারা বই নেড়েচেড়ে খানিকটা বুঝে বই কেনেন-তারা সকালের দিকেই এসেছিলেন। সবারই জানা শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটির প্রথম দিনে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়বে পাঠকদের চাপ। সে অনুমান মিথ্যে হয়নি। দুপুরের পর সূর্যের উত্তাপ কমে আসার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে মেলার উত্তাপ। পাঠকের উষ্ণ প্রাণস্পর্শ পুরো মেলাকে করে তুলেছিল উৎসবমূখর। প্রথম বারের মতো প্রাণ প্রাচুর্যে ভরপুর হয়ে জেগে উঠেছিল ভাষার মাসের অমর একুশে বইমেলা।
জনপ্রিয় লেখকদের বই যেসব স্টল থেকে প্রকাশিত হয়েছে সেসব স্টলকে ঘিরে ছিল পাঠকদের ভিড়। নিঃশ্বাস ফেলার ফুরসত নেই বিক্রেতাদের। এদিকে, নজরুল মঞ্চে মোড়ক উন্মোচন আর খোলা জায়গাগুলোতে পাঠকদের জমজমাট আড্ডা জমে উঠেছিল।
বিভিন্ন স্টলে লেখকদের সান্নিধ্য পেয়ে পাঠকদের বইয়ের অটোগ্রাফ নিতে দেখা গেছে। আনিসুল হক প্রথমার স্টলে, স্বকৃত নোমান ও মোজাফফর হোসেনকে খুঁজে পাওয়া গেল পাঠক সমাবেশের স্টলের সামনে, অন্যপ্রকাশের স্টলে সাদাত হোসাইন, মোহিত কামাল ছিলেন বিদ্যাপ্রকাশের স্টলে। এদের প্রত্যেকেরই নতুন বই মেলায় চলে এসেছে। তাই, পাঠকরাও তাদের বই কিনে অটোগ্রাফ নিচ্ছিলেন প্রিয় লেখকের।
এবার যে বইমেলা জমে উঠবে সে কথা লেখকরা আগেই বলেছিলেন। প্রকাশকরা আশায় বুক বেঁধে ছিলেন। তাদের সবার কথাই সত্যি হলো। টিএসসি থেকে মানুষের লম্বা লাইন, প্রবেশ পথগুলো মানুষের গাদাগাদি ভিড়। সবকিছুই স্বাভাবিক জীবনে ফেরার ইঙ্গিত দিল। তবে, করোনার কারণে প্রবেশ পথে তাপমাত্রা পরীক্ষা, মাস্ক পরা ও হাতে স্যানিটাইজার দেওয়া নিশ্চিতে পুলিশ সদস্যদের ব্যস্ত সময় কাটাতে দেখা গেছে। আর মেলায় যাতে মাস্ক পরে থাকে এনিয়ে বারবার মাইকে সতর্ক বার্তা প্রচার করেছে বাংলা একাডেমি কতৃর্পক্ষ।
ছেলেকে নিয়ে মেলায় এসেছিলেন ২৫০ শয্যা টিবি হসপিটালের সহকারী পরিচালক ডা. আয়শা শিল্পী। ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন স্টলে বই কিনে এসে বসেছিলেন পাঠক সমাবেশের সামনে। বললেন, আজই প্রথম এলাম মেলায়। খুব ভালো লাগছে করোনাকালের বদ্ধ জীবনের পরে মানুষ যেন মুক্তির স্বাদ পাচ্ছে মেলায় এসে। তবে, এরপরও সবাইকে স্বাস্থ্য সচেতনতা মেনে চলার, সতর্ক থাকার পরামর্শ দিলেন তিনি।
মূলমঞ্চে আলোচনা: বইমেলার মূলমঞ্চে গতকাল অনুষ্ঠিত হয় আন্তর্জাতিক বলয়ে একুশে ফেব্রুয়ারি উদযাপন শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিশ্বজিত্ সাহা। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন ইকবাল হাসান, তাজুল ইমাম এবং ইউসুফ রেজা। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব অসীম কুমার দে। অনুষ্ঠানের শুরুতে জাতিসংঘের সামনে একুশ উদযাপন শীর্ষক তথ্যচিত্র প্রদর্শিত হয়।
দ্বিতীয় পর্বে বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী : মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতি শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জাহীদ রেজা নূর এবং শহীদ ইকবাল। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন আমিনুর রহমান সুলতান এবং প্রশান্ত মৃধা। সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক ভীষ্মদেব চৌধুরী।
শুক্রবার লেখক বলছি অনুষ্ঠানে নিজেদের বই নিয়ে আলোচনা করেন আসলাম সানী এবং সাধনা আহমেদ। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কবিতা আবৃত্তি করেন কবি রবীন্দ্র গোপ, হারিসুল হক, ওবায়েদ আকাশ এবং রনজু রাইম। আবৃত্তি পরিবেশন করেন আবৃত্তিশিল্পী গোলাম সারোয়ার, বেলায়েত হোসেন এবং রেজিনা ওয়ালী। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশন করেন জাহান বশিরের পরিচালনায় সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘বিশ্বভরা প্রাণ’র শিল্পীবৃন্দ।
আজকের অনুষ্ঠান: বইমেলার মূলমঞ্চে আজ শনিবার অনুষ্ঠিত হবে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী : উন্নয়নের নারী শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন জোবাইদা নাসরীন। আলোচনায় অংশগ্রহণ করবেন ফওজিয়া মোসলেন এবং তাসমিমা হোসেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন নাছিমা বেগম।
নতুন বই: এবারের বইমেলায় বাংলা একাডেমি প্রকাশ করেছে ১০১টি। সবমিলিয়ে বই এসেছে ১৭৭টি। এর মধ্যে অনেকগুলো বই পুনর্মুদ্রণ করা হয়েছে। বইগুলোর মধ্যে জালাল ফিরোজের ‘বঙ্গবন্ধু গণপরিষদ সংবিধান’, আবদুল মান্নান সৈয়দ ও অন্যান্যের ‘রোকেয়া রচনাবলী’ সুব্রত বড়ুয়ার ‘বঙ্গবন্ধুর জীবনকথা’, আবুল কাসেমের ‘বঙ্গবন্ধু ও চা-শিল্প’, শামসুজ্জামান খান ও অন্যানের ‘বাংলা একাডেমি বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতি গ্রম্হমালা ময়মনসিংহ’ ও ‘বাংলা একাডেমি বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতি গ্রম্হমালা বরিশাল’, রফিকুল ইসলাম ও অন্যান্যের ‘নজরুল রচনাবলী (৪র্থ খণ্ড)’, শামসুজ্জামান খানের ‘বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ : বহুমাত্রিক বিশ্লেষণ’ ও ‘বঙ্গবন্ধু নানা বর্ণে নানা রেখায়’, মিনার মনসুর ও দিলওয়ার চৌধুরীর ‘শেখ মুজিব একটি লাল গোলাপ’, নূহ-উল-আলম লেনিনের ‘রাজনীতিতে হাতেখড়ি ও কলকাতায় শেখ মুজিব, দিব্যদ্যুতি সরকারের ‘বঙ্গবন্ধুর কারাজীবন’, সাইমন জাকারিয়ার ‘সাধক কবিদের রচনায় বঙ্গবন্ধুর জীবন ও রাজনীতি’, আসাদ চৌধুরীর ‘সংগ্রামী নায়ক বঙ্গবন্ধু’, পিয়াস মজিদের ‘মুক্তিযুদ্ধ বঙ্গবন্ধু ও বাংলা একাডেমি’, অজয় দাশগুপ্তের ‘বঙ্গবন্ধুর আন্দোলন কৌশল ও হরতাল’, শেখ মুজিবুর রহমানের ‘কারাগারের রোজনামচা’, মুহম্মদ নূরল হুদার ‘প্রাণের মিনার শহিদ মিনার’, সরকার আমিনের অনুবাদন্থ ‘তাও তে চিং’, আনোয়ারা সৈয়দ হক ‘ছোটোদের বঙ্গমাতা’ উল্লেখযোগ্য।