সড়ক দুর্ঘটনা আর কত হৃদয়বিদারক হতে পারে? এই তো গত ৮ ফেব্র‚য়ারি মঙ্গলবার ভোর সাড়ে ৫টার দিকে কক্সবাজারের চকরিয়ায় রাস্তা পার হওয়ার জন্য রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় সবজি বহনকারী একটি পিকআপের ধাক্কায় আপন পাঁচ ভাইয়ের (একই ঘটনায় আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিত্সারত অবস্থায় কয়েক দিন আগে আরেক ভাই মৃত্যুবরণ করেন) মৃত্যুতে দেশের সচেতন প্রত্যেকটি মানুষ হতবিহ্বল হয়ে পড়েছেন। এ দুর্ঘটনায় আরো এক ভাই ও এক বোন আহত হন। সড়ক, মহাসড়কে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ব্যক্তিরাও দুর্ঘটনার ছোবল থেকে রক্ষা পাচ্ছেন না। এই সেদিন গত ১৮ তারিখ দিবাগত রাত ১টার দিকে কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার বিশ্বরোড ফায়ার সার্ভিস স্টেশন-সংলগ্ন এলাকায় দায়িত্ব পালনকালে কুমিল্লাগামী অজ্ঞাত একটি গাড়ির ধাক্কায় পুলিশের উপপরিদর্শক জনাব জাহাঙ্গীর আলম মৃত্যুবরণ করেন।
প্রতিদিন পত্রিকার পাতায়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, টিভি চ্যানেলে যানবাহনজনিত দুর্ঘটনায় মৃত্যুর খবর ভেসে উঠছে। এসব নিয়ে সেমিনার, ওয়ার্কশপ, টকশো,পত্রিকার পাতা জুড়ে নিবন্ধ-প্রবন্ধ লেখা হচ্ছে, সংশ্লিষ্টরা নড়েচড়ে বসছে। সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে বিভিন্ন গাইডলাইন, নির্দেশাবলি জারি হচ্ছে। কিন্তু কোনো কাজই হচ্ছে না। সড়কে অঙ্গহানি, মৃত্যু যেন আমাদের ললাটে খোদাই হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে সড়কে দুর্ঘটনা ঘটবে, কিছু লোক মৃত্যুবরণ করবে। এলাকাবাসী সড়ক অবরোধ করবে। সংশ্লিষ্টরা কিছু দাবিদাওয়া মেনে সাময়িক সমাধান দেওয়ার চেষ্টা করবেন। তারপর সড়কে ঘটে যাওয়া প্রতিদিনের অপঘাতগুলো আমাদের চিন্তা ও স্মৃতি থেকে হারিয়ে যাবে। যুগ যুগ ধরে সড়কে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনা বা অপঘাতের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার এই একই চিত্র।
কেন এত দুর্ঘটনা? কিছু কারণ তো আছেই। দেশে নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা গত বছর ছিল ৫০ লাখ কিন্তু এর বাইরেও ফিটনেসবিহীন, মেয়াদোত্তীর্ণ আরো কয়েক লাখ যানবাহন সড়ক-মহাসড়ক দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। প্রায় ১ লাখ অদক্ষ চালক বাস, ট্রাক ও কাভার্ডভানসহ ভারী যানবাহন চালাচ্ছেন, হালকা যানবাহনের লাইসেন্স নিয়ে অনেকে ভারী গাড়ি চালাচ্ছেন, ফিটনেসবিহীন গাড়ি রাস্তায় নামানো হচ্ছে। প্রায় ২৪ লাখ চালকের লাইসেন্স নেই। তদুপরি লাইসেন্সপ্রাপ্ত চালকদেরও যথোপযুক্ত মান রক্ষিত হচ্ছে না, আর এরাই তো গাড়ি নিয়ে রাস্তায় নেমে দুর্ঘটনা ঘটাচ্ছেন।
যানবাহন দুর্ঘটনায় শুধু পথচারী ও যাত্রী হতাহত হচ্ছে তা নয়, যানবাহনের চালক, হেলপারও হতাহত হচ্ছে। ১৯৯৮ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত সংঘটিত দুর্ঘটনার বিশ্লেষণে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সড়ক দুর্ঘটনা ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষণ মতে, ৯০ শতাংশ দুর্ঘটনার পেছনে অতিরিক্ত গতি ও চালকের বেপরোয়া মনোভাব দায়ী। সড়ক দুর্ঘটনার জন্য যারা সরাসরি দায়ী, তারা যে দুর্ঘটনারোধে আন্তরিক ও মোটিভেটেড হয়েছেন, তার কোনো ইতিবাচক লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
যেসব কারণে আমাদের দেশে ধারাবাহিক সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে চলেছে, সেসবের সমাধান বহুল আলোচিত, কিন্তু সেগুলোর যথোপযুক্ত প্রয়োগ ঘটাতে না পারা এবং সব মহলের কার্যকর সাড়া না পাওয়ায় উদ্যোগগুলো ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। তাই বলে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকলে চলবে না। সব ধরনের বিকল্পগুলোর প্রয়োগ ঘটাতে হবে। কোনো না কোনো একটি বিকল্প অব্যর্থ হতে বাধ্য। অনেক উন্নত দেশে, যেমন—জাপান ও কোরিয়ার সড়ক-মহাসড়কেও একসময় ব্যাপক দুর্ঘটনা ঘটত কিন্তু সবার সম্মিলিত উদ্যোগ, সদিচ্ছা এবং আইনের বাধ্যবাধকতার মাধ্যমে তারা সে অবস্থার উৎতরণ ঘটিয়েছে। আমাদেরও এগুলো নিয়ে ভাবতে হবে।
সারা দেশে সড়ক, মহাসড়ক, আঞ্চলিক সড়ক বা সহজ কথায় যেসব সড়কে যানবাহন চলাচল করে, সবখানে স্থায়ী চেকপোস্ট তৈরি করতে হবে। সড়ক অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, জেলা পরিষদ ও অন্যান্য সংস্থা যারা সড়ক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত, তাদের কাছ থেকে তালিকা নিয়ে চেকপোস্টের স্থান ও সংখ্যা নির্ধারণ করতে হবে। কোনো যানবাহন যত স্বল্প দূরত্বেই যাক না কেন, তাকে অন্তত একটি চেকপোস্ট অতিক্রমের আওতায় আনতে হবে। ঐ সব চেকপোস্টে চালকের শারীরিক অবস্থা বিশেষত সে নেশাগ্রস্হ কি না, তার বয়স, তার ড্রাইভিং লাইসেন্স, গাড়ির রেজিস্ট্রেশন সনদ, ফিটনেস, রুটপারমিটসহ এটি লক্কড়ঝক্কড় ও ধারণক্ষমতার বেশি যাত্রী বহন করছে কি না—সবকিছু পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। যদি ঐ গাড়ির কোনো একটি সনদ ও শর্তের ঘাটতি থাকে, তাহলে আটক করে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। একটি গাড়ি তার চলার পথে যতগুলো চেকপোস্ট অতিক্রম করবে, প্রত্যেকটাতেই সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র প্রদর্শন করতে হবে। চেকপোস্টগুলোর কার্যক্রম ২৪ ঘণ্টা চলমান থাকতে হবে। পাঁচ, দশ, পনেরো বছর বা যতদিন সড়কে শৃঙ্খলা ফিরে না আসবে ততদিন এই ব্যবস্থা বহাল রাখতে হবে।
একটি দুর্ঘটনা ঘটবে, সবাই দু-এক দিনের জন্যে একটু নড়েচড়ে বসবে, কয়েক দিন পরে আবার সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে যাবে, এ ধরনের ক্যাজুয়াল অ্যাকশনের মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না তা বলাই বাহুল্য। যাদের সহযোগিতায় সড়ক-নৈরাজ্যে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা যেতে পারে তাদের কাছ থেকে স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। আর কত সবার কাছে ধরনা দেওয়া যায়?
তাই আমাদের One Stop Action-এ যেতে হবে। যানবাহন-সংক্রান্ত অনিয়ম রোধে চেকপোস্টগুলোকে একমাত্র ও চূড়ান্ত ফয়সালার কেন্দ্রে পরিণত করতে হবে। যানবাহনের মালিক ও বিভিন্ন পক্ষ যখন বুঝবে রাস্তায় গাড়ি বের হলেই চেকিংয়ের মুখোমুখি হতে হবে এবং সবকিছু ঠিক না থাকলে গাড়ি আটক হয়ে যাবে, তখন প্রত্যেকেই নিজ গরজে গাড়ির সবকিছু আপটুডেট রাখবে। তাদেরকে আইন পালনে বাধ্য করতে হবে। মৃত্যুফাঁদ সমূলে উৎপাটন করে সড়কের অপঘাতকে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে হবে। সড়ককে নিরাপদ রাখতে হবে, জনমানুষকে স্বস্তি দিতে হবে।
লেখক: সরকারি চাকরিজীবী