তবু পুরুষের চেয়ে নারী লেখক অনেক কম

অমর একুশে বইমেলাকে রঙিন করে রাখেন নারীরা। শাড়ি পরে, বাঙালি সাজে সেজে মেলাকে বাঙালির ঐতিহ্যের ধারায় ধরে রাখেন তারাই। কিন্তু বই মেলায় নারী লেখকদের বই কেমন বিক্রি হয়। প্রকাশকরা বলছেন, যারা ভালো লেখেন সেই নারী লেখকদের বই ভালো বিক্রি হয়। তবে পুরুষদের তুলনায় নারী লেখকের সংখ্যা খুব কম।

মেলায় আসা ‘পাঠকদের কোন নারী লেখকের বই পড়েন’ প্রশ্নের উত্তরে, সেলিনা হোসেন, নাসরীন জাহান, আনোয়ারা সৈয়দ হক ও রাবেয়া খাতুনের নাম উল্লেখ করেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বই পড়ার কথাও জানিয়েছেন অনেক পাঠক। অনেকে জাহানারা ইমামের ‘একাত্তরের দিনগুলি’র কথা বলেছেন, কেউ কেউ বলেছেন, নীলিমা ইব্রাহীমের বীরাঙ্গনা বলছি’ বইয়ের কথা। নারীবাদী লেখিকাদের মধ্যে তসলিমা নাসরীনের কথাও বলেছেন অনেকেই। তবে, যারা কিছুটা সিরিয়াস পাঠক তাদের মুখে উঠে এসেছে মোশাহিদা সুলতানা ঋতু, শাহীন আখতার, মৌরী মরিয়মের কথা।

বাংলাদেশে নারী লেখকদের সংখ্যা কম হলেও যারা সাহিত্যের জগতে পা রেখেছেন তারা সবাই নিজের স্বকীয়তায় পাঠকের হূদয়ে চির আসন পেয়েছেন। তবে নারী লেখক উঠে আসছেন খুব কম। বা অনেকে লিখলেও মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারছেন হাতেগোনা অল্প ক’জন। দেখা যাচ্ছে, পুরস্কার পাওয়ার মতো অবস্হানে নারী পৌঁছাতেই পারছেন না। তার আগেই ঝরে পড়ছেন। অনেকের সম্ভাবনা তো ঘরেই মারা পড়ে। প্রকাশের চৌকাঠ পেরোতে পারেন না।

আমাদের সমাজে কখনোই নারী লেখক যে খুব বেশি উঠে আসার সুযোগ পান না সেটা বাংলা একাডেমির সাহিত্য পুরস্কারে চোখ বুলালেই বোঝা যায়। বাংলা একাডেমির সাহিত্য পুরস্কার দেশের সম্মানজনক একটি পুরস্কার। সেখানে এ যাবত্কালে মাত্র ৯ শতাংশ নারী এ পুরস্কার পেয়েছেন। সেই ১৯৬০ সাল থেকে এ পুরস্কার প্রদান করা হচ্ছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, ১৯৬০ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেছেন ৩৪৩ জন। এর মধ্যে পুরস্কার পাওয়া নারী লেখক মাত্র ৩৩ জন। বাকি ৩১৩ জনই পুরুষ লেখক।

কালি ও কলম তরুণ কবি ও লেখক পুরস্কার দেশের স্বনামধন্য একটি সাহিত্য পুরস্কার। ২০০৮ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ১২ বছরে ৪৭ জন পুরস্কার পাওয়ার মধ্যে নারী আছেন মাত্র পাঁচ জন। বাকি ৪২ জন পুরুষ লেখক।

১৯৯৩ সাল থেকে অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার নিয়মিতভাবে নারী লেখক পৃষ্ঠপোষকতা ও স্বীকৃতি দিয়ে পুরস্কার প্রদান করে আসছে। দেশের স্বনামধন্য নারী লেখকদের অনেকেই অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার পাওয়ার মধ্য দিয়েই তাদের লেখক জীবনের প্রথম স্বীকৃতি পেয়েছেন। তারপরেও নারী লেখকদের উঠে আসার সংখ্যা বেশ কম।

এ প্রসঙ্গে নারী লেখকরা জানান, দেশে এখনো লেখালেখিকে পেশা হিসেবে নেওয়ার মতো পরিস্হিতি সৃষ্টি হয়নি। তাছাড়া, বাড়ির একটা ছেলে যখন লেখে তখন পরিবার তাকে অবসর তৈরি করে দেয়। কিন্তু মেয়েদের জন্য তা করা হয় না।

বাংলা একাডেমির সভাপতি ও কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন বলেন, মেয়েরা লেখক হিসেবে কম, তার দায়িত্ব শুধু মেয়েটার একার নয়। আমাদের সামাজিক, পারিবারিক এবং পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্হাও অনেকটা দায়ী। যে মেয়েরা লিখছেন দেখা যাবে তাদের পরিবার তাদের সহযোগিতা করছে। অনেক ভালো লেখক এই পরিবারের সহযোগিতার অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে আগামী প্রকাশনীর ব্যবস্হাপনা পরিচালক মিতিয়া ওসমান বলেন, নারীরা পেশাদার লেখক হিসেবে নিজেদের নিয়োজিত করতে পারছেন না। অনেকেই সম্ভাবনা নিয়ে লেখা শুরু করেন কিন্তু কিছুদিন পর তারা ঝরে যান। নারীকে লেখালেখির জন্য পরিবার, সমাজ কেউই সহযোগিতা করে না। তিনি বলেন, পশ্চিমবঙ্গে পুরুষদের পাশাপাশি অনেক নারী লেখক উঠে আসছেন। পশ্চিমবঙ্গে রিডিং সোসাইটি রয়েছে। তাদের সমাজও নারী লেখকদের উঠে আসবার ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করে না। তার ফলে, সেখানে অনেক নারী লেখক আমরা পাই। কিন্তু আমাদের এখানে সেটা দেখা যাচ্ছে না।

বাংলাদেশে নারী লেখকদের মধ্যে অগ্রগণ্য হচ্ছেন :সুফিয়া কামাল, হোসনে আরা, নীলিমা ইব্রাহীম, সন্জীদা খাতুন, জাহানারা ইমাম, সেলিনা হোসেন, রিজিয়া রহমান, রাবেয়া খাতুন, মকবুলা মনজুর, দিলারা হাশেম, খালেদা এদিব চৌধুরী, আনোয়ারা সৈয়দ হক, রুবী রহমান, কাজী রোজী, মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকা, রাজিয়া খান, রাজিয়া মজিদ, লায়লা সামাদ, হালিমা খাতুন, রাজিয়া মাহবুব, হেলেনা খান, পূরবী বসু, নূরজাহান বোস, ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্হ, সুরমা জাহিদ, নাদিরা মজুমদার, বেগম আকতার কামাল প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। এরপর তসলিমা নাসরীন, নাসরীন জাহান, শাহনাজ মুন্নী, ঝর্ণা রহমান পাঠকের কাছে তাদের লেখা নিয়ে উঠে আসেন।

ওপরে যাদের নাম দেওয়া হয়েছে তারা সবাই খুব সম্ভাবনা জাগিয়ে লেখা শুরু করেছিলেন কিন্তু পরবর্তীকালে অনেকেই ঝরে গেছেন। তবে, এদের মধ্যে অনেকেই আছেন যারা শত বাধার মুখেও নিজেদের সাহিত্যচর্চা চালিয়ে গেছেন এবং বাংলা ভাষায় তার নিজস্ব অবস্হান সৃষ্টি করেছেন।

সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কয়েক জন তরুণ নারী লেখক পাঠকের সমাদর লাভ করছেন। এদের মধ্যে শাহীন আখতার, অদিতি ফাল্গুনী, মোশাহিদা সুলতানা ঋতু, গুলতেকিন খান, সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম, মৌরি মরিয়ম, সাগুফতা শারমীন তানিয়া, আফসানা বেগম, রাশিদা সুলতানা, বদরুন নাহার, সাকিরা পারভীন সুমা, ফাতিমা রুমী, কামরুন নাহার শীলা, সুহিতা সুলতানা, শেলী নাজ, আফরোজা সোমা, আয়শা ঝর্না, ফাতেমা আবেদীন নাজলা প্রমুখ উল্লেখযোগ্য।