ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন দুদকের চাকরিচ্যুত শরীফ: হাইকোর্ট

দুদকের চাকরিচ্যুত উপসহকারী পরিচালক মো. শরীফ উদ্দিনের বিষয়ে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীন তদন্ত চেয়ে দায়েরকৃত রিটের ওপর হাইকোর্টে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়েছে। শুনানিতে উঠে এসেছে হাইকোর্টের একটি রায়। যে রায়ে উচ্চ আদালত বলেছে, আদালতের সুনির্দিষ্ট আদেশ ছাড়া ব্যাংক হিসাব জব্দ করে ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন দুদক কর্মকর্তা শরীফ। 

এই রায়ের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে দুদক কৌসুলি খুরশীদ আলম খান বলেছেন, আদালতের আদেশ ছাড়াই ৩৩টি ব্যাংক হিসাব জব্দ করেছিলেন শরীফ। এর মধ্যে ২৫টি ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে ওই কর্মকর্তার চিঠির প্রেক্ষিতে। বাকি ৮টি হিসাব জব্দ করা হয়েছে মৌখিক নির্দেশে। আইনানুযায়ী আদালতের আদেশ ছাড়া কোন ভাবেই কারো ব্যাংক হিসাব জব্দের সুযোগ নাই। 

তিনি বলেন, এই ৩৩টি ব্যাংক হিসাবের মধ্যে একজন ব্যক্তি হাইকোর্টে এসে রিট করেন। সেই রিটের রায়ে হাইকোর্ট বলেছে দুদকের তদন্ত কর্মকর্তা শরীফ অবৈধ, স্বেচ্ছাচারী, আইনগত কর্তৃত্ববহিভূভাবে ব্যাংক হিসাব জব্দে চিঠি দিয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। দুর্নীতি দমন কমিশন এই রায় আমলে এবং তার বিরুদ্ধে অন্যান্য অভিযোগ বিবেচনায় নিয়ে দুদক (কর্মচারী) বিধিমালার ৫৪(২) ধারা অনুযায়ী তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করেছেন। এক্ষেত্রে আইনের কোন ব্যতয় হয়নি। 

তিনি বলেন, এ ধরনের প্রতিশোধপরায়ণ কর্মকর্তা কমিশনে থাকলে আরও শরীফের সৃষ্টি হবে। সেজন্যই কমিশন কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। কারণ দুদকের মত প্রতিষ্ঠানকে তো তাদের মত করে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। 

জবাবে রিটকারী আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির বলেছেন, আদালতের আদেশ ছাড়া চিঠি দিয়ে ব্যাংক হিসাব জব্দ করে শরীফ যে ভুল করেছে তাতে কি সে লাভবান হয়েছেন বা ঘুষ গ্রহণ করেছেন, সেটা তো নয়। তদন্ত কর্মকর্তা আইনের বিধান পালন করতে গিয়ে ওই ভুল করতেই পারেন। তাই বলে চাকরিচ্যুতির সুযোগ আছে কি। হাইকোর্টের রায়ে তো তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বলে নাই। 
উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আগামী মঙ্গলবার এ বিষয়ে আদেশের জন্য দিন ধার্য রেখেছেন বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের দ্বৈত বেঞ্চ। 

আদালত দুদক ও রিটকারী কৌসুলিদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, আপনারা যে যুক্তিতর্ক, রায় ও আইনের বিধানাবলী উপস্থাপন করেছেন তা লিখিত আকারে আদালতে দাখিল করবেন। এ পর্যায়ে শিশির মনির এই রিট মামলায় শরীফকে জবাব দাখিলের নির্দেশনা দেওয়ার আবেদন জানালে হাইকোর্ট তা নাকচ করে দেয়। আদালত বলেন, আপনারা কেন, ওই চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা কেন নিজে রিট করেননি। এর কারণটা কি? 

শরীফ উদ্দিনের চাকরিচ্যুতির ঘটনায় গণমাধ্যমে প্রকাশিত অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীন তদন্তের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট করেন শিশির মনিরসহ সুপ্রিম কোর্টের দশ আইনজীবী। 

রিটের শুনানিতে শরীফউদ্দিনের নানা অনিয়ম ও অসদাচরণের অভিযোগ তুলে ধরে দুদক কৌসুলি খুরশীদ আলম খান বলেন, শরীফকে পটুয়াখালীতে বদলি করে দুদক। সেই বদলির আদেশ ঠেকাতে তিনি অন্য লোক দিয়ে হাইকোর্টে রিট করান। চট্টগ্রামে উনাকে থাকতেই হবে কেন? এখানে কিসের এত মধু? বদলির আদেশ ঠেকানোর ঘটনার পেছনে শরীফ জড়িত কিনা সেটা অনুসন্ধানের জন্য দুদককে নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। সেই অনুসন্ধান এখন চলমান। 

শিশির মনির বলেন, শরীফ তো সরল উদ্দেশ্যে ব্যাংক হিসাব জব্দে চিঠি দিয়েছেন। কোর্ট বলেছে উনি ভুল করেছেন। কিন্তু ভুলের জন্য কোন ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেনি। আর চিঠি দিয়ে ব্যাংক হিসাব জব্দের ব্যাখ্যাও উনি দুদকে দিয়েছেন। জবাবে দুদক কৌসুলি বলেন, হাইকোর্টের এই রায়ের দুই মাস পর কমিশনে গিয়ে ওই কর্মকর্তা জবাব দাখিল করেন। কোর্টের রায়ের পর তার ওই জবাব গ্রহণের কোন সুযোগ কমিশনের নাই। এছাড়া ওই মামলায় শরীফ নিজেও তার বক্তব্য তুলে ধরেছেন। সেগুলো পর্যালোচনা করেই রায় দিয়েছে হাইকোর্ট। 

এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে যাননি চাকরিচ্যুত এই কর্মকর্তা। যেখানে হাইকোর্ট তাকে ক্ষমা করে নাই, দুদক কিভাবে ক্ষমা করবে? 
আপিল বিভাগে বিচারাধীন 

আদেশ দেওয়ার সুযোগ আছে কি?

হাইকোর্ট বলেছে, দুর্নীতি দমন কমিশন (কর্মচারী) বিধিমালার ৫৪(২) বিধি অনুযায়ী শরীফকে চাকরিচ্যুত করে কমিশন। এই বিধি নিয়ে আপিল বিভাগে দুদকের একটি আপিল বিচারাধীন রয়েছে। যে বিষয়টি সর্বোচ্চ আদালতে বিচারাধীন সেক্ষেত্রে হাইকোর্ট চলমান রিট মামলার ওপর কোন আদেশ দিতে পারে? আপিল বিচারাধীন থাকাবস্থায় দুদক কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে? 

জবাবে দুদক কৌসুলি বলেন, হাইকোর্ট ৫৪(২) ধারা বাতিল করে যে রায় দিয়েছিলো তা স্থগিত করে দিয়েছে আপিল বিভাগ। ফলে ওই বিধির আওতায় দুদকের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে আইনগত কোন বাধা নাই। 

কল রেকর্ড তলবের আবেদন:

রাষ্ট্রপক্ষে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল একেএম আমিনউদ্দিন মানিক বলেন, গত ছয় মাসে শরীফ কার কার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করেছেন তার কল রেকর্ড তলব করা হোক। চাকরিবিধি লঙ্ঘন করে তার পক্ষে যেসব কর্মকর্তা মানববন্ধন করেছেন তাদেরকেও আদালতে ডাকা হোক। এছাড়া দুর্নীতির বিরুদ্ধে তদন্ত করার কারণেই তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে-বিএনপির মহাসচিবের এমন বক্তব্যের জন্যও তাকে আদালতের ডাকা উচিত। কারণ উনি বিষয়টিকে রাজনৈতিক ইস্যু বানানোর চেষ্টা করেছেন। 

অনুসন্ধানী প্রতিবেদন নিয়ে বিতর্ক:

শরীফের চাকরিচ্যুত ইস্যুতে একটি গণমাধ্যম ম্যাজাসিয়ান জার্নালিজম করেছে বলে আদালতে অভিযোগ করেছেন দুদক কৌসুলি। তিনি বলেন, এই দৈনিকের কাছাকাছি একই ধরনের জার্নালিজম করেছে ইংরেজি আরেকটি পত্রিকা। দু’টি পত্রিকা যেসব প্রতিবেদন করেছে সেখানে যেসব তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করা হয়েছে সেগুলো একপেশে। যেসব তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে সেগুলো উনারা কোথায় পেলেন? নিশ্চয়ই শরীফ সরবরাহ করেছে। 

আন্তর্জাতিক মিডিয়া যখন রিপোর্ট করে তখন চারটি দিক থেকে তথ্য-উপাত্ত যাচাই করে থাকে। এ পর্যায়ে আদালত বলেন, আমাদের দেশে তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের সিস্টেম তো সেভাবে ডেভেলপ করে নাই। 

শিশির মনির বলেন, দুদক কৌসুলি যে বক্তব্য দিলেন তাতে তো অনুসন্ধানী সাংবাদিকতাকে অস্বীকার করা হবে। দুদক কৌসুলি বলেন, কোর্টের উচিত হবে হলুদ সাংবাদিকতাকে প্রশয় না দেওয়া। একটি টিভিতে পলাতক পিকে হালদারের বক্তব্য প্রচার করা হয়েছিলো। ওই বিষয়ে হাইকোর্ট সতর্ক করে দিয়ে রায় দিয়েছে। যখন কোন সত্য খুজে পাওয়া যায় না তখন সেটা খুজে বের করার নামই অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা। কিন্তু দুটি পত্রিকা যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সবই একতরফা ও হলুদ সাংবাদিকতার নামান্তর। এগুলো নিরুৎসাহিত করা উচিত। আর দুদক বিধির বাইরে গিয়ে তো তাকে চাকরিচ্যুত করে নাই। 

শরীফকে রক্ষা করতেই এই রিট:

দুদক কৌসুলি বলেন, রিট আবেদনটি দায়ের করা হয়েছে শরীফকে রক্ষা করতেই। রিটকারীরা দুদক কর্মচারী বিধিমালার ব্যাখ্যা যেভাবে দিচ্ছেন তাতে সেটাই প্রমাণিত হয়। আর চাকরিচ্যুত হয়েছেন শরীফ। এতে এই আইনজীবীরা কিভাবে সংক্ষুদ্ধ হয়ে রিট করেন? সংক্ষুদ্ধ হবেন তো যিনি চাকরিচ্যুত হয়েছেন তিনি।