সাধন সরকার
আশি-নব্বই দশকের ঢাকার সঙ্গে এখনকার ঢাকার পার্থক্য অনেক। জনসংখ্যা বেড়েছে, মেগাসিটির তকমা পেয়েছে ঢাকা। বাস্তবতা হলো, পরিকল্পিত উন্নয়নের চেয়ে এখন অপরিকল্পিত উন্নয়নের খেসারত গুনতে হচ্ছে ঢাকাকে। পরিবেশের বিভিন্ন সূচকে ঢাকার অবস্থান বিশ্বের পেছনের সারির শহরগুলোর একটি। রাজধানীতে সবুজের আচ্ছাদন কমছে! বাড়ছে দূষণের মাত্রা। শব্দদূষণ, বায়ুদূষণ ও পানিদূষণের কারণে রাজধানীবাসীকে প্রতিনিয়ত ভুগতে হচ্ছে। নির্দিষ্ট কয়েকটি পার্ক-উদ্যান বাদ দিলে রাজধানীতে সবুজের সমারোহ নেই বললেই চলে! যতদূর চোখ যায়—দেখা মেলে ইট-কাঠ-পাথরে মোড়া কংক্রিটের এক নগরীর ছবি।
এক তথ্য মতে, ১৯৮৮ সালে ঢাকা শহরের প্রায় ৩৩ শতাংশ গাছপালায় আবৃত ছিল। ১৯৯৮ সালে তা ২৯ শতাংশে দাঁড়ায়। ২০১৮ সালে সবুজের আচ্ছাদন নেমে এসেছে প্রায় ২২ শতাংশে!
ছোট্ট এই রাজধানী শহরকে নিয়ে শুধু পরিকল্পনা হয়েছে, কিন্তু সে পরিকল্পনা কাজে লাগানো হয়নি! খাল-জলাশয় ভরাট করে গড়ে তোলা হয়েছে সুউচ্চ ভবন। চারপাশের নদ-নদীগুলোও দখল-দূষণে জর্জরিত। বিশ্বের বসবাসের অযোগ্য শহরের তালিকায় ঢাকার স্থান প্রথম দিকে। লোভ ও অপরিকল্পিত নগরায়নের ছাপ পড়েছে পার্ক-উদ্যান ও ভূমির ওপর। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে নগরের জীববৈচিত্র্যের ওপরও। সার্বিক বাস্তুসংস্থানসহ প্রাকৃতিক পরিবেশের কাঠামো বদলে গেছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকা শহরে উত্তপ্ত এলাকার সংখ্যা বাড়ছে। গ্রীষ্ম বা শীতে ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকায় তাপমাত্রার ব্যাপক পার্থক্য লক্ষণীয়। বিভিন্ন অজুহাতে শহরের মধ্যে ‘এক টুকরো সবুজ’ বলে খ্যাত ‘সড়কদ্বীপ’গুলো ধ্বংস করা হচ্ছে! উন্নয়নের কারণে গাছপালা কাটা পড়ছে প্রতিবছরই। পার্ক-উদ্যানগুলোতেও যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে গাছপালা কমছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) এক গবেষণায় বলা হয়েছে, একটি শহরে প্রত্যেক নাগরিকের সুস্থতার জন্য কমপক্ষে ৯ বর্গমিটার সবুজের আচ্ছাদন থাকা প্রয়োজন; ঢাকায় রয়েছে মাত্র ২ বর্গমিটার। রাজধানীতে সবুজের সমারোহ কমার পাশাপাশি বাড়ছে বায়ুদূষণ। বিশ্বের রাজধানী শহরগুলোর মধ্যে বায়ুদূষণের দিক দিয়ে ঢাকার অবস্থান দ্বিতীয়। এই শহরে বাতাসে ক্ষুদ্র বস্তুকণার পরিমাণ (পার্টিকুলেট ম্যাটার বা পিএম ২.৫) বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বেঁধে দেওয়া মানের চেয়ে প্রায় ১০গুণ বেশি। বায়ুদূষণের কারণে নগরবাসীর মধ্যে হূদরোগ, শ্বাসকষ্টজনিত জটিল সমস্যা, ফুসফুসে সংক্রমণ ও ক্যানসারের মতো জটিল রোগবালাই ছড়িয়ে পড়ছে। তাই ঢাকা শহরে সবুজের সমারোহ না বাড়ানো গেলে টিকে থাকা কঠিন হবে।
যথাযথ উদ্যোগে নদী ও খালগুলো রক্ষা করে শহরবাসীর বিনোদনের চাহিদা মেটানোর সঙ্গে সঙ্গে শহরটাকে আধুনিক, বসবাসযোগ্য, পরিবেশবান্ধব ও জলসবুজে আকর্ষণীয় হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে। তাই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে চারপাশের নদ-নদী ও খালগুলো দখল-দূষণের হাত থেকে রক্ষা করতে হবে। নদ-নদী ও খালকেন্দ্রিক প্রাকৃতিক জলাধারগুলো ঘিরে সবুজের সমারোহ তৈরি করা যাবে। পাশাপাশি শহরের ফাঁকা জায়গাগুলোতে জোন বা সেক্টর ভিত্তিক পার্ক, উদ্যান ও বিনোদনকেন্দ্র গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে। রাস্তার মোড়ে ফাঁকা জায়গাগুলোতে সড়কদ্বীপ তৈরি এক্ষেত্রে ভালো সমাধান হতে পারে। ঢাকা শহরের সবুজায়ন বৃদ্ধিতে ‘ছাদবাগান’ও (বাড়ির ছাদে, কার্নিশে, বারান্দায়, চিলেকোঠায়, জানালার পাশে, সিঁড়ির কিনারায় প্রয়োজনীয় গাছ লাগানো) ভালো কাজ দেবে। এছাড়া ব্যস্ত সড়কের ডিভাইডার অংশে ও ফ্লাইওভারের নিচে ফেলে রাখা ফাঁকা জায়গাগুলোতে সৌন্দর্য বাড়াতে সবুজায়নের পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
পরিশেষে, নান্দনিক ও সবুজ ঢাকা গড়তে ঋতুভিত্তিক বৃক্ষরোপণের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে নার্সারি প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় ও বায়ুদূষণ রোধে রাজধানী ঢাকাকে সবুজ নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সবার উদ্যোগের পাশাপাশি সচেতন হওয়ার বিকল্প নেই।
ঢাকা