অস্ট্রেলিয়া-বাংলাদেশ দূতালি সেতুবন্ধ

ঐতিহাসিকভাবে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার পরিচ্ছন্ন সম্পর্ক আমাদেরকে সর্বদাই উদ্বেলিত করে। ‘অস্ট্রেলিয়া ও বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর’ শিরোনামে ৩১ জানুয়ারি ২০২২ দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত বর্তমানে বাংলাদেশে নিযুক্ত অস্ট্রেলিয়ান হাইকমিশনার মি. জেরেমি ব্রুয়ার অতি সরল ও আন্তরিক ভাষায় লেখেন— ‘যখনই ক্যানবেরায় আমাদের কূটনৈতিক দপ্তর, আরজি কেসি বিল্ডিংয়ে প্রবেশ করি, তখনই তা বাংলাদেশ এবং বেঙ্গলের সঙ্গে আমাদের ঘনিষ্ঠ ইতিহাসের কথা মনে করিয়ে দেয়। অনেক পাঠক হয়তো জানেন, রিচার্ড কেসি ১৯৪৪ থেকে ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত বেঙ্গলের গভর্নর ছিলেন। তিনি অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং গভর্নর জেনারেল হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি যখন বাংলার গভর্নর ছিলেন, তখন তার সচিব ছিলেন জেমস লরেন্স এ্যালেন, যিনি ব্রিটিশ ভারতে জন্মগ্রহণকারী একজন অস্ট্রেলিয়ান এবং বাংলা ও উদু‌র্তে কথা বলতেন। ৫০ বছর আগে জে এল এ্যালেন স্বাধীন বাংলাদেশে আমাদের উদ্বোধনী কূটনৈতিক মিশনের প্রধান হয়েছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় অস্ট্রেলিয়া নীরব ছিল না এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেওয়া প্রথম দেশগুলির মধ্যে অন্যতম।’

মি. জেরেমি ব্রুয়ারকে তার সাবলীল ও দীর্ঘ ৫০ বছরে বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া সেতু বন্ধনের সর্বশেষ অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট ফ্রেম ওয়ার্ক অ্যারেঞ্জমেন্ট (টিফা) স্বাক্ষর তথ্যসহ বিস্তারিত জানানোর জন্য অনেক শুকরিয়া। দৈনিক ইত্তেফাক ও পাক্ষিক অনন্যা সম্পাদক তাসমিমা হোসেনের ২৯ জানুয়ারি ২০২২-এ ‘তোমার ভুবনে মাগো এত পাপ’ আক্ষেপের আর্টিকেলে গোপাল ভাঁড়ের একটি গল্প টেনে লেখেন ‘এদের কারণেই দেশ আজ একধাপ এগিয়ে যেতে না যেতেই দুই ধাপ পিছিয়ে যাচ্ছে...’, অস্ট্রেলিয়া-বাংলাদেশ কূটনৈতিক সম্পর্কের ব্যাপারে তা প্রযোজ্য নয়, জোর দিয়েই বলা যায়।

আমি আবেগে আপ্লুত যে, সেই ৫০ বছরের পূর্বের উত্পাদন আন্দোলনে নিজে কিছু টুকরা অংশীদার হতে পেরেছিলাম। তার কিছু তথ্য স্মৃতি অনেক জানা পাঠকদেরকে পুনঃচর্বণ করে দুনী‌র্তিহীন ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়াকে উঁচিয়ে দেওয়ার জন্য জানান দিতে চাই। আরেকটি কথা মনে পড়ল যে, মি. জেমস লরেন্স এ্যালেন গভর্নরের সচিব থাকার পূর্বে বা পরে কোনো এক সময় বৃহত্তর নোয়াখালী জেলার কন্ট্রোলার অব ফুড ছিলেন। সেই সুবাদে নোয়াখালীর প্রতি স্ত্রী সন্তানসহ তার টানের কথা ও স্মৃতি উচ্চারণ করলেন। আলোচনা সভায় জেলা, মহকুমা প্রশাসন, এমসিএ হানিফ ভাই, রাজনীতিক ও বিভিন্ন থানার সমবায়ী নেতৃবৃন্দ উপস্হিত ছিলেন। আমরা নোয়াখালী জেলা সার্কিট হাউজে সমবায় ফেডারেশনের পক্ষ থেকে খাদ্য ও কৃষি উত্পাদন নিয়ে আলোচনার এক পযা‌র্য়ে মি. এ্যালেন বললেন, ‘শুধু সুধারাম (নোয়াখালী সদর) থানায়ই যদি সঠিক ও যান্ত্রিক চাষাবাদের মাধ্যমে উচ্চ ফলনশীল বহুমুখী ফসল উত্পাদন করা যায় তা হলে সারা বাংলাদেশের এক-তৃতীয়াংশ খাদ্যচাহিদা মিটাতে পারে। আমরা ফেডারেশন থেকে তার এই লিখিত ও কথন আর্টিকেলটি ছাপিয়ে নোয়াখালী-চট্টগ্রাম-ভোলাসহ সারাদেশে বিতরণ ও উত্পাদন কাজে ব্যাপৃত রয়ে গেলাম। ফলে রামগতি তথা লক্ষ্মীপুরের সমবায়ীরা ‘সোয়াবীন জেলা লক্ষ্মীপুর’ ব্রান্ড নামে সারা দেশে বুক ফুলিয়ে জানান দিতে পারছি।

রামগতি থানা কেন্দ্রীয় সমবায় Let the Dead Serve the Living পুস্তিকায় প্রকাশিত, আয়োজিত আলেকজান্ডার স্কুল প্রাঙ্গণে সমবায় প্রদর্শনীতে কৃষি মেলায় বাংলাদেশে নিযুক্ত অস্ট্রেলিয়ান হাই-কমিশনার মি. জে এল এ্যালেন ও মিসেস এ্যালেন স্টল ঘুরে ঘুরে দেখেন। ১৯৭৩-এর ১৯-২০ জানুয়ারি। এতে এলাকাবাসী প্রচুর উত্সাহিত হয়। রামগতি ভিজিটকালে দেশের প্রথম গুচ্ছগ্রাম ‘বিশ্বগ্রাম’ স্হান পরিদর্শন করেন এবং এর আগে মি. এ্যালেন চরসীতা গ্রামে কেন্দ্রীয় সমবায়ের পরিচালক আশুতোষ মজুমদারের বাড়ির আঙিনায় সবজি চাষের বাগানে নেমে নিজ হাতে কাঁচি নিয়ে কীভাবে টমেটো গাছের গ্রাফটিং বা ছাঁটতে হয় তা হাতেকলমে দেখিয়ে ও বুঝিয়ে দিলেন। একই সঙ্গে মিসেস এ্যালেন আলু চিনাবাদাম, বাঁধাকপি, ফুলকপি, সূর্যমুখী সোয়াবিন ইত্যাদির গুণাগুণ ও চাষাবাদ সম্পর্কে মহিলা সমিতির মিনা শিবানী শিপ্রাসহ সদস্যদের বুঝালেন এবং দেখালেন। সব সময়ই তারা বাংলায়-ই কথাবার্তা বলছিলেন। প্রসঙ্গত সেকালে বৃহত্তর রামগতির হিন্দুঅধু্যষিত এলাকার স্বল্পসংখ্যক নারী ব্যতীত কোথাও কোনো সমিতি বা সাংস্কৃতিক চর্চার উদ্যোগ মুসলিম পরিবারে ছিল না। আদর্শ শিক্ষক, সংস্কৃতিমনা আশু বাবুর বড় মেয়ে মাধুরী মজুমদার দেশ স্বাধীন হলে কোলকাতা থেকে ১৯৭২ সালে গ্রামে ফিরে এলে আমরা তাকে দিয়ে আলেকজান্ডার বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় কাজকর্ম শুরু করি। প্রায় একই সময় রামদয়াল এলাকায় সুলতানা একাডেমি প্রতিষ্ঠিত হয়। গণশিক্ষা ও নারী শিক্ষা শুরু আন্দোলনের সে এক অন্য ইতিহাস, যা পরে সময় হলে লেখার আশা রাখছি।

কর্মজীবনের মাঝখানে এসেও ডর্প ‘স্বাস্থ্য গ্রাম’ কার্যক্রম বাস্তবায়ন সাফল্যে Community Engagement বিষয়ে সাউথ অস্ট্রেলিয়ান ইউনিভার্সিটি ‘চ্যান্সেলরস অ্যাওয়ার্ড-২০০৬ ডর্পকে প্রদান করেন। অনুষ্ঠানে উপস্হিত ছিলেন প্রফেসর ড. রোসেলা বেকার, প্রিন্সিপাল প্ল্যানার অব আর ডব্লিউ ভি অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েট এবং এনজেন্ডার হেলথের বাংলাদেশ কান্ট্রি প্রধান ডা. আবু জামিল ফয়সাল। বাংলাদেশে বিশেষ করে বৃহত্তর নোয়াখালীতে আমাদের অনেক কৃতকর্মের মধ্যে এটাও এক টেকসই সেতু বন্ধন নয় কি? তাও মোটা দাগে রামগতিকেই ঘিরে।

বঙ্গবন্ধু দেশে প্রত্যাবর্তনের পর সর্বপ্রথম বৃহত্তর রামগতির চর পোড়াগাছায় ২০ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২ ‘স্বেচ্ছাশ্রম উত্পাদন ও উন্নয়ন স্বপ্ন’র ডাক যেখান থেকে দিয়েছিলেন, সে স্হানের নাম আজ ‘বঙ্গবন্ধু শেখের কিল্লা’। দেশ বিদেশের পর্যটকদের জাতির পিতার সেই ঐতিহাসিক আহ্বানের স্হান পরিদর্শনের দাওয়াত জানাই। এলাকাবাসী প্রতি বছর ২০ ফেব্র‚য়ারি দিনটিকে মনের চেতনা থেকে সাদামাঠাভাবে উদ্যাপনের মাধ্যমে উন্নয়ন স্বপ্ন বাস্তবায়ন বাতিঘর সবাইকে জানান দেয়। এখানেও তাসমিমা হোসেনের একটি লেখার মোটা দাগের প্রতিপাদ্য— ‘কলস ভরা জল কিন্তু চারিপাশে তৃষ্ণার্তদেরও ভিড়’। অস্ট্রেলিয়ার বাংলাদেশের উদ্বোধনী কূটনৈতিক মিশনের প্রধান মি. এ্যালেনের সঙ্গে অর্ধশত বছর পূর্বের একটানা কয়েকদিন কর্ম এলাকায় কাটানোর স্মৃতি মনে আরো একবার গেঁথে দিলেন বর্তমান অস্ট্রেলিয়ান হাই কমিশনার মি. জেরোমি ব্রুয়ার। তার লেখায় সেতু বন্ধনে আমিও প্রশান্তি বোধ করছি ও গর্বিত।

লেখক: প্রতিষ্ঠাতা, ডর্প (উন্নয়ন ও মানবাধিকার সংগঠক)