লোকশিল্পীদের খোঁজে...

২০২০ খৃষ্টাব্দের মার্চ মাসে বাংলাদেশে যখন কোভিড-১৯ সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে তখন থেকে এদেশের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির অন্তর্গত লোকায়ত শিল্পীরা বিপর্যয়ের মুখে পড়েন। দীর্ঘদিন লকডাউনে তাদের পেশাগত জীবন বিপন্ন হয়ে পড়ে। এর প্রধান কারণ হলো—এদেশের লোকায়ত শিল্পীদের কোনো তালিকা ছিল না, দ্বিতীয় কারণ হলো—লোকায়ত শিল্পীদের কোনো পেশাগত স্বীকৃতি ছিল না বা নেই। এক্ষেত্রে সরকার বিভিন্ন পেশাজীবীদের সাহায্যের উদ্যোগ নিলে লোকায়ত শিল্পীদের পেশাগত স্বীকৃতি ও তালিকা না থাকায় তারা দুর্যোগকালীন রাষ্ট্রীয় সহায়তা থেকে বঞ্চিত হতে থাকেন। এ পরিস্থিতিতে লোকশিল্পীদের তালিকা প্রণয়ন অত্যন্ত জরুরি।

বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির বিচিত্র শিল্পধারা  তথা লোকায়ত সংগীত, নৃত্য, নাট্য, বাদ্য এবং অপরাপর অবস্তুগত বা ভাবগত ও বস্তুগত শিল্প চর্চায় নিবিষ্ট যে শিল্পীরা গুরু-শিষ্য পরম্পরায় বা বংশপরম্পরায় নিবেদিত এই তালিকায় প্রধানত তাদেরকে লোকশিল্পী হিসেবে শনাক্ত করা যেতে পারে। আসলে, যে সব লোকায়ত শিল্পচর্চাকারীদের জীবন ও শিল্পচর্চা অবিচ্ছিন্ন তালিকায় তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। অর্থাৎ লোকায়ত জীবনে যারা পেশাগতভাবে বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী নাট্য, নৃত্য, গীত, অভিনয়, বাদ্য পরিবেশনসহ নানা ধরনের লোকায়ত শিল্পনির্মাণ তথা শখের হাঁড়ি, শীতল পাটি, নকশি কাঁথা, কাঠের পুতুল, কাসা-পিতলের শিল্পকর্ম, মাটির পুতুল, পিঠা-পুলি, তাঁতের কাজ, বাঁশ-বেতের শিল্প, শতরঞ্জি, পটচিত্র, শোলাশিল্পসহ নানা ধরনের ঐতিহ্যগত শিল্পকলার সঙ্গে সম্পৃক্ত তাদের লোকশিল্পী হিসেবে গ্রহণ করা যায়।

সেই তাগিদ থেকে লোকায়ত শিল্পীদের তালিকা সংগ্রহের উদ্যোগ গ্রহণ করি। বিগত প্রায় ৩ বছর ধরে আমরা এই লোকায়ত শিল্পীদের তালিকা তৈরির কাজ করেছি। এই তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে প্রথমত আমরা দীর্ঘদিনের গবেষণা-অভিজ্ঞতায় ব্যক্তিগতভাবে পরিচিত লোকায়ত শিল্পীদের সহযোগিতা নিয়েছি। দ্বিতীয়ত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক, ইউটিউব, হোয়াটাসঅ্যাপ, ইমেইল ও মোবাইলফোন ব্যবহারের মাধ্যমে তালিকার জন্য তথ্য সংগ্রহ করতে থাকি। তৃতীয়ত, সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট এবং বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীসহ বিভিন্ন অঞ্চলের বাউল শিল্পীসংস্থা, বাউল সমিতি প্রভৃতি সংগঠন থেকে বাংলাদেশের লোকশিল্পী তালিকা সংগ্রহের চেষ্টা করি। কিন্তু বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে লোকশিল্পীদের তালিকা সংগ্রহের প্রচেষ্টা আশানুরূপ সফল না হলেও কিছু তথ্য আমরা সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছি। বাঙালি লোকশিল্পীদের পাশাপাশি আদিবাসী তথা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর লোকশিল্পীদের তালিকা সংগ্রহের ক্ষেত্রে আমরা সংশ্লিষ্ট নৃ-গোষ্ঠীর বিভিন্ন প্রতিনিধিত্বশীল ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সাহায্য গ্রহণ করে সামান্য পরিমাণে হলেও সফল হয়েছি। তবে, কোনো তথ্যই আমরা নির্বিচারে গ্রহণ করিনি। তথ্য গ্রহণের পর আমরা নিজস্ব পদ্ধতিতে তা যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে তালিকায় অন্তর্ভুক্তির জন্য চূড়ান্ত করেছি।

প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশের আটটি বিভাগের অন্তর্গত ৬৪টি জেলার ৪ সহস্রাধিক বাঙালি ও অবাঙালি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর লোকশিল্পীর নাম, শৈল্পিক পরিচয়, পূর্ণাঙ্গ ঠিকানা ও ব্যক্তিগত যোগাযোগের ফোন নম্বর সংকলন করা সম্ভব হয়েছে। প্রতিটি বিভাগের শুরুতে বিভাগের অন্তর্ভুক্ত জেলাসমূহের নাম ও সেই অঞ্চলে প্রচলিত ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি সম্পর্কে একটি সংক্ষিপ্ত ভূমিকা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এতে করে খুব সহজে এক একটি বিভাগের বৈচিত্র্যময় ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির পরিচয় পাওয়া যাবে, সেই সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির শিল্পচর্চাকারী লোকশিল্পীদের সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা পাওয়া যাবে।

লোকশিল্পীদের পাশাপাশি এই তালিকায় বাংলাদেশের হাজার বছরের ভাবসাধনার ঐতিহ্যিক পরম্পরায় সাধনারত প্রসিদ্ধ বাউল সাধক, সুফিসাধক, লোকায়ত কবিদের নাম গ্রম্হন করা হয়েছে। কারণ, এ দেশের লোকায়ত শিল্পচর্চার ধারার সঙ্গে সাধনার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। বাউলগান বা সুফিসংগীত তো বাউল সাধকদের সাধনার পরম্পরা ও চর্চা থেকে উদ্ভূত। তাই এই তালিকায় তাদের নাম অন্তর্ভুক্ত থাকা সমীচীন। মূলত এই বোধ থেকেই গুরু-শিষ্য পরম্পরায় সাধনারত নবীন ও প্রবীণ কিছু বাউল সাধক-সাধিকার নাম অন্তর্ভুক্ত রাখা হয়েছে। নর-নারী লোকশিল্পীদের পাশাপাশি তৃতীয় লিঙ্গের লোকশিল্পীদের এই তালিকা স্থান দেওয়া হয়েছে।

অমর একুশে বইমেলা ২০২২-এ প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের লোকশিল্পী তালিকা গ্রন্থ প্রকাশ করছে ভাবনগর ফাউন্ডেশন ও অন্যধারা। এই তালিকায় শুধু লোকশিল্পীদের নাম, পরিচয়, পূর্ণাঙ্গ ঠিকানা ও ফোন নম্বরই পাওয়া যাবে না, উপরন্তু এর মাধ্যমে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি চর্চার বৈচিত্র্য পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। অর্থাৎ এক একটি ভৌগোলিক এলাকায় কত ধরনের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের চর্চা রয়েছে তা নির্ণয় করা সম্ভব। সার্বিক বিচারে, এটি হবে বাংলাদেশের বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও তালিকা। এই তালিকার সূত্র ধরে ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি ও তা চর্চাকারী লোকশিল্পীদের সুরক্ষায় সাংবিধানিক নির্দেশনা বাস্তবায়ন সম্ভব হবে বলে প্রত্যাশা করি।

লেখক: নাট্যকার ও গবেষক