ইউক্রেন ‘প্রকৃত রাষ্ট্র নয়’ কেন বলেছেন পুতিন

ইউক্রেনকে কেন্দ্র করে রাশিয়া ও পশ্চিমা বিশ্বের মধ্যেকার উত্তেজনা এখন এক চরম নাটকীয় মোড় নিয়েছে। কারণ, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন সোমবার রাতে তার মোক্ষম চালটি চেলেছেন। প্রথমত পূর্ব ইউক্রেনের বিদ্রোহী-নিয়ন্ত্রিত দোনেত্স্ক এবং লুহানস্ককে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন রুশ প্রেসিডেন্ট এবং তারপর সেখানে ‘শান্তি রক্ষার জন্য’ রাশিয়ার সৈন্য পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন।

ভ্লাদিমির পুতিনের এই কৌশলী পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রকে এক অস্বস্তিকর দ্বিধায় ফেলে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র আপাতত ‘আংশিক কিছু নিষেধাজ্ঞা’ আরোপ করেছে রাশিয়ার ওপর। পাশাপাশি তুমুল আলোচনা-বিতর্ক-বিশ্লেষণের বিষয় হয়ে উঠেছে সোমবার রাতে দেওয়া ভ্লাদিমির পুতিনের ভাষণটি। এই ভাষণে তার ‘বহু দিনের চেপে রাখা ক্ষোভ, ক্রোধ, ধৈর্যচ্যুতি এবং হুমকির সুর’ বেরিয়ে এসেছে। যে কথাটি সবচেয়ে বেশি আলোড়ন তুলেছে তা হলো পুতিন বলেছেন, ইউক্রেন কোনোদিনই প্রকৃত অর্থে একটা রাষ্ট্র ছিল না। তিনি এর আগেও বলেছেন, এখন যা ইউক্রেন তা আসলে ‘প্রাচীন রুশ ভূখণ্ড’।

পুতিনের কথায়, ‘আধুনিক যুগের এই ইউক্রেন আসলে সম্পূর্ণই বলশেভিক কমিউনিস্ট রাশিয়ার সৃষ্টি। ১৯১৭ সালের বিপ্লবের পর এ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল এবং লেনিন ও তার সহযোগীরা রাশিয়ার ঐতিহাসিক ভূখণ্ডকে ভাগ করে ছিঁড়েখুঁড়ে নিয়ে সবচেয়ে খারাপভাবে এ কাজটা করেছিলেন।’ তিনি আরো বলেছেন, ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ার সময় মিখাইল গর্বাচেভের দুর্বল সরকারের কারণেই ইউক্রেন স্বাধীন হবার সুযোগ পেয়ে গিয়েছিল।

ইতিহাস কী বলে?

প্রকৃতপক্ষে রাশিয়া ও ইউক্রেনের ইতিহাস বহু শতাব্দী ধরেই এক সঙ্গে জড়িয়ে আছে এবং সেই ইতিহাস অত্যন্ত জটিল। রাশিয়া ও ইউক্রেন, উভয় দেশের প্রধান ধর্ম অর্থোডক্স খৃস্টান। তাদের ভাষা, সংস্কৃতি এবং খাদ্য এগুলো একে অন্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। আধুনিক ইউক্রেনের কিছু অংশ বহু শতাব্দী ধরে রুশ সাম্রাজ্যের অংশ ছিল। ইউক্রেনকে অনেক রুশই দেখে থাকেন তাদের জাতির ‘ছোট ভাই’ হিসেবে এবং মনে করেন ইউক্রেনীয়দের আচরণও সেরকমই হওয়া উচিত। বাস্তবতা হচ্ছে, রাশিয়ায় বলশেভিক বিপ্লবেরও অনেক আগে দেশটিতে যখন কয়েক শতাব্দী ধরে জারের শাসন চলছিল, তখন থেকেই ইউক্রেনীয়দের জাতীয়তাবাদ এবং স্বতন্ত্র পরিচয়ের রাজনীতি রাশিয়ার নানা সমস্যা তৈরি করছিল।

সেন্ট পিটার্সবুর্গে ১৯১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে যে বলশেভিক বিপ্লব হয়, তারপর ক্রিমিয়াসহ ইউক্রেনের এক বড় অংশ রাশিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বাধীন ইউক্রেন প্রজাতন্ত্র গঠনের কয়েকটি চেষ্টা করে। ১৯১৭ থেকে ১৯২০ সালের মধ্যে এক যুদ্ধবিক্ষুব্ধ এবং চরম বিশৃঙ্খল সময়ে সেই স্বাধীন ইউক্রেন গঠনের চেষ্টা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারেনি। লেনিনের নেতৃত্বাধীন সোভিয়েত সরকার স্বাধীন ইউক্রেন গঠনের চেষ্টাকে দমন করে। ইউক্রেনের বেশির ভাগ ভূখণ্ডই সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। অন্যদিকে পশ্চিম ইউক্রেনের কিছু অংশ পোল্যান্ড, চেকোশ্লোভাকিয়া আর রোমানিয়ার মধ্যে ভাগাভাগি করা হয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ হিসেবে ইউক্রেনের নাম হয় ইউক্রেনিয়ান সোভিয়েত সোশালিস্ট রিপাবলিক। বলা যায়, আজকের ইউক্রেনের মানচিত্র তৈরি হয়েছে রুশ বিপ্লব এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই।

১৯৯১ সালে জন্ম হয় স্বাধীন ইউক্রেন রাষ্ট্রের। ইউক্রেন আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করে আগস্ট মাসে, আর সে বছরের ডিসেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত এক গণভোটে সেদেশের জনগণ বিপুলভাবে এর পক্ষে রায় দেয়। পূর্ব ইউক্রেনে বহু রুশভাষী এবং মস্কোর প্রতি অনুগত লোক বাস করেন, সেখানে রাশিয়ার প্রভাবও গভীর। কিন্তু পুতিন ইউক্রেন ও রাশিয়ার যে ভ্রাতৃপ্রতিম সম্পর্কের চিত্র আঁকতে চান, বাস্তবতা আসলে সেরকম নয়।