১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটিয়ে ভারত এবং পাকিস্তান নামে দুটি রাষ্ট্র জন্মলাভ করে। আমাদের এই বাংলাদেশ তখন পূর্ব পাকিস্তান। পাকিস্তান সৃষ্টির যে স্বপ্ন এ অঞ্চলের মানুষ অন্তরে লালন করেছিল—বছর পার হতে না হতেই সে আশা বালির বাঁধের মতো ধসে যেতে লাগল।
পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী সর্বদিক দিয়ে উপেক্ষা করতে থাকে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি জনগোষ্ঠীকে। প্রচণ্ড ধাক্কা আসে আমাদের সংস্কৃতি ও ভাষার ওপর। বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা না দেওয়ার ষড়যন্ত্র শুরু হয় ১৯৪৭ সালেই এবং আন্দোলনের শুরুটাও সেই থেকে। ভাষা আন্দোলনের ঢেউ এসে লাগে বিপবী যশোরেও। ১৯৪৮ সালের ২৮ ফেব্র‚য়ারি পুরাতন কলেজের এল ভি মিটার লেকচার হলে সাধারণ ছাত্রদের নিয়ে ভাষার দাবিতে এক সভা আহ্বান করা হয়। এই সভায় বক্তব্য দেন, বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতৃবৃন্দের মধ্যে, রঞ্জিত মিত্র, আলমগীর সিদ্দিকী, সুধীর কুমার ঘোষ, আফসার আহমেদ সিদ্দিকী, হামিদা রহমান, সৈয়দ আফজাল হোসেন, নাজিমউদ্দীন, কাজী আবদুর রকীব, হায়বতুল্লাহ জোয়ার্দার সহ অনেকেই।
এই সভায় বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে আন্দোলন পরিচালনার প্রয়োজনে আলমগীর সিদ্দিকী ও রঞ্জিত মিত্রকে যুগ্ম আহ্বায়ক করে, রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। এই কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন, আফসার আহমদ সিদ্দিকী, হামিদা রহমান, দেবব্রত চ্যাটার্জী, সৈয়দ আফজাল হোসেন, কাজী আব্দুর রকীব, হায়বতুল্লাহ জোয়ার্দার প্রমুখ।
পরবর্তী সময়ে আন্দোলন আরো বেগবান হওয়ায় সঙ্গে সঙ্গে যশোরের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব অ্যাডভোকেট মশিউর রহমান (প্রাক্তন মন্ত্রী), ডা. জীবন রতন ধর (পশ্চিম বাংলার প্রাক্তন মন্ত্রী), অ্যাডভোকেট হাবিবুর রহমান (খালেদুর রহমান টিটোর পিতা), অ্যাডভোকেট আব্দুল খালেককে ‘কোআপট’ করে নেওয়া হয়। নবগঠিত রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ভাষার দাবিতে ২ মার্চ কলেজে ছাত্র ধর্মঘট পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং প্রতিদিনই ক্লাস বর্জনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করতে থাকে। ৭ মার্চ রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে ভাষার দাবিতে প্রথম একটি মিছিল কলেজ চত্বর পেরিয়ে যশোর শহরের বিভিন্ন রাস্তা প্রদক্ষিণ করে।
ইতিমধ্যে ঢাকাসহ সারা দেশে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন দানা বেঁধে উঠতে থাকে। ৭ মার্চের ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সভায় ১১ মার্চ সমগ্র দেশব্যাপী ধর্মঘট পালনের কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে যশোরেও ধর্মঘট পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
১১ মার্চের হরতালকে প্রতিহত করতে ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রে্রট নোমানী শহরে ১৪৪ ধারা জারী করে, শোভাযাত্রা-মিছিল-মিটিং নিষিদ্ধ ঘোষণা করে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। ১০ মার্চ বিকাল ৪টায় ভাষা আন্দোলনের সপক্ষের সব রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সদস্যবৃন্দ কাপুড়িয়াপট্টির রিপাবলিকান দলের অফিসে এক জরুরি সভায় সংকটময় পরিস্হিতি নিয়ে আলোচনার জন্য মিলিত হন।
আলোচনায় ছাত্র নেতৃবৃন্দ ১৪৪ ধারা ভঙ্গে অবিচল থাকলেও অধিকাংশ রাজনৈতিক নেতাগণ এর বিপক্ষে মতামত প্রকাশ করেন। একমাত্র কমিউনিস্ট পার্টির কমরেড অনন্ত মিত্র ও লুত্ফর রহমান ১৪৪ ধারা ভাঙার সপক্ষে ছাত্রনেতাদের মতকে সমর্থন করেন। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ শান্িতপূর্ণভাবে পিকেটিং পর্যন্ত সম্মত হলেন। কিন্তু ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভাঙার সিদ্ধান্েত অনড় থাকায় তারা মিটিং থেকে উঠে চলে যান। শহরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সড়কে ১১ মার্চ ছাত্ররা সকাল থেকেই ধর্মঘটের সপক্ষে পিকেটিং শুরু করেন। অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই ধর্মঘট পালিত হয়।
বিক্ষুব্ধ মিছিল সমগ্র শহর ঘুরে বারকাউন্সিলের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় অ্যাডভোকেট মশিয়ূর রহমানের নেতৃত্বে আইনজীবীরা ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই, রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ েÕÐাগান দিতে দিতে সেদিনের মিছিলে এসে যোগ দেন।
১১ মার্চ রাষ্ট্রভাষার দাবিতে শহরে কোনো দোকানপাট খোলেনি এবং রিকশা ও যানবাহন চলেনি, পালিত হয় নীরব হরতাল। নেতৃবৃন্দের মুক্তির দাবিতে ছাত্রকর্মী জনতা কোট এলাকায় জমায়েত হতে থাকে। উদ্ভূত পরিস্হিতি এড়াতে পুলিশ ছাত্র-জনতাকে লাঠিপেটা করে ছত্রভঙ্গ করে দেয় এবং বন্দিদেরকে সত্বর জেলখানায় পাঠানোর ব্যবস্হা করে।
উদ্ভূত পরিস্হিতি নিয়ে আলোচনার জন্য ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের’ নেতৃবৃন্দ অতিগোপনে রাত ৮টায়, মাইকেল মধুসূদন কলেজের পুরোনো হোস্টেল ভবনের ছাদে এক জরুরি সভা আহ্বান করেন। এই মিটিংয়ে উপস্হিত ছিলেন, আলমগীর সিদ্দিকী, আফসার আহ্মদ সিদ্দিকী, ডা. জীবন রতন ধর ও হামিদা রহমান। এই গোপন মিটিংয়ের সংবাদ পুলিশ পেয়ে যায় এবং সমগ্র হোস্টেলটি পুলিশ ঘিরে ফেলে। সেবার অবাঙালি দারোয়ান কেশব চন্দ্রের বুদ্ধিমত্তা ও সাহসিকতাপূর্ণ ভূমিকার কারণে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রামীরা রক্ষা পেয়ে যান।
‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’-এর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১২ মার্চ মাইকেল মধুসূদন কলেজে পূর্ণাঙ্গ ধর্মঘট পালিত হয়। ছাত্ররা ১৩ তারিখের হরতালের সমর্থনে দলে দলে বিভক্ত হয়ে শহরে প্রচারকার্য চালায়। ১৩ মার্চের হরতালের সমর্থনে ১২ তারিখের দুপুর থেকেই শহরের দোকানপাট বন্ধ হয়ে যেতে থাকে।
অগ্নিঝরা যশোরে ঐতিহাসিক দিন ১৩ মার্চ। স্তূপাকার বারুদ যেন অগ্নিসংযোগে জ্বলে উঠল দাউদাউ করে।
শ শ ছাত্র সেদিন সকাল থেকেই কলেজ প্রাঙ্গণে এসে হাজির হতে থাকে। বেলা ১০টা বাজার সঙ্গে সঙ্গেই বিশাল ছাত্র মিছিলটি আলমগীর সিদ্দিকী, আফসার আহমদ সিদ্দিকী, হামিদা রহমান, হায়বতুল্লাহ জোয়ার্দার, বিমল রায় চৌধুরী, গোলাম ইয়াজদান চৌধুরী, আবুল হাসেম, শামসুল আলম ও শেখ আমান উল্লাহর নেতৃত্বে রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই, সকল রাজবন্দীর মুক্তি চাই েÕÐাগান দিতে দিতে বেরিয়ে পড়ে যশোরের রাজপথে। সেদিনের এই ভাষা আন্দোলনে রাস্তায় রিকশাওয়ালারাও লুঙ্গির কোঁচড় ভরে ভরে ইটের খোয়ার জোগান দিয়েছিল।
একপর্যায়ে ছাত্ররা নিরাপত্তা ও গ্রেফতার এড়ানোর জন্য শহরের ঝালাইপট্টি পতিতালয়ে ঢুকে পড়ে। সেখানে যৌনপল্লির মেয়েরা অনেক ছাত্রকে ঘরের মধ্যে তালাবদ্ধ করে রেখে পুলিশের চোখকে ফাঁকি দিয়ে তাদের রক্ষা করে। যশোরে যৌনকর্মীদের ভাষা আন্দোলনে সেদিনের এ অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
সরকারের নগ্ন হামলার প্রতিবাদে ১৪ মার্চ সমগ্র যশোর শহরে পালিত হয় হরতাল এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহে অবিরাম ধর্মঘটের কর্মসূচি চলতে থাকে। সরকার বিশেষ ক্ষমতা আইনে অ্যাডভোকেট হাবিবুর রহমান, কমরেড আব্দুল হক, কমরেড শান্িতময় ঘোষ, রঞ্জিত মিত্র, শ্রী হীরেন সেন, কমরেড সুবোধ রায়কে গ্রেফতার করে।
১৮ মার্চ যশোরে ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ কারামুক্তি দিবস পালন করে। ১১ ও ১৩ মার্চের হরতালে আটক রাজবন্দিদের একসঙ্গে জেল থেকে মুক্ত করাই ছিল তাদের উদ্দেশ্য। এ আন্দোলনকে প্রতিহত করার লক্ষ্যে যশোরের জেলা প্রশাসন ও মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দ ন্যক্কারজনক অধ্যায়ের সূচনা করে। তারা ১৮ মার্চের কর্মসূচি ও ভাষা আন্দোলন বানচাল করার জন্য অবাঙালিদেরকে উসকানি দিতে থাকেন। সেদিন দড়াটানায় অনেক অবাঙালি ছোরা, রড, লাঠি, রামদাসহ অন্যান্য মারা¦ক অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে হিন্দু-মুসলমান অথবা বিহারি-বাঙালিদের মধ্যে দাঙ্গা বাধানোর প্রচেষ্টা চালায়। মধুসূদন কলেজের ছাত্ররা যখন ১০টার দিকে বিশাল মিছিলসহ শহরে প্রবেশ করে, তখন তারা এ পরিস্হিতি ধৈর্যের সঙ্গে মোকাবিলা করে।
১৯৪৮ সালের ১৫ মার্চ ভাষা আন্দোলনের বন্দিদের কারামুক্তির ভেতর দিয়ে ভাষা আন্দোলনের প্রথম পর্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটে।
১৯৪৮ সালে যশোর ভাষা আন্দোলন মহিরুহ রূপ ধারণ করলেও ১৯৫২ সালে ২১ ফেব্র‚য়ারি আন্দোলন ’৪৮-এর অগ্নিঝরা গৌরবসীমাকে অতিক্রম করতে পারেনি। এ সময় ’৪৮ এর আন্দোলনের অধিকাংশ ছাত্রনেতাই তখন ছাত্রত্ব শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশ করেছেন। কেউ কেউ রাজনৈতিক কারণে কারাগারে অন্তরীণ। আবার অনেকে বিভিন্ন কারণে যশোর ত্যাগ করে অন্যত্র চলে যাওয়ায় পরবর্তী ভাষা আন্দোলনের নেতৃত্বে শূন্যতা পরিলক্ষিত হয়।
এ সময় যারা ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে নেতৃত্ব দিয়েছেন তাদের মধ্যে অ্যাডভোকেট মোশাররফ হোসেন খান, মাস্টার ঈমান আলী, অধ্যাপক আবদুল ওয়াহেদ, বিমল রায় চৌধুরী, মোহাম্মদ শরীফ হোসেন (অধ্যক্ষ), ইয়াজদান চৌধুরী, আবু বাকার খান, সৈয়দ সিদ্দিক হোসেন (অধ্যাপক), সুধীর ঘোষ, কাজী আব্দুর রউফ, কৃষ্ণলাল বিশ্বাস ও অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমানসহ যশোরের অগণিত ছাত্র ও সামাজিক-রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ।
২৪ ফেব্র‚য়ারি (১৯৫২) যশোর জেলা মুসলিম লীগের ওয়ার্কিং কমিটি এক জরুরি সভায় বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার জোর দাবি জানানো হয়। যশোর মধুসূদন কলেজের শিক্ষকবৃন্দ ২৫ ফেব্র‚য়ারি কলেজের শিক্ষক পরিষদের এক সভায় ২১ ফেব্র‚য়ারি (১৯৫২) ভাষা শহিদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে শোক প্রস্তাব গ্রহণ করেন এবং ভাষার দাবিতে কেন্দ্রের কর্মসূচির প্রতি সমর্থন জানান।
২৮ ফেব্র‚য়ারি যশোরে ভাষা শহিদদের স্মরণে পালিত হয় ‘শহিদ দিবস’। শহরে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও দোকানপাট বন্ধ থাকে। পালিত হয় নীরব হরতাল। ছাত্র-জনতা এক হয়ে ভাষার দাবিতে এবং ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে বিশাল মিছিলসহকারে সারা শহর প্রদক্ষিণ করে। সেদিনের টাউন হল ময়দানের বিশাল জনসভায় যশোরের মানুষ একত্রিত হয়ে বাংলা ভাষার দাবিতে মুখরিত করে তুলেছিল যশোর।
লেখক: শিক্ষক ও গবেষক