বিশ্বে নগরকৃষির বর্তমান প্রেক্ষিত

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্হার মতে, ২০৫০ সালের মধ্যে পৃথিবীর ৬৭ শতাংশ লোক চলে আসবে নগর এলাকায়। তাই তারা নগরকৃষিকেই নিয়েই ভাবছেন বেশি। চীনের সাংহাইয়ে সানকিয়াও আরবান ফার্মিংয়ের কথাই ধরা যাক। যেখানে ১০০ হেক্টর জমির ওপর তৈরি হচ্ছে আধুনিক কৃষিনগরী। আমাদের দেশেও নগরকৃষিতে ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে।

আধুনিক নগরকৃষির জন্য দরকার হবে সুস্পষ্ট নগরকৃষির পরিকল্পনা। নগরকৃষির সম্প্রসারণ হবে ঊর্ধ্বমুখী। তবে বহুমুখী হওয়ারও সুযোগ রয়েছে। যেমন, ব্যালকনি, বারান্দায় এবং আশপাশের খোলা জায়গায়। তবে ছাদকৃষি অন্যতম। দেশেই সুউচ্চ বিল্ডিংয়ের ভেতর নিয়ন্ত্রিত আলো-বাতাসে চাষ হবার সুযোগ রয়েছে সতেজ ফসলের। যেমন, নেদারল্যান্ডসে টেলিকমিউনিকেশন্স প্রতিষ্ঠান ফিলিপসের বাতিল করে দেওয়া ছয়তলাবিশিষ্ট বিশাল ভবনটি হয়ে উঠেছে ইউরোপের সবচেয়ে বড় নগরকৃষির অন্যতম ক্ষেত্র। জাপানে নগরে বসবাসরত ২৫ ভাগ পরিবার কৃষির সঙ্গে সম্পৃক্ত। টোকিও শহরে প্রায় ৭ লাখ নাগরিকের সবজি আসে নগরকৃষি থেকে। নিউ ইয়র্কে প্রায় ১০০ একর জমি ব্যবহূত হচ্ছে নগরকৃষিতে। কেনিয়ার নাইরোবিতে খাদ্য অপ্রতুলতার জন্য পুরোদমে চলছে নগরকৃষির ব্যাপক কার্যক্রম।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্হার প্রতিবেদন অনুযায়ী সারা পৃথিবীতে ৮০ কোটি লোক নগরকৃষির সঙ্গে সম্পৃক্ত। যারা মোট উত্পাদিত খাদ্যের ১৫-২০ ভাগ উত্পাদন করে। নেদারল্যান্ডস নগরকৃষিতে সমৃদ্ধ বলেই ছোট্ট দেশ হয়েও নিজেদের চাহিদা পূরণ করে সারা পৃথিবীতে সম্প্রসারণ করতে পেরেছে খাদ্যপণ্যের বাণিজ্য। হংকংয়ে প্রায় ১ হাজার ৪০০ জন নগরকৃষির সঙ্গে যুক্ত। এছাড়া হংকংয়ে ‘রুফটপ রিপাবলিক’ নামে একটা গ্রুপ তৈরি হয়েছে, যারা পরিচালনা করছে ৩৩টি খামার। এটিই বিশ্বের জন্য অনন্য উদাহরণ।

নিরাপদ, সতেজ ও পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবারের অন্যতম জোগানদাতা হয়ে উঠতে পারে নগরকৃষি। নগরীর দাবদাহ বা উষ্ণতা কমানোর অন্যতম উপায়ও হতে পারে নগরকৃষি। নগরকৃষি বলতে শহুরে বা শহুরে এলাকার আশপাশে বাড়ির ছাদে, বারান্দায়, ব্যালকনিতে ও বিল্ডিংয়ের নিচে আশপাশে খোলা জায়গায় শাকসবজি ও ফলমূলের চাষাবাদ করাসহ কবুতর, পাখিপালন, পশুপালন, খাঁচায় বা গর্তে বা ড্রামে মাছ চাষ, মৌচাষ ও মাসরুম চাষকে বোঝায়। তবে ছাদকৃষিকেই নগরকৃষির অন্যতম ধারক বলা হয়। এটির বাণিজ্যিক সম্ভাবনা রয়েছে। পারিবারিক পুষ্টি চাহিদা পূরণ করে অতিরিক্ত আয়ের উত্স হতে পারে ছাদবাগান। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে সবুজ নগরায়ণের গুরুত্ব বেড়ে গেছে অনেকখানি। নগরবাসীকে তাজা উত্পাদনের উত্স, উন্নত খাদ্য এবং গুরুত্বপূর্ণ পরিবারের বাজেট সঞ্চয় প্রদান করতে পারে এ নগরকৃষি। সবুজ ছাদ ভবনগুলির শব্দদূষণ কমাতে সাহাঘ্য করে। পশ্চাদ্গামী এবং অগ্রবর্তী সংযোগের মাধ্যমে কর্মসংস্হান এবং অর্থনৈতিক সুবিধা তৈরি করে দিতে পারে। নগরকৃষিকে কেন্দ্র করে শহুরে নারী উদ্যোক্তা সৃষ্টির যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।

২০১৫ সালে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, কৃষি মন্ত্রণালয় ও জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্হা যৌথ উদ্যোগে ‘খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তার উন্নতিতে শহুরে উদ্যানতাত্ত্বিক ফসলের উত্পাদন বৃদ্ধি’ শীর্ষক প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। প্রকল্পটির লক্ষ্য ছিল তাজা পুষ্টিকর শাকসবজি ও ফলের উত্পাদন বৃদ্ধির জন্য এবং পরিবেশের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলার জন্য শহুরে এলাকায় ছাদে বাগান স্হাপন, সম্প্রসারণ ও প্রচার করা। উক্ত প্রকল্পের একটি সমীক্ষায় দেখা যায়, ঢাকা ও চট্টগ্রামে শহর এলাকায় ছাদবাগানে প্রায় ২৫ রকমের সবজি ও ২০ রকমের ফলসহ বহু প্রজাতির ফুল ও ঔষধি গাছ লাগিয়ে থাকেন। শহরে বসবাসকারী এবং কর্মরত মানুষের কাছে সবুজ স্হানের মূল্য ক্রমবর্ধমানভাবে স্বীকৃত হচ্ছে। নিরাপদ খাদ্য উত্পাদনের পাশাপশি সবুজ নগরায়ণ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলার অন্যতম একটি কৌশল হতে পারে।

একটি পরিসংখ্যান বলছে, ঢাকার আশপাশে বাণিজ্যিক ও পতিত এসব প্লটের সংখ্যা ৭ লাখের মতো। আরেক হিসাবে দেখা যায়, সারা দেশে এমন বিক্রীত বাণিজ্যিক আবাসিক প্লটের সংখ্যা আরো ১০ লাখের ওপর। যেগুলো বিক্রির আগমুহূর্তেও কৃষিজমি ছিল। এখন ছোট খণ্ডের প্রাচীরে ঘেরা অকৃষিজমিতে পরিণত হয়েছে। সারা দেশে এখন পতিত আবাসিক প্লট রয়েছে প্রায় ১৭ লাখ। এই ১৭ লাখ প্লটের আনুমানিক আয়তন কমপক্ষে ৫ লাখ বিঘা জমি। মিডিয়া ব্যক্তিত্ব শাইখ সিরাজের একটি প্রবন্ধে উপরিউক্ত তথ্যসমূহ উঠে এসেছে। কন্ট্রাক্ট ফার্মিংয়ের মাধ্যমে এসব খালি পড়ে থাকা প্লটে সাময়িকভাবে চাষাবাদ করা গেলে শহুরের অলিতে-গলিতে নিরাপদ ও সতেজ সবজির সরবরাহ বাড়বে। তাতে হয়তো দামও কমবে।

নগরকৃষির সম্ভাবনা যেমন রয়েছে, তেমনি বাস্তবায়নে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জও আছে। আধুনিক নগরকৃষি গড়ে তুলতে সুষ্ঠু নগর পরিকল্পনার অভাব, পৃষ্ঠপোষকতার ঘাটতি, নগরকৃষি সম্পর্কে ধারণার অপ্রতুলতা, অত্যধিক উষ্ণতা ও অতিবৃষ্টির কারণে ছাদবাগানের ফসল নষ্ট হওয়া, অতি উচ্চ ভবনে ছাদকৃষি করতে বৈজ্ঞানিক ধারণার অভাব, ফ্ল্যাটবাড়িতে ছাদবাগান করতে অংশীদারিত্বের জটিলতা বা অনেকের অনাগ্রহ, জৈবপদ্ধতিতে রোগবালই দমন, সেচ ব্যবস্হাপনা, বৃষ্টির পানি ধারণ করার জুতসই প্রযুক্তির অভাব এবং অতিরিক্ত উত্পাদনের ভ্যালু এডিশন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিপণনের সীমাবদ্ধতাগুলি দূর করতে হবে। আশার কথা, এসব বিষয়ে সরকারি সহায়তায় বাংলাদেশ কৃষিগবেষণা ইনস্টিটিউট ও শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয় কাজ করে যাচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মেট্রোপলিটন কৃষি বিভাগও এ বিষয়ে নিরসলভাবে কাজ করে যাচ্ছে। তবে তাদের দক্ষতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

লেখক: সিনিয়র বিজ্ঞানী, বাংলাদেশ কৃষি
গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি)। সাবেক কনসালটেন্ট, এফএও, জাতিসংঘ