বিশ্বজিত্ দাস
‘নায়ক হতে চাও?’ গমগম করে উঠল বাংলাদেশ কাউন্টার ইন্টেলিজেন্সের কর্ণধার মেজর জেনারেল (অব.) রাহাত খানের গলা।
এই রে! সেরেছে!! বুড়ো কি সব জেনে ফেলল। আরেকটু হলেই চেয়ার থেকে পড়ে যাচ্ছিল মাসুদ রানা।
‘মানে। কী বলছেন কিছুই বুঝতে পারছি না।’ আমতা আমতা করে বলল রানা।
‘কী যৌবন পার করলে তোমরা বুঝি না! আমাদের সময়ে আমরা তো গ্রেগরি পেক, উত্তম কুমারদের স্টাইল অনুকরণ করতাম। তাদের হাঁটাচলা, বলার ভঙ্গি সব নকল করতাম। পাশের বাড়ির মেয়েদের দেখে মনে হতো সুচিত্রা সেন।’ হতাশার সুরে বললেন তিনি।
চুপ করে রইল রানা। বুড়ো এত নস্টালজিয়ায় ভুগছে কেন আজ!
‘আমরা যুবক বয়সে সিনেমার নায়ক হতে চাইতাম। অথচ তোমাদের প্রজন্মের কারো মধ্যে নায়ক হওয়ার কোনো আগ্রহই দেখি না।’
‘কে বলল দেখি না।’ মনে মনে বলল রানা।
দুই.
মাসকয়েক আগে বিসিআইয়ের একটা ট্রেনিংয়ে গিয়েছিল রানা নতুন রিক্রুটদের ট্রেনিং দিতে। ক্লাস শেষে ওকে ছেঁকে ধরেছিল শিক্ষার্থীরা।
‘স্যার, আপনিও অ্যাপ্লাই করুন, প্লিজ।’ একটা মেয়ে কাকুতি ভরা কণ্ঠে বলেছিল।
‘কোথায় অ্যাপ্লাই করব?’ হেসে জানতে চেয়েছিল রানা।
‘আপনাকে নিয়ে মানে মাসুদ রানাকে নিয়ে সিনেমা নির্মিত হবে। ওরা মাসুদ রানা চরিত্রে অভিনেতা খুঁজছে। আপনি থাকতে কেন অন্যজন আপনার চরিত্রে অভিনয় করবে?’
‘তাই বলে আমি নিজেই নিজের চরিত্রে অভিনয় করব!’ শুষ্ক হেসেছিল ও।
‘আপনার চরিত্রে আপনিই তো পারফেক্ট।’একজন বলল।
‘পুলিশে চাকরি করে কেউ যদি নায়ক হতে পারে, স্পাই হয়ে আপনি কেন পারবেন না।’ আরেকজন বলল।
সত্যিই তো। কথাটা মনে ধরেছিল রানার। ফটোগ্রাফারের সাহায্যে সুন্দর সুন্দর পোজ দেওয়া কয়েকটা ছবি ‘মাসুদ রানা হান্ট’ এ পাঠিয়ে দিয়েছিল কয়েকদিন পর।
পরের সপ্তাহে ডাক পেয়েছিল রানা। আয়োজকরা ওর ছবি নেড়ে চেড়ে বলেছিলেন, ‘আপনি শার্ট খুলে দাঁড়ান তো।’
‘কেন?’ অবাক হয়ে জানতে চেয়েছিল ও।
‘মুভিতে মাসুদ রানাকে কয়েকটি দৃশ্যে খালি গায়ে গান গাইতে হবে। বৃষ্টিতে ভিজে। ফাইটও করতে হবে। ‘
প্রতিবাদ করতে চেয়েছিল ও। জীবনেও কখনো খালি গায়ে ফাইট করেনি ও। বরং অনেক সময় কমপ্লিট পরে শত্রুদের সাথে ফাইট করেছে। টাইয়ের নট পর্যন্ত ঢিলে হয়নি!
কী মনে করে শার্ট খুলেছিল রানা।
তারপরই ‘মাসুদ রানা’ হিসেবে বাতিল হয়েছিল রানা!
শরীরে এত কাটাকুটির দাগ মুভিতে ভালো দেখাবে না!!
নায়কের শরীর হতে হবে চকচকে দাগবিহীন!!!
তিন.
‘মুভিতে অভিনয় করার আগ্রহ নিয়ে ওই অফিসে যাবে তুমি।’ বাস্তবে ফিরে এল রানা।
‘কী করব স্যার? বুঝতে পারছি না।’
ওর দিকে একটা ফাইল ঠেলে দিলেন রাহাত খান।
‘এটা হলো কেসি ইন্টারন্যাশনালের ডিটেইলস। সেলিব্রেটিদের সাথে ওদের ভালো যোগাযোগ। ওরা নতুনদের সুযোগও দেয়। নায়ক-নায়িকা বানায়।’
‘বাংলাদেশে নাকি সিনেমাই নির্মিত হচ্ছে না।’ বলল রানা।
মাথা ঝাঁকালেন রাহাত।
‘ঠিক তাই। কেসি নতুনদের ঢাকার বাইরে কলকাতা, মুম্বাই, চেন্নাই, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের সিনেমায় অভিনয়ের সুযোগ করে দিচ্ছে।’
‘এ তো ভালো খবর। দেশের জন্য ভালোই।’
‘ভুল। ওরা অভিনেতা-অভিনেত্রীদের অন্যদেশের রাজনীতিতেও নাক গলানোর কাজে ব্যবহার করছে।’
‘মানে।’
বিরক্ত হলেন বুড়ো রাহাত।
‘পেপারে দেখোনি, বাংলাদেশের অন্তত দুজন তারকা কলকাতায় নির্বাচনী প্রচারে নেমেছিল।’
‘তারা কি...?’
‘ইয়েস মাই বয়। তারা কেসি ইন্টারন্যাশনালেরই মাধ্যমে গিয়েছিলেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ নিয়ে খুবই বিব্রত। তাই তারা আমাদেরকে এ বিষয়ে তদন্ত করতে বলেছে।’
‘আমাকে ঠিক কী করতে হবে, স্যার?’
‘তুমি কেসিতে যাবে। নায়ক হতে চাইবে। খুঁজে বের করবে কেন, কী কারণে তারা আমাদের দেশের তারকাদের অন্য দেশের রাজনীতিতে জড়িয়ে দিচ্ছে। বাধ্য করছে না কি সম্মোহন করে পাঠাচ্ছে।’
চার.
‘কী রে, তুই যে একেবারে ডুব দিয়েছিস। কোনো খবরই নেই।’ সোহেল জানতে চাইল। বিসিআইয়ের চিফ অ্যাডমিনিস্ট্রেটর।
‘দোস্ত, একটু ব্যস্ত আছি।’ রানা বলল।
‘কী নিয়ে ব্যস্ত?’
‘রানা অ্যাজেন্সি নিয়ে।’
‘হঠাত্ এই ব্যস্ততা।’
‘ব্যস্ততা তো বুড়োর কল্যাণে।’
‘মানে।’
‘বুড়ো আমাকে কেসি ইন্টারন্যাশনালে পাঠিয়েছিল নায়ক হতে। ওখানে গিয়ে দেখি, ওদের তো বিশাল ব্যবসা। বাংলাদেশের ছেলেমেয়েদের কাছে ওরা অনেক টাকা-পয়সা নিয়ে নায়ক বা নায়িকা হওয়ার লোভ দেখাচ্ছে। তারপর ওদেরই টাকা দিয়ে তাদের কলকাতা বা মালয়েশিয়া পাঠাচ্ছে।’
‘বাহ্! ভালোই তো তদন্ত করে বের করেছিস।’
‘শুধু তাই নয়। বিদেশে ভোটের প্রচারে এইসব তারকাদের হঠাত্ করে নামিয়ে দিচ্ছে। এই নিয়ে সামাজিক যোগযোগমাধ্যমে হইচইও তারাই তুলছে। ফলে তারকারাও বিখ্যাত হচ্ছে। রাজনৈতিক দলও ফায়দা তুলছে।’
‘বাহ্! দারুণ বুদ্ধি তো।’ সোহেল প্রশংসা করল।
‘সেটাই তো বলছি দারুণ বুদ্ধি!’ রানা উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল।
‘রিপোর্টটা কবে দিবি?’
‘আর রিপোর্ট! বুদ্ধিটা আগে কাজে লাগাই।’
‘কোন বুদ্ধি?’
‘অন্য দেশের ভোটের সময় তারকা সাপ্লাইয়ের বুদ্ধি।’
‘বুঝলাম না।’
‘তুই তো জানিস রানা অ্যাজেন্সির আর্থিক অবস্থা এখন বেশ খারাপ। কয়েকমাস ধরে কর্মচারীদের বেতন দিতে পারছি না ঠিকমতো। তাই এ বুদ্ধিটা কাজে লাগাচ্ছি। অন্য দেশের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে তারকা সাপ্লাই দেবে রানা অ্যাজেন্সি। এরই মধ্যে আমেরিকার ট্রাম্প প্রশাসন আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। এবার ভোটে বাংলাদেশ থেকে এক ডজন নায়িকাকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর নির্বাচনী প্রচারে সামনের কাতারে দেখতে চান। সেজন্য আমি এখন আপকামিং নায়িকাদের সাক্ষাত্কার নিচ্ছি। কী বুঝলি রে শ্যালক?’
অট্টহাসি দিয়ে ফোন রেখে দিল মাসুদ রানা!