‘একবারও মনে হয়নি আমরা যুদ্ধে জিততে পারব না’

‘মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। এপ্রিলের শেষ দিকে খালাতো ভাই মমতাজকে নিয়ে বাড়ির কাউকে কিছু না বলে ভোররাতে যুদ্ধে যাওয়ার জন্য রওনা দিলাম। কুমিল্লা হয়ে আগরতলায় পৌঁছলাম। সেখানে আমাদের ট্রেনিং শুরু হলো। যেহেতু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ প্রলম্বিত হচ্ছে, তাই বেশি অফিসারের প্রয়োজন হলো। ট্রেনিংয়ের এক পর্যায়ে জুন মাসের মাঝামাঝি উচ্চতর ট্রেনিংয়ের জন্য আমি নির্বাচিত হলাম। পরে ট্রেনিং শেষ করে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিই।’

মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণের কথা বলতে গিয়ে ইত্তেফাককে এমনটাই বললেন মেজর জেনারেল জামিল উদ্দিন আহসান (জামিল ডি আহসান) বীরপ্রতীক। অসহযোগ আন্দোলনে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন। প্রশিক্ষণ শেষে তিনি নিয়মিত মুক্তিবাহিনীর ৩ নম্বর সেক্টরের ১১ নম্বর ইস্ট বেঙ্গলের অধীনে যুদ্ধ করেন। হবিগঞ্জের চুনারুঘাট চা-বাগানের যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন তিনি। এরপর ২ নম্বর সেক্টরে তাকে যোগ দেওয়ার আদেশ দিয়ে চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গলের চার্লি কোম্পানির কমান্ডার হিসেবে শালদা নদী যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়। জামিল উদ্দিন আহসান অংশ নিয়েছিলেন শালদা নদী রণাঙ্গনের সর্বশেষ ১৫ নভেম্বরের বিখ্যাত যুদ্ধে।

শালদা নদী যুদ্ধ কেন এত বিখ্যাত? জানতে চাইলে এই বীর মুক্তিযোদ্ধা বলেন, ‘শালদা নদী এমন একটি নদী যেটি ভারত থেকে উত্পন্ন হয়ে বাংলাদেশের ভেতরে এসেছে। শালদা নদী স্টেশনটা ছিল ভারত সীমান্তবর্তী, সেখানে ছিল পাকিস্তানি বাহিনীর ৩০ পাঞ্জাব রেজিমেন্ট। আমরা ছিলাম তাদের সম্মুখে। প্রতিদিন গোলাগুলি হয়। ওরা নিয়মিত আর্টিলারি ও মর্টার ফায়ার করত। আমরাও করতাম। আমি যাওয়ার আগে পাকিস্তানিরা শালদা নদী ও মন্দভাগের রেলস্টেশন ধরে একবার দখল করে নিয়েছিল। তারপর আমরা ওটা আক্রমণ করে পালটা দখল করে নিয়েছিলাম। আমি যাওয়ার আগে ঐ যুদ্ধে ওরা বিমান হামলাও করেছিল। মন্দভাগ ও শালদা নদী  গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার আরেকটা কারণ হলো এই রেললাইন ধরে ঢাকা চট্টগ্রাম যাওয়া লাগত। এটি ছিল তাদের লাইফ লাইনের মতো। আগস্টের শেষের দিক থেকে রেল স্টেশন যে আমাদের দখলে এলো কেবল একবার ছাড়া তা আমাদের কখনোই আর হাতছাড়া হয়নি।

‘আমাদের অবস্থান ছিল তখন নদীর উত্তর পাশে। দক্ষিণ পাশে ছিল পাকিস্তানি বাহিনীর অবস্থান। মাঝেমধ্যেই আমরা তাদের ভেতরে গিয়ে অ্যামবুশ রেইড পরিচালনা করতাম। আমার বাঁ পাশে ছিলেন আমার খালাতো ভাই মমতাজ। ডান দিকে ছিলেন হাশমি, তার ডান দিকে ছিল ফজলু। আমরা চার জনই ছিলাম কোর্সমেট। আমাদের আরো উত্তরে ছিল নাইন বেঙ্গল। যারা কসবা মনতলায় যুদ্ধ করেছে। এভাবেই আমরা বাঁয়ের থেকে নিয়ে ডানের দিকে ডিফেন্সের মতো ছিলাম। আমি আসার এক দিন পরেই সিদ্ধান্ত হলো, আমরা আক্রমণ করব। তবে প্রথম আক্রমণ হলো ১৪ নভেম্বর। এর মধ্যে আমার নেতৃত্বে ছোটখাটো কিছু অপারেশন হয়েছে।’

এই মুক্তিযোদ্ধা বলেন, ‘পুরো যুদ্ধের সময় একবার মনে হয়নি আমরা যুদ্ধে জিততে পারব না। তখন রোজার সময়। শালদা নদী স্টেশন পাকিস্তানিদের দখলে। সামনে একটি মেশিনগান বসানো ছিল, ওটা ছিল ওদের সর্বশেষ পজিশন। ১৪ নভেম্বরে আমার কোম্পানির পরিকল্পনা ছিল পাকিস্তানিদের সামনের দিকে যাব। ওদের বাংকারের সামনে রেইড করব। সকালের মধ্যেই ফিরে আসব। আমাদের বাঁ পাশে ছিল নায়েব সুবেদার বেলায়েতের ৮ নম্বর প্লাটুন, মাঝখানে ছিল মঙ্গল মিয়ার ৭ নম্বর প্লাটুন। এই প্লাটুনের কোম্পানি কমান্ডার ছিলাম আমি। ডান পাশে ছিল নায়েব সুবেদার শহীদের ৯ নম্বর প্লাটুন। সামান্য সেহরি খেয়ে গভীর রাতে আমরা বেরিয়েছি। দুই ব্যাটেলিয়নের মাঝে অনেক বড় ধানখেত, বিস্তীর্ণ খোলা জায়গা। চারপাশে গ্রামগুলোও তখন পরিত্যক্ত। আমরা একটা গ্রামের মধ্যে যখন ঢুকে গেছি তখন ধানখেতে শহীদের ৯ নম্বর প্লাটুন ছিল। কিন্তু পাকিস্তানি বাহিনী টের পেয়ে ফায়ার শুরু করল। আমরাও পালটা ফায়ার শুরু করলাম। এদিকে সুবেদার শহীদ খোলা মাঠের মধ্যে, তবে ওর সঙ্গে সবার ওয়্যারলেসে কথা হচ্ছে। তখন শহীদ বলল, আমি তো এগোতে পারছি না। তখন সিদ্ধান্ত নিলাম আমরা পিছু হটব। এরই মধ্যে ওরা আর্টিলারি ফায়ার শুরু করল। একপর্যায়ে তারা এয়ার বার্স্ট মারা শুরু করল। একই সঙ্গে তারা ইলুমিনিটিং বোমা মারতে শুরু করল। তখন আমরা বেকায়দায় পড়ে পিছিয়ে এলাম।

‘এটা ১৫ নভেম্বর সকাল হবে। আমরা পেছনে এলেও বাঁ দিকে নায়েব সুবেদার বেলায়েত ভালো অবস্থানে ছিল। তখন বেলায়েত ওয়্যারলেসে বললেন—স্যার আমরা খুব ভালো পজিশনে আছি। আপনি যদি আমাকে অনুমতি দেন তাহলে আমি যুদ্ধ চলমান রাখি। আমি ওয়্যারলেসে স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি সিও বললেন, অসুবিধে নেই। ফিরে এসো, প্রয়োজনে আমরা আবার অপারেশন করব। মন খারাপ করার কিছু নেই। কিন্তু বেলায়েত বললেন, না স্যার, আপনি অনুমতি দেন আমি যুদ্ধ চালিয়ে যাই। তখন কমান্ডার তাকে অনুমতি দিলেন।

‘আমরা তখন কোম্পানি হেডকোয়ার্টার্সে চলে এসেছি। সুবেদার বেলায়েত যুদ্ধ করছেন তখনো। কমান্ডারের নির্দেশে পরে আমি তার সঙ্গে যোগ দিলাম। রিকোয়েললেস রাইফেল নিয়ে আমরা তার পেছন থেকে পাকিস্তানিদের ওপর ফায়ার করতে লাগলাম। আমাদের মর্টার ইউনিটও ফায়ার দিতে লাগল। একই সঙ্গে চলল আর্টিলারি ফায়ার। তখন পাকিস্তানিদের পক্ষে অবস্থানে টিকে থাকা ব্যাপক মুশকিল হয়ে গেল। ওরা তখন বিমান হামলার জন্য বারবার ওয়্যারলেসে সাহাঘ্য চাইছিল কিন্তু বিমান সাহাঘ্য আর আসেনি। আমরা স্পষ্ট দেখছি, স্টেশনের বাঁধ ধরে ওরা পালিয়ে যাচ্ছে। বহু সৈন্য আহত হয়েছিল যাদেরকে বাকিরা টেনে নিয়ে গেল। ওখানে তাদের গোটা কোম্পানিই তখন ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। আমরা তখন বাংকারে বাংকারে চার্জ করে দখল করলাম। পাকিস্তানিদের দু-তিনটি মৃতদেহ পেলাম। ওখান থেকে আমরা বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ, রাইফেল, রান্না করা কিছু খাবারও পেলাম। যা ওরা খেয়ে যেতে পারেনি।

‘দুপুর ২-৩টার মধ্যে আমরা সবকিছু দখল করে ফেললাম। এর আগে এলএমজি চালনারত অবস্থাতেই নায়েক সুবেদার সিরাজ শহিদ হয়েছিলেন। সারা রাত জেগে ছিলাম, সকালে একজন ওয়্যারলেস অপারেটর, আরেক জন রানারকে নিয়ে নায়েব সুবেদার বেলায়েত রেকি করার জন্য নয়নপুর বাজারের থেকে একটু সামনের দিকে গেলেন। তখন সকাল ১০টা হবে আনুমানিক। দূরে তখন পাকিস্তানি বাহিনী। তারা সম্ভবত বেলায়েতকে দেখতে পেয়েছিল। তারা দূর থেকেই মেশিনগান দিয়ে ফায়ার করে। গুলি তার বুকে এসে লাগে। তিনি পড়ে যান। আমরা একটি দরজার পাল্লা খুলে তার ওপর উঠিয়ে ব্যাটেলিয়ন হেডকোয়ার্টার্সে পাঠিয়ে দিলাম। কিন্তু ততক্ষণে তিনি শহিদ হয়েছেন। তাকে দাফন করা হয় কোল্লাপাথর শহিদ সমাধিস্হলে।’ এই মুক্তিযোদ্ধা বলেন, ‘এই অপারেশনের পর আমাদের ইউনিটকে চট্টগ্রামের বেলুনিয়া পাঠানো হলো। সেখানেও কয়েক দফা যুদ্ধ হয়েছে। ১৫ ডিসেম্বর আমরা হাটহাজারীর নাজিরহাটে অপারেশন চালালাম। তখন পাকিস্তানি বাহিনী পিছু হটতে শুরু করেছে। ১৬ ডিসেম্বর আমরা ঐ এলাকা দখল করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থান নিলাম। সেখানে থেকে ৩০ ডিসেম্বর ঢাকায় ফিরে বুয়েটের শিক্ষক কোয়ার্টারে ভাইয়ের বাসায় গেলাম। সেখানে মা, বোনসহ সবার দেখা পেলাম।’ ২০০৬ সালে অবসর নেন তিনি। তার আগেই তাকে লিবিয়ায় রাষ্ট্রদূত করা হয়। তিনি ২০০৭ সালের মার্চে ফিরে আসেন। সেই থেকে অবসর জীবন কাটাচ্ছেন এই বীর মুক্তিযোদ্ধা।