সাত দশকে চীনের বদলে যাওয়ার কাহিনী 

মসি অসির চেয়ে শক্তিশালী। কথাটি মিথ্যে নয়। সাংবাদিক ও রাজনীতিবিদ মাও সে তুং ‘চীনা সমাজে বিভিন্ন শ্রেণির বিশ্লেষণ’ নামে একটি প্রবন্ধ লেখেন। চীনা বিপ্লবের চিন্তাধারার উত্স হচ্ছে এই প্রবন্ধ। সাম্রাজ্যবাদ ও সামন্তবাদ বিরোধী লড়াই, গৃহযুদ্ধ ইত্যাদি নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে কোটি কোটি মানুষের জীবন উৎসর্গের মাধ্যমে ১৯৪৯ সালের পয়লা অক্টোবর তাঁর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় গণপ্রজাতন্ত্রী চীন তথা নয়াচীন। এই নয়াচীন ছিল একটি দুর্বল, গরিব ও পশ্চাত্পদ কৃষিপ্রধান দেশ। সেখান থেকে এখন পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ। মাত্র সাত দশকে চীনে এই অভূতপূর্ব উন্নয়ন কীভাবে হলো? ভারী শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার মাধ্যমে উন্নয়নের সোভিয়েত মডেল চীন অনুসরণ করেনি। বরং ১৯৭৮ সালের শেষ দিক থেকে জাতীয় নেতা তেং সিয়াও পিংয়ের সংস্কার ও উন্মুক্তকরণের নীতি অনুসরণ করে চীন। এই বিশেষ বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ‘সমাজতান্ত্রিক বাজার অর্থনীতি’ই চীনকে বদলে দেয়। গত তিন দশক ধরে চীনের অর্থনীতি গড়ে ১০ শতাংশ হারে বেড়েছে।

এখানে সাতটি খাতের অগ্রগতি পর্যালোচনা করলেই বিশ্বশক্তি হিসেবে চীনের উত্থানকে সহজেই উপলদ্ধি করা যায়। এই খাতগুলি হলো— মহাকাশ গবেষণা, দ্রুতগতির রেল, সেতু, সুপারকম্পিউটার, নতুন জ্বালানি, দারিদ্র্যবিমোচন ও ক্রীড়ানৈপুণ্য। চীন গত ৭০ বছরে ১০০ কোটি মানুষকে দারিদ্র্যমুক্ত করেছে। অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি তারা মানবসম্পদের উন্নয়নে শিক্ষা ও স্বাস্হ্য খাত নতুন করে ঢেলে সাজিয়েছে। ২০০৩ সালে প্রথম মনুষ্যবাহী মহাকাশযান ‘শেনচৌ ৫’ পাঠানোর পর মহাকাশ গবেষণায় এগিয়ে গেছে চীন। বিভিন্ন চন্দ্র ও মঙ্গল অভিযান সাফল্য বয়ে আনে। বর্তমানে মহাশূন্যে চীনের তিন শতাধিক সক্রিয় কৃত্রিম উপগ্রহ রয়েছে। মহাকাশে পাঠানো হয়েছে চীনের লংমার্চ পরিবাহক রকেট। 

২০১০ সালে ৪৮৬.১ কিলোমিটার গতিতে ছুটে বিশ্বরেকর্ড গড়েছে চীনের বুলেট ট্রেন। এমনকি ইউরোপ, আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এখন ব্যবহৃত হচ্ছে চীনের নিজস্ব ট্রেন-প্রযুক্তি। বিচিত্র ও দৃষ্টিনন্দনীয় নদী, সমুদ্র, পার্বত্য সেতু ও সমুদ্রে কৃত্রিম দ্বীপ নির্মাণ বিস্ময়ের সৃষ্টি করেছে। চীনের সুপারকম্পিউটার ‘সানওয়ে থাইহু-লাইট’ অন্যতম বিশ্বসেরা। কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের ক্ষেত্রেও চীন অগ্রগামী। চীন কয়লা, তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস ও পানিবিদ্যুতের মতো প্রচলিত জ্বালানির বাইরেও সৌরশক্তি, ফটোভোল্টাইক শক্তি, বায়ুশক্তি ও জিওথার্মাল বা ভূ-তাপীয় শক্তি, সামুদ্রিক শক্তি, জৈবশক্তি, নিউক্লীয় সংযোজন ইত্যাদি নতুন জ্বালানির ক্ষেত্রে উন্নতি লাভ করছে।

মাত্র সাত দশকে চীন কীভাবে বদলে গেল, তা জানতে হলে পড়া দরকার ‘নয়াচীনের সাফল্যের মুকুটে সাতটি পালক’ গ্রন্থটি। বইটি লিখেছেন দৈনিক ইত্তেফাকের সাবেক সহকারী সম্পাদক ও চীন আন্তর্জাতিক বেতারের বাংলা বিভাগে কর্মরত আলিুমল হক ও তার সহকর্মী ছাও ইয়ান হুয়া। মাল্টিকালার এই বইটি ঢাকার মতিঝিল থেকে প্রকাশ করেছে কালার ক্রিয়েশন। প্রচ্ছদ এঁকেছেন আরিফুর রহমান।