আধুনিক যন্ত্রসভ্যতায় সুবিধার পাশাপাশি যন্ত্রণাও কম নহে। এই যুগে মোবাইল ফোন ছাড়া একটি মুহূর্তও কল্পনা করা যায় না; কিন্তু মোবাইল ফোনসেট এবং ফোন অপারেটরদের টাওয়ার হইতে নিঃসৃত রেডিয়েশন তথা তেজস্ক্রিয়তা কতটা উচ্চপর্যায়ের এবং তাহা আমাদের স্বাস্থ্যের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলিতেছে— তাহা লইয়া বিবিধ উত্কণ্ঠা আছে। বাংলাদেশের মোবাইল টাওয়ারের ক্ষতিকর রেডিয়েশন বা তেজস্ক্রিয়তা ছড়াইবার বিষয়ে সমীক্ষা করিয়া চার মাসের মধ্যে বিটিআরসিকে রিপোর্ট দাখিল করিতে গত বৃহস্পতিবার নির্দেশ দিয়াছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে ওই সমীক্ষা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে মোবাইল টাওয়ারে বিকিরণমাত্রা নির্ধারিত মাত্রার চাইতে ১০ ভাগের এক ভাগ করা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, কারাগার, খেলার মাঠ ও জনবসতিপূর্ণ ও প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকা হইতে ক্ষতিকর বিকিরণ ছড়ানো টাওয়ার সরানো, বিটিআরসির স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে মনিটরিং সেল গঠন করাসহ ১১ দফা নির্দেশনা দেওয়া হইয়াছে। কোনো টাওয়ারে তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা বেশি হইলে তাহা অপসারণ করিয়া নূতন টাওয়ার বসাইবার পাশাপাশি মোবাইল সেটে দৃশ্যমানভাবে স্পেসেফিক অ্যাবজরপশন রেট (এসএআর) মান লিখিতে হইবে।
দুই দশক আগে বাংলাদেশে মোবাইল ফোনের যাত্রা শুরুর সময় মোবাইল ফোন অপারেটরদের যত্রতত্র টাওয়ার স্থাপন ব্যাপারে কোনো বিধিনিষেধ ছিল না। ফলে তাহারা যেইখানে সেইখানে এমনকি বাসাবাড়ির ছাদেও টাওয়ার স্থাপন করিয়াছে, পরবর্তীসময়ে যাহা উদ্বেগের বিষয় হইয়া দেখা দিয়াছে। বাংলাদেশে শহর হইতে গ্রামগঞ্জ অবধি বিস্তৃত পাঁচটি মোবাইল অপারেটরের প্রায় চল্লিশ হাজার টাওয়ার আছে। কয়েক বত্সর আগে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী বিশেষজ্ঞদের দিয়া গঠিত কমিটি ঢাকার কিছু মোবাইল টাওয়ার হইতে উচ্চমাত্রার রেডিয়েশন বা তেজস্ক্রিয়তার প্রমাণ পায়। ইহার পর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ও উদ্যোগী হইয়া একটি গাইডলাইন তৈরি করিয়াছে। গাইডলাইনে রেডিয়েশন মাত্রা আন্তর্জাতিক নন আয়জনিং রেডিয়েশন প্রতিরক্ষা কমিশন বা আইসিএআইআরপি-এর নির্দেশনা মতো দশ মেগাহার্টজে সীমাবদ্ধ রাখিতে বলা হইয়াছে; কিন্তু অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, বাংলাদেশের জনসংখ্যা ঘনত্ব ও পরিবেশ বিবেচনায় ইহা হওয়া উচিত দশ ভাগের এক ভাগ। মোবাইল ফোন টাওয়ার ও হ্যান্ডসেটের রেডিয়েশন হইতে কানের বা মস্তিষ্কের টিউমার, মাথাব্যথা, হূদরোগসহ, ঘুম ঘুম ভাব, নিদ্রাহীনতা, কাজের ব্যাঘাত ঘটাসহ বিবিধ সমস্যার কথা আইসিএআইআরপি-এর ওয়েবসাইটে উল্লেখ করা আছে। দুঃখজনক ব্যাপার হইল, অধিক মুনাফা লাভের আশায় বাংলাদেশে অসংখ্য নিম্নমানের মোবাইল ফোনসেট আমদানি করা হয়, যাহাতে রেডিয়েশন অনেক ক্ষেত্রেই উচ্চমাত্রায় থাকে।
মনে রাখিতে হইবে, মানব শরীর একটি নির্দিষ্ট মাত্রার তরঙ্গ বিকিরণ শোষণ করিতে পারে। এই মাত্রাটি স্পেসেফিক অ্যাবজরপশন রেট (এসএআর) বলা হয়। বিশ্বব্যাপী মোবাইল ফোনের এসএআর মাত্রা নির্ধারণ করা হইয়াছে প্রতি কিলোগ্রাম এককে ১.৬ ওয়াট। ইহার চাইতে বেশি বিকিরণ কোনো ফোন হইতে তৈরি হইলে তাহা স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। যে কেহ তাহার স্মার্ট ফোনটির এসএআর জানিয়া লইতে পারেন *#০৭# কোডটি ডায়াল করিয়া। শুধু স্মার্টফোন ব্যবহার করিলেই হইবে না— স্মার্টফোনটি ব্যবহার উপযোগী কিনা সেই ব্যাপারেও ব্যবহারকারীকে স্মার্ট হইতে হইবে।