ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার আগ্রাসন ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বিপুল কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন। রাশিয়ার আগ্রাসন যে আসন্ন, অবিরাম তার হুঁশিয়ারি প্রচার করে গেছে তার প্রশাসন। শেষ পর্যন্ত তাদের হুঁশিয়ারি সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে। তারা এটাও বলেছিলেন, আন্তর্জাতিক যে নিরাপত্তাব্যবস্হা এখন বজায় আছে, সেটা হুমকিতে। ইউক্রেনের ঘটনাপ্রবাহ প্রেসিডেন্ট বাইডেনের শাসনামলের পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে গুরুতর সংকট। কিন্তু কেন তিনি কোনো অবস্থাতেই মার্কিন সেনাদের যুদ্ধ করতে পাঠাবেন না বলে এরকম একটা রেড লাইন বা চরম সীমারেখা টেনে দিচ্ছেন? খবর বিবিসির।
জাতীয় নিরাপত্তা স্বার্থ নেই
প্রথমত, ইউক্রেন আমেরিকার ধারেকাছের কোনো দেশ নয়। এটি যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্তবর্তী কোনো দেশ নয়। আর ইউক্রেনে আমেরিকার কোনো সামরিক ঘাঁটিও নেই। ইউক্রেনের এরকম বিশাল তেলের মজুত নেই, যেখানে তাদের কোনো কৌশলগত স্বার্থ থাকতে পারে। আর ইউক্রেন যুক্তরাষ্ট্রের সেরকম বড় কোনো বাণিজ্যিক অংশীদারও নয়। কিন্তু এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টরা এমন অনেক যুদ্ধে জড়িয়েছেন, যেখানে তারা অন্য দেশের পক্ষে অনেক রক্ত এবং সম্পদ ক্ষয় করেছেন। রাশিয়ার এই হুমকি মোকাবিলায় কোনো সামরিক অভিযানের কথা তারা বলছেন না, পরিবর্তে তারা কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা জারি করে রাশিয়ার অর্থনীতি পঙ্গু করে দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন।
সামরিক হস্তক্ষেপে বিশ্বাসী নন বাইডেন
প্রেসিডেন্ট বাইডেন সামরিক হস্তক্ষেপের নীতিতে বিশ্বাসী নন। তবে বলতেই হচ্ছে, প্রেসিডেন্ট বাইডেন এরকম একটা অবস্থানে উপনীত হয়েছেন অনেক পথ ঘুরে। ১৯৯০-এর দশকে বলকান অঞ্চলে যে জাতিগত যুদ্ধ চলছিল, তখন সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপ তিনি সমর্থন করেছিলেন। আমেরিকার জন্য দুর্ভাগ্যজনক পরিণতি নিয়ে এসেছিল ইরাকের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ, ২০০৩ সালের সেই যুদ্ধেও তিনি সমর্থন দিয়েছিলেন। কিন্তু তারপর হতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি প্রয়োগের ব্যাপারে বেশ অনাগ্রহী হয়ে উঠেন। প্রেসিডেন্ট ওবামা যখন লিবিয়ায় সামরিক হস্তক্ষেপের সিদ্ধান্ত নেন, তখন তিনি এর বিরোধিতা করেছিলেন। আফগানিস্তানের যুদ্ধে জেতার জন্য সেখানে বিপুল সংখ্যায় মার্কিন সেনা পাঠানোর নীতির বিরুদ্ধেও তিনি অবস্থান নেন।
আমেরিকানরাও আর যুদ্ধে যেতে চাইছে না
সাম্প্রতিক এক জরিপে (এপি-এনওআরসির পরিচালিত) বলা হচ্ছে, ৭২ শতাংশ আমেরিকান মনে করেন, রাশিয়ার সঙ্গে ইউক্রেনের এই সংকটে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ভূমিকাই নেওয়া উচিত নয়, বা নিলেও সেটা হওয়া উচিত খুব গৌণ। মার্কিন জনগণ এখন তাদের নিজেদের পকেটের অবস্থা নিয়েই বেশি চিন্তিত। বিশেষ করে ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি নিয়েই তাদের উদ্বেগ বেশি। প্রেসিডেন্ট বাইডেনকে এটাই বেশি মাথায় রাখতে হচ্ছে, কারণ সামনে মধ্যবর্তী নির্বাচন। তবে ওয়াশিংটনে কংগ্রেসের দুই দিকের আইনপ্রণেতারাই এখন এই সংকট নিয়ে ব্যস্ত। তারা রাশিয়ার বিরুদ্ধে কঠোরতম নিষেধাজ্ঞার দাবি জানাচ্ছেন। কিন্তু একেবারে পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে সবচেয়ে কট্টরপন্থি বলে যারা পরিচিত, যেমন রিপাবলিকান সিনেটর টেড ক্রুজ, তারাও চান না আমেরিকা যুদ্ধ করতে ইউক্রেনে সৈন্য পাঠাক বা পুতিনের সঙ্গে গোলাগুলিতে জড়িয়ে পড়~ক। আক্রমণাত্মক পররাষ্ট্রনীতিতে বিশ্বাসী আরেকজন রিপাবলিকান সেনেটর মার্কো রুবিও বলেছেন, বিশ্বের দুটি পরমাণু শক্তিধর দেশের মধ্যে যুদ্ধ কারো জন্যই ভালো হবে না।
দুটি পরাশক্তির মধ্যে যুদ্ধের বিপদ
এই সংকটে এটাই আসলে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ—প্রেসিডেন্ট পুতিনের পরমাণু অস্ত্রের মজুত। প্রেসিডেন্ট বাইডেন এ কথা এরই মধ্যে খোলাখুলি বলেছেন, ইউক্রেনে রুশ আর মার্কিন সেনারা পরস্পরের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে একটি বিশ্বযুদ্ধের সূচনা করুক, সেটা তিনি চান না। এ মাসের শুরুতে এনবিসি টেলিভিশনকে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে তিনি বলেছিলেন, এখানে তো আমরা কোনো সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের মোকাবিলা করছি না, আমরা এখানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় এক সেনাবাহিনীর মোকাবিলা করছি। এটি খুবই কঠিন এক পরিস্থিতি এবং পরিস্থিতি কিন্তু যে কোনো সময় বিপজ্জনক মোড় নিতে পারে।
কোনো চুক্তির দায় নেই
ইউক্রেনের সঙ্গে আমেরিকার এমন কোনো চুক্তিও নেই যে, তাদের এরকম একটা লড়াই শুরুর ঝুঁকি নিতে হবে। ন্যাটো সামরিক চুক্তির আর্টিকেল পাঁচে বলা আছে, যে কোনো সদস্য দেশের ওপর আক্রমণ সব দেশের ওপর আক্রমণ বলে গণ্য করা হবে এবং চুক্তির কারণে প্রত্যেক দেশ আক্রান্ত দেশকে রক্ষায় অঙ্গীকারবদ্ধ। কিন্তু ইউক্রেন ন্যাটোর সদস্য নয়। তাদের বেলায় সেরকম কোনো দায় নেই।
যুক্তরাষ্ট্র কি তার অবস্হান বদলাতে পারে
প্রেসিডেন্ট পুতিন চাইছেন, পূর্ব ইউরোপের এসব দেশ থেকে ন্যাটো বেরিয়ে যাক। ইউক্রেনে এ সপ্তাহে রাশিয়ার অভিযান অবশ্যই সেই উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে। দুর্ঘটনাবশত বা ইচ্ছাকৃতভাবে তৈরি করা কোনো ঘটনায় এ যুদ্ধ আরো ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে এমন আশঙ্কা আছে। সেটা হলে পরিস্হিতি খুব চরম সংঘাতের দিকে যাবে, কারণ তখন ন্যাটো জোটকে তাদের সদস্য দেশকে প্রতিরক্ষায় আর্টিকেল পাঁচ অনুযায়ী ব্যবস্হা নিতে হবে। তখন মার্কিন বাহিনীকে যুদ্ধে জড়াতেই হবে। প্রেসিডেন্ট বাইডেন বলেন, ‘যদি প্রেসিডেন্ট পুতিন কোনো ন্যাটো দেশে আক্রমণ চালান, তখন আমাদের সেখানে জড়াতেই হবে।’