নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ 

করোনা মহামারি ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ-পরিস্থিতিতে ঊর্ধ্বমুখী নিত্যপণ্যের বাজার। চাল-ডাল-তেল-চিনি— সবকিছুর দাম এখন আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় বেশি। এতে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে মধ্যবিত্তদের। এ অবস্থায় সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য কিনতে টিসিবির ট্রাকে নিম্নবিত্তের পাশাপাশি মধ্যবিত্তরাও ভিড় জমাচ্ছেন।

করোনা মহামারির অভিঘাতে বিপর্যস্ত দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষ এমনিতেই প্রবল আর্থিক অভাব-অনটনের মধ্যে রয়েছেন। সরকারি হিসাবে মূল্যস্ফীতির হার এখন ৫.৮ শতাংশ। কিন্তু নিত্যপণ্যের বেপরোয়া মূল্যবৃদ্ধি বাস্তবে মূল্যস্ফীতির এই হিসাবের তুলনায় বহুগুণ বেশি। সরকারি সংস্থা টিসিবির বাজারমূল্যেই দেখা যায়, ২০২০ সালের তুলনায় চালের দাম গড়ে ৩১ শতাংশ, ময়দা ৩৩, সয়াবিন তেল ৪৫, চিনি ৫০ ও মসুর ডাল ৩০ শতাংশ বেড়েছে। রান্নার গ্যাসের দাম বেড়ে গেছে, বাড়তে চলছে পানি ও বিদ্যুতের দাম। একদিকে নিশ্চিত দাম বাড়া, অন্যদিকে অনিশ্চিত আয়ে সাধারণ মানুষের জীবন এখন দিশেহারা। কঠিন এই বাস্তবতায় মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত কী করে টিকবে, এই কঠিন প্রশ্নের উত্তর আবারও খুঁজতে হবে। কোভিডের কারণে চাকরিচু্যতি নিয়মিত বেতন-ভাতা না পাওয়া—এসব সমস্যা তো রয়েছেই। তাদের বেশির ভাগই মধ্যবিত্ত। তাহলে সংকট উত্তরণের কী উপায়? কোভিড-১৯ সংক্রমণজনিত এ সংকটের সময়ে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সার্বিক সুরক্ষা ও জীবন-জীবিকা নির্বাহের জন্য উন্নয়ন কার্যক্রম এবং জনবান্ধব পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।

জীবনযুদ্ধের এক কঠিন সময় পার করছি আমরা। কর্মহীন হয়ে পড়েছেন অনেকেই। এই সংকট শুধু বাংলাদেশেরই নয়, গোটা বিশ্বেরই। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা আইএলওর সর্বশেষ রিপোর্টে যে তথ্য পাওয়া যায়, তাতে তো সংকট আরো বাড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের মূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। অভাব আর দারিদ্রে্যর কশাঘাতে আজকের জনজীবন দুঃখ ও হাহাকারে পূর্ণ। চাল, ডাল, মাছ, মাংস, তেল, তরিতরকারি, ফলমূল, চিনি, লবণ, গম, আটা, রুটি, বিস্কুট ইত্যাদি দ্রব্যের মূল্য আগের তুলনায় কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে খেটে খাওয়া মেহনতি মানুষ দিশেহারা।

সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য কিনতে মানুষ ভিড় করেন ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) ট্রাকের সামনে। কিন্তু সেখানেও কি শান্িত আছে? সেখানেও বিড়ম্বনা। ভিড় বাড়ায় পণ্য কিনতে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। আবার পণ্যের সরবরাহের তুলনায় চাহিদা বেশি হওয়ায় মুহূর্তেই খালি হয়ে যায় টিসিবির পণ্যবোঝাই ট্রাকগুলো। ফলে অনেককে ফিরতে হচ্ছে খালি হাতে। তুলনামূলকভাবে টিসিবির ট্রাকে সাশ্রয়ী দামে পণ্য কিনতে পারায় সেখানেও ভিড় করেছন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির লোকজন। এদিকে টিসিবির ডিলাররা সরবরাহ কম থাকার কারণে সঠিকভাবে লাইনে দাঁড়ানো সবার কাছে পণ্য বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না বলে দাবি করেন। ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় প্রতিদিন টিসিবির প্রায় ১৭০টি ট্রাক পণ্য সরবরাহ করে থাকে। টিসিবির ট্রাকের সামনে কম দামে নিত্যপণ্য কিনতে আসত শুধু নিম্ন আয়ের মানুষেরা। তারা পেশায় কেউ ছিলেন দিনমজুর, কেউ রিকশা বা গাড়িচালক, কেউ গৃহকর্মী। কিন্তু এখন সেই লাইনে পণ্য কিনতে ভিড় করছেন মধ্যবিত্তরাও।

মানুষের জীবন-জীবিকার সংকট এখন প্রকট। বেঁচে থাকার সংগ্রাম, অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সংগ্রাম এখন মুখ্য। করোনাকালে উদ্ভূত জটিল এবং অভূতপূর্ব এই পরিস্থিতিতে মহাসংকটে পড়েছে মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের মূল্যতালিকা টাঙানো এবং নির্ধারিত মূল্যে পণ্য বিক্রয় করা হচ্ছে কি না, সেটি পর্যবেক্ষণের জন্য সব বাজারে দ্রব্যমূল্য মনিটরিং কমিটি গঠনের ব্যবস্থা করতে হবে এবং বাজার মনিটরিং করা খুব জরুরি। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের মূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ করে দেশের সাধারণ মানুষের আরো একটু সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা প্রদানে যথেষ্ট ভূমিকা রাখতে হবে সরকারকে।

করোনায় সরকারি প্রণোদনার সুফল সাধারণ মানুষ খুব একটা পায়নি। আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে সাধারণ মানুষের যখন নাভিশ্বাস, তখন নিত্যপণ্যের বাজারেও যেন আগুন লেগেছে। সরকারের উচিত আগে বাজারের আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা। সাধারণ মানুষের কথা চিন্তা করা। মধ্য মেয়াদে খাদ্য সরবরাহ ও দামকে প্রভাবিত করে এমন কিছু পদ্ধতিগত শক্তির বিপরীতে নীতিনির্ধারকরা সহজেই মজুত এবং অনুমানের সমস্যার সমাধান করতে পারেন। তবে এজন্য সরকারের পক্ষ থেকে ঐ সমস্যা মেনে নিয়ে তা চিহ্নিত ও সমাধান করতে উদ্যোগী হওয়া চাই।

বাংলাদেশ চাল উত্পাদনে বিশ্বে চতুর্থ, যা বিশ্বের মোট উত্পাদনের ৭ শতাংশ। দেশের জনগণের দৈনিক ক্যালরির ৭০ শতাংশের বেশি আসে এই চাল থেকে। কয়েক দশকে চাল উত্পাদন তিন গুণের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। তার পরও চালের দাম বাড়তি। খাদ্যপণ্যের, বিশেষ করে প্রধান খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যস্ফীতি দেশের স্বল্প ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে। চালের মূল্যস্ফীতিকে তারা ভয় পান।

টিসিবির মাধ্যমে দেশের ১ কোটি মানুষকে ন্যাঘ্যমূল্যে নিত্যপণ্য দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না, টিসিবির ট্রাক কেবল জেলা ও উপজেলা শহরকেন্দ্রিক হওয়ায় গ্রামের লোকজন এর বাইরে থেকে যাচ্ছে। ফলে দরিদ্র ও মধ্যবিত্তের বড় অংশই সরকারের এই সেবার বাইরে থেকে যাচ্ছে। অন্যদিকে, অল্পসংখ্যক ট্রাক এবং সারা দেশে চাহিদার তুলনায় অল্পসংখ্যক স্থানে এই সেবা দিয়ে কোনোভাবেই সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের চাহিদা মেটানো সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে বিশেষত করোনা মহামারির কালে দেশে দারিদ্র্য ও বেকারত্ব বৃদ্ধির হিসাব আমলে নেওয়া দরকার। জিডিপি প্রবৃদ্ধি কিংবা মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির যেসব পরিসংখ্যান সামনে আসছে তার সঙ্গে দারিদ্র্য ও নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ এই পরিস্থিতি সামাল দিতে বিশেষ মনোযোগের পাশাপাশি এর রাজনৈতিক অভিঘাত সম্পর্কেও সরকারের বিশেষভাবে সতর্ক থাকা দরকার।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও রিসার্চ ফেলো, বিএনএনআরসি