বঙ্গবন্ধুর উন্নয়ন দর্শন ছিল বৈষম্যহীন সমতাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা। জাতির পিতার অসমাপ্ত স্বপ্নকে বাস্তবে পরিণত করে ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও বৈষম্যহীন সমতাভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণের লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাম্প্রতিক সময়ে সর্বসাধারণের জন্য যে পেনশন-ব্যবস্হা প্রচলনের উদ্যোগ নিয়েছেন তা প্রশংসনীয় উদ্যোগ। এটি দেশের সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে। বৈষম্যহীন কল্যাণকর রাষ্ট্রগঠন ছিল মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম অঙ্গীকার। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর এ মাহেন্দ্রক্ষণে সর্বসাধারণের জন্য পেনশন স্কিমের উদ্যোগ সরকারের দূরদর্শী চিন্তার একটি সফল প্রতিফলন।
এ কথা ঠিক যে, বর্তমানে মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি, প্রবৃদ্ধির অগ্রগতি, রিজার্ভসহ অর্থনৈতিক সব ক্ষেত্রে দৃশ্যমান ধারাবাহিক অগ্রগতি ও উন্নয়নের সুফল সর্বজনের কাছে পৌঁছে দিতে এবং ব্যবধান কমিয়ে আনতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা বৃদ্ধি ও সম্প্রসারণ অত্যন্ত গুরুত্ববহ। আর এক্ষেত্রে সব রকম বেসরকারি খাতকে সর্বসাধারণের পেনশনের আওতায় নিয়ে আসার কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রাসঙ্গিকভাবে আমরা জানি, বেসরকারি বিমাসহ বেশকিছু কর্মসূচি বা কার্যক্রম বেসরকারি পর্যায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। পাশাপাশি সরকারের উদ্যোগে চালু রয়েছে বিভিন্ন ধরনের সামাজিক নিরাপত্তাবান্ধব কর্মসূচি। বিধিবদ্ধ পেনশন-ব্যবস্হাসহ যে ভাতাগুলো চালু রয়েছে, যেমন : মাতৃত্বকালীন ভাতা, বয়স্ক ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, মুক্তিযোদ্ধা ভাতা, প্রাইমারি-সেকেন্ডারি স্কলারশিপ ভাতা, দরিদ্রদের কর্মসংস্হানের জন্য ভাতা বা অনুদান, বিধবা বা স্বামী পরিত্যক্তদের জন্য ভাতাসহ নানাবিধ কার্যক্রম। এছাড়া সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীনস্হ কর্মসূচি তো রয়েছেই। তবে এসব কর্মসূচির কার্যকর ও সফল বাস্তবায়নই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। যদিও সরকার এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে নানাভাবে।
আমরা দেখেছি বিগত বছরগুলোতে দারিদ্রে্যর হার হ্রাস আশাব্যাঞ্জক হয়েছে, যা নীতিনির্ধারকদের কাছে স্বস্তিদায়ক হয়েছিল। কিন্তু করোনা পরিস্হিতির প্রভাবে আবার অতি দারিদ্র্য এবং সার্বিকভাবে দারিদ্রে্যর হার বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই এখন আবার চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে চরম দারিদ্র্য তথা সার্বিক দারিদ্রে্যর হার যাতে পুনরায় বৃদ্ধি না পায় তা যথার্থভাবে মোকাবিলা করা। আর এক্ষেত্রে নতুন নতুন উদ্যোগ ও কর্মসূচি গ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সুতরাং সংগত কারণেই সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সেবাপ্রাপ্তি এবং যথার্থতা নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া আরো জোরদার করতে হবে। এটা নিশ্চিতকরণে ডিজিটাল ব্যবস্হার প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ব্যবহার করার মাধ্যমে কর্মসূচির আওতায় সুবিধাভোগীদের প্রাপ্যতা বাস্তবায়ন করা সহজ হবে। এক্ষেত্রে ই-প্রযুক্তির মাধ্যমে নতুন নতুন অ্যাপস বা পদ্ধতি উদ্ভাবন প্রয়োজন। পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি হিসেবে বিমা, ইনসিওরেন্সসহ নানা প্রকার প্রচলিত স্কিমগুলোর প্রচলিত শর্ত এবং ব্যবস্হাপনা প্রক্রিয়াকে ই-প্রযুক্তির আওতায় এনে ঢেলে সাজাতে হবে। এছাড়া নতুন পদ্ধতি, প্রক্রিয়া ও ব্যবস্হাপনা উদ্ভাবনের মধ্য দিয়ে সর্বসাধারণের পেনশনসহ সব ধরনের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বা স্কিমের সুবিধাপ্রাপ্তি সহজীকরণও নিশ্চিত করতে হবে।
এ কথা মনে রাখতে হবে যে, মধ্যম আয়ের দিকে ধাবমান বাংলাদেশের অর্থনীতিসহ প্রতিটি ক্ষেত্রের দৃশ্যমান অগ্রগতি যেমন :মাথাপিছু আয়, রিজার্ভ, রপ্তানি বৃদ্ধি আশার সঞ্চার করে তেমনিভাবে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সফল বাস্তবায়ন উল্লেখযোগ্য ব্যবধান কমাতে তথা সমতা আনয়নের ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। ধনী-গরিবের ব্যবধান কমিয়ে এনে দেশের সব মানুষের মধ্যে সমতা আনয়ন কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অপরিহার্য শর্ত। ঠিক তেমনিভাবে বর্তমান সরকারের উন্নয়নমুখী নানা পদক্ষেপ যথাযথভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে অর্থনৈতিক-সামাজিক অগ্রগতি তথা কল্যাণমুখী সমাজ প্রতিষ্ঠা করার জন্যও অন্যতম শর্ত।
সর্বসাধারণের পেনশন-ব্যবস্হার যে বিশাল কর্মযজ্ঞ তা বাস্তবায়নে আমাদের সবাইকে আন্তরিক হতে হবে। এক্ষেত্রে উদাসীনতা কাম্য নয়। এটি বাস্তবায়নের জন্য দরকার সঠিক ও কার্যকর ব্যবস্হাপনা গ্রহণ। আমাদের মনে রাখতে হবে, উন্নত দেশের মতো আমাদের বাংলাদেশের মানুষেরও গড় আয়ু বাড়ছে। বাড়ছে বয়োবৃদ্ধ মানুষের হারও। এদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। যদি এ ব্যবস্হা সুচারুরূপে সম্পন্ন করা যায় তাহলে সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে। অতএব বর্তমান সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি হিসাবে সর্বসাধারণের জন্য ঘোষিত পেনশন-ব্যবস্হা উন্নয়ন অগ্রগতিতে আরো এক ধাপ নতুন মাত্রা সংযোজন করল।
লেখক: উপাচার্য, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়