এলডিসি উত্তরণ 

দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে ধীরে ধীরে নানা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অর্থনীতিতে অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। কৃষিনির্ভর অর্থনীতি ছিল এক সময়ে এ অঞ্চলে। কিন্তু সেই কৃষিনির্ভর অর্থনীতি থেকে ক্রমশ বেরিয়ে এসে শিল্প ও সেবা খাতমুখী হয়েছে আমাদের অর্থনীতি। উন্নয়নের মহাসড়কে ছুটে চলা স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ এখন সাহাঘ্য গ্রহীতা নয়, সাহাঘ্যদাতার কাতারে উঠে এসেছে। মহান স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে লাল-সবুজের বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদায় উৎতরণের সুপারিশ করেছে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ। আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের মধ্য দিয়ে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে এখন চূড়ান্তভাবে উন্নয়নশীল দেশে উৎতরণ ঘটল বাংলাদেশের। তবে এলডিসি থেকে উৎতরণের পর বেশকিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এর মধ্যে প্রস্তুতিও শুরু করেছে সরকার। এলডিসি থেকে বের হলে আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজার থকে ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে ক্রেডিট রেটিং আগের চেয়ে বাড়বে এবং এখনকার চেয়ে কম সুদে ঋণ পাওয়া যেতে পারে। আর্থিক বাজারের বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশকে আরো ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করবে।

অন্যদিকে, চ্যালেঞ্জের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো, এলডিসি হিসেবে পাওয়া শুল্কমুক্ত ও বিভিন্ন অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধা থাকবে না। এর ফলে রপ্তানি বিশেষত, তৈরি পোশাক রপ্তানির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। অন্যদিকে, কৃষিতে ভতু‌র্কি সুবিধা সীমিত করতে হবে। জলবায়ু অর্থায়নে প্রাধিকার থাকবে না। ওষুধ শিল্প পেটেন্ট-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক বিধিবিধান থেকে এতদিন যে অব্যাহতি পেয়ে আসছে, তা থাকবে না। অন্যান্য ক্ষেত্রেও মেধাস্বত্বের আন্তর্জাতিক নীতিগুলো পালন করতে হবে। এসব চ্যালেঞ্জ মাথায় রেখে বাংলাদেশকে একটি উৎতরণ কৌশল প্রণয়ন করতে হবে। এলডিসি থেকে মসৃণ ও টেকসই উৎতরণ নিশ্চিত করতে এরই মধ্যে বেসরকারি খাত ও উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে নিয়ে প্রয়োজনীয় নীতিকৌশল ও পদক্ষেপ প্রণয়ন করা হচ্ছে। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হওয়ার পর, বাংলাদেশের জন্য অসংখ্য সম্ভাবনা তৈরি হবে। ব্যবসা-বাণিজ্য ও রপ্তানি খাতে চাহিদা তৈরি হবে নতুন পণ্যের। অর্থনীতির আকারও বড় হবে। সরকারের নেওয়া নানা অবকাঠামো প্রকল্পের বাস্তবায়ন শেষ হলে বিদেশি বিনিয়োগও বাড়বে। তখন পণ্য পরিবহন, বন্দরের সক্ষমতাও বাড়াতে হবে।

আগামী ২০ থেকে ২৫ বছরে দেশের অর্থনীতি সার্বিকভাবে সম্প্রসারিত হবে। এ সুযোগকে এগিয়ে নিতে পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার পাশাপাশি ডেলটা প্ল্যান বাস্তবায়ন করা হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী অগ্রসর হচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনীতি।

সরকার দেশের ভবিষ্যত্ উন্নয়নের চাবিকাঠি হিসেবে নেদারল্যান্ডের আদলে তৈরি ‘শতবর্ষীয় ডেলটা প্ল্যান’ বা ‘ডেলটা প্ল্যান-২১০০’-কে বিবেচনা করছে। প্ল্যান-২১০০-এ বন্যা, নদীভাঙন, নদী ব্যবস্হাপনা, নগর ও গ্রামীণ পানি সরবরাহ, বর্জ্য ব্যবস্হাপনা এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও নিষ্কাশন ব্যবস্হাপনার জন্য ছয়টি দীর্ঘমেয়াদি কৌশল রয়েছে। ডেলটা প্ল্যানের প্রথম পর্যায়ের ৮০টি প্রকল্পের মধ্যে ৭৫টি ভৌত অবকাঠামো এবং ১৫টি প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা, দক্ষতা এবং গবেষণা অন্তভু‌র্ক্ত রয়েছে। এসব প্রকল্পে মোট ২ লাখ ৯৭ হাজার ৮০০ কোটি টাকা ব্যয় করা হবে। এর মধ্যে বন্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পে ২ হাজার ৭৯৮ কোটি টাকা এবং নদী ব্যবস্হাপনায় ৪৮ হাজার ২৬১ কোটি টাকা ব্যয় করা হবে। এছাড়া শহর ও গ্রামাঞ্চলে পানি সরবরাহের জন্য যথাক্রমে ৬৭ হাজার ১৫২ কোটি টাকা, নদীভাঙন রোধে ৬৮ হাজার ৮৭৯ কোটি টাকা, পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য ৫ হাজার ৯৮৬ কোটি টাকা এবং খরাপ্রবণ এলাকায় ১৬ হাজার ৩১৪ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। বাকি ৮৮ হাজার ৪১০ কোটি টাকা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে বিনিয়োগ করা হবে।

মাথাপিছু আয়ে একের পর এক সুসংবাদ আসছে। গত নভেম্বরেই দেশের মাথাপিছু আয় ছিল ২ হাজার ৫৫৪ ডলার। সেই হিসাবকে পেছনে ফেলে বিদায়ি ২০২০-২১ অর্থবছরের চূড়ান্ত হিসাব অনুযায়ী মাথাপিছু আয় দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৫৯১ ডলার। দেশীয় মুদ্রায় যা ২ লাখ ১৯ হাজার ৭৩৮ টাকা। মনে রাখতে হবে, মাথাপিছু আয় কোনো ব্যক্তির একক আয় নয়। দেশের অভ্যন্তরের পাশাপাশি রেমিট্যান্সসহ যত আয় হয়, তা দেশের মোট জাতীয় আয়। সেই জাতীয় আয়কে মাথাপিছু ভাগ করে দেওয়া হয়। বিবিএসের তথ্যানুযায়ী, ২০১৯-২০ অর্থবছরে মাথাপিছু আয় ছিল ২ হাজার ৩২৬ ডলার বা ১ লাখ ৯৭ হাজার ১৯৯ টাকা। তার মানে পরের এক বছরে ২৬৫ ডলার বেড়েছে। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেছেন, আগামী অর্থবছরে আমাদের মাথাপিছু আয় ৩ হাজার ৮৯ মার্কিন ডলার হবে। সে বছর জিডিপির প্রবৃদ্ধি হবে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। চূড়ান্ত হিসাবে ২০২০-২১ অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬ দশমিক ৯৪ শতাংশ। সাময়িক হিসাবে তা ছিল ৫ দশমিক ৪৩ শতাংশ।

বিবিএসের তথ্যানুযায়ী, ২০১৯-২০ অর্থবছরে করোনার প্রভাবে জিডিপি প্রবৃদ্ধি তলানিতে নেমেছিল। সেবার প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ। প্রবাসীদের পাঠানো আয় ও রপ্তানি আয় বৃদ্ধির কারণে চূড়ান্ত হিসাবে প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। আগামী ২০ থেকে ২৫ বছরে দেশের অর্থনীতি সার্বিকভাবে সম্প্রসারিত করতেই সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ডেলটা প্ল্যান প্রণয়ন করা হয়েছে। পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় নির্ধারিত লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে ‘ডেলটা প্ল্যান’-এর অনেক মিল রয়েছে। এজন্য মন্ত্রণালয়গুলোকে তাদের পঞ্চবার্ষিক ও বার্ষিক পরিকল্পনা ‘ডেলটা প্ল্যান’-এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না সেদিকে নজর রাখতে হবে।