সাইফুল ইসলাম জুয়েল-এর
অনেকদিন বাদে হিরুদের পাশের বাসায় কোনো এক সুন্দরী বালিকার আগমন ঘটেছে। সুন্দরী বেড়াতে আসেনি। আস্ত একটা পরিবার নিয়ে এসেছে! এই নিয়ে হিরুর মন খারাপের অন্ত নেই।
সুন্দরী মেয়েগুলোকে কেন যে তাদের বাসার আশপাশেই এসে আসন গাঁড়ে! তাও আবার অমন বাড়িওয়ালার বাসায়! বাড়িওয়ালা রহমত আঙ্কেলকে এলাকার মানুষ জাঁদরেল বাড়িওয়ালা হিসেবেই চেনে। কেউ কেউ তাঁকে আড়ালে-আবডালে কঞ্জুস বলেও সম্বোধন করে। এই বাড়িওয়ালা বাড়িতে ভাড়াটিয়া ওঠাবে প্রতি শীতে। শীতে মানুষের পানি খরচ কম হয়। তার শর্তটা থাকে এমন—শীতের সময় সারাদিনে একটি পরিবার যতটুকু পানি খরচ করতে পারে, ঠিক তার সমপরিমাণ পানিই সে সারাবছর সাপ্লাই দেবে। তারচেয়ে এক কাপও বেশি নয়! রহমত আঙ্কেল বদ হলেও, সবকিছুতে সোজাসাপ্টা। নিয়মকানুন তিনি ভালোভাবেই বলে-কয়ে তারপর ভাড়াটিয়া ওঠান।
মিনির বাপও যাবতীয় শর্ত মেনে নিয়েই বাসাটা ভাড়া নিয়েছেন। তাঁর পূর্বপুরুষদের বাড়ি নাকি সমুদ্র এলাকায়। এক সমুদ্র পানিতে গোসল সারতেন তাঁরা। হিরু ভেবে কূল পেল না—সেই এলাকার মানুষ কিভাবে সমুদ্র থেকে সোজা কুয়ায় এসে গোসল করছে! দুদিন পরে অবশ্য হিরুর ভুল ভাঙল। মিনির বাপ বাড়ির মধ্যে আস্ত এক চৌবাচ্চা বসিয়েছেন। প্রতিদিন তিনি সেই চৌবাচ্চা পূর্ণ করেন, তারপর ছেলেমেয়েদের জোরপূর্বক সেখানে গোসল করান।
এ তো একটা গেল, আরও কত বিষয়ই না আছে! মিনির বাপের এক কুড়ি মিনি বিড়াল। বিড়ালগুলো নাকি তিনি বাড়ি পাহারা দেওয়ার জন্য পুষেন! কুকুর না পুষে বিড়াল কেন? এই প্রশ্নেরও জবাব মিলল দুদিনেই।
হিরুর ধারণা অনুযায়ী পাড়ায় সুন্দরী বালিকার আগমনের সঙ্গে সঙ্গে দূরদূরান্ত থেকে আগত রোমিওদের আনাগোনা বেড়ে গেল। তাদের মধ্যে অতি উত্সাহী ও অধৈর্য এক-দুজন প্রটোকল ভেঙে বাড়ির ভেতরে ঢুকতে গিয়ে বিড়ালের কামড়ে (নখের আঁচড়ে) জর্জরিত হয়ে পগারপার হলো।
অবশ্য উত্পাত থামল না। ছেলেপেলেদের দল অনাহুতের মতো বাড়ির ভেতরে না ঢুকলেও আশপাশে ঘুরঘুর করতে লাগল। এই বিষয়গুলোই হিরুর একদম ভালো লাগে না। ছেলে-ছোকরার দল এলাকায় ভিড় করলে পাড়ার চায়ের দোকানে আর আগের মতো জায়গা মিলবে না। মিলবে না আর আগের মতো নির্মল বাতাস, তাদের বায়ুদূষণে (সিগারেট পানে!) বাতাস ভারী হয়ে উঠবে।
কিন্তু ক’দিন বাদে হিরুকে অবাক করে দিয়ে ছেলেপেলেরা সব গায়েব হয়ে গেল। কোথায় দিনকে দিন তাদের সংখ্যা বাড়বে, তা নয়, মুহূর্তের মধ্যেই নেই হয়ে গেছে! হিরু নিজেকে শুধাল—তাহলে কি মিনির বিয়ে হয়ে গেছে? তাই বা কী করে হয়, অতটুকু একটা বাচ্চা মেয়ে...। হয়তো বয়ফ্রেন্ড আছে, আর সেটা জানামাত্রই রোমিওরা এখন অন্য কোনো পাড়ার অন্য কোনো সুন্দরীর পেছনে ‘ব্যস্ত’ সময় পার করছে!
স্কুুল ছুটির পর হিরু পাড়ার চাকলাদারের চায়ের দোকানে একবার উঁকি মারল। হিরু জানে, দুনিয়ার যাবতীয় তথ্য একমাত্র পাড়ার চায়ের দোকানেই মিলে। পুরো দোকান ক্রেতাশূন্য, খাঁ খাঁ করছে যেন। হিরুকে দেখে তোতা চাকলাদার পুরো বত্রিশ দন্ত বের করে বলল, ‘গরমাগরম চা খেয়ে যাও।’
‘গরম কোনো নিউজ আছে নিশ্চয়ই?’
‘তা আর বলতে। অবশ্য আমার জন্য তা মোটেও ভালো সংবাদ নয়।’
‘ঝেড়ে কাশো তো।’
‘ব্যবসা মাঝের কয়টা দিন ভালোই চলছিল, বুঝলে। এখন আবার যেই-কে-সেই!’
‘কেন, রোমিওরা সব পালাল কোথায়? বিড়ালের নখে এত বিষ!’
‘বিড়ালের কামড়ে নয়! তারথেকেও ভয়ংকর কিছু!’
‘কী সেটা?’
‘তোমাদের ওই প্রতিবেশিনীর বাপ নাকি সেই লেভেলের শুটার।’
‘শুটার?’
‘যৌবনে শুটিং প্র্যাকটিস করত। কিন্তু কখনো লক্ষ্যভেদ করতে পারেনি। প্রতিযোগিতার প্রাথমিক বাছাই থেকেই বাদ পড়ত। এখন এই বুড়োকালে আবারও তার শুটিংয়ের নেশা চেপেছে!’
‘তো?’
‘তার বাসার আশপাশে ছেলেপেলেরা ঘুরঘুর করলেই তার হাত নিশপিশ করে। গাদা বন্দুক নিয়ে শুটিং প্র্যাকটিসে নেমে পড়েন!’
‘মানে!’
‘বাসায় বাড়িওয়ালাকে বলে একটা ফুটো করিয়েছেন। ওটার ফাঁক দিয়ে বন্দুকের নলা বের করে তাক করে রাখেন। টার্গেটের মধ্যে কেউ এলেই বুম করে মেরে দেন!’
‘অ্যাঁ! বললেই হলো! এভাবে যাকে-তাকে মারা যায় নাকি!’
‘তাহলে আর বলছি কী হিরু বাবু! তার হাতের টিপ সম্পর্কে তো বলেছিই! সে কারণে মাথার খুলি বরাবর গুলি মারলে, সেটা মাথার টুপি উড়িয়ে নিয়ে যায়। আর হাত বরাবর মারলে হাতের দু আঙুলে ধরে রাখা বিড়িটাকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়। পোলাপান সব আতঙ্কেই ভেগেছে!’
‘কিন্তু... ওই কিপ্টুস বাড়িওয়ালা তার বাড়ির দেয়াল ফুটো করতে দিল!’
‘সে প্রশ্ন আমাদের মাথায়ও এসেছিল, বুঝলে। পরে জানতে পারলাম—নিজের স্বার্থেই এই কাজ করেছে সে।’
‘কী স্বার্থ?’
‘তুমি তো মেয়েটাকে ভালো করেই চেন?’
‘ভালো করে না হলেও চিনি আর কী! আমাদের স্কুুলে নতুন এসেছে। আমাদের সেকশনেই ভর্তি হয়েছে।’
‘হ্যাঁ। শুনেছি, তোমার ওই প্রতিবেশিনী নাকি সেই লেভেলের মেধাবী। আগের স্কুুলে কখনো প্রথম ছাড়া দ্বিতীয় হয়নি। সারাদিন পড়াশোনা করে। আর নাকি প্রচণ্ড শব্দ করে পড়ে। সেই শব্দদূূষণে বাড়িওয়ালার কান ঝালাপালা হয়ে যাচ্ছিল!’
‘আমি তো জানি, রহমত আঙ্কেল কানে তেমন একটা শোনেন না!’
‘তাহলে বোঝো ঠেলা! পড়ার আওয়াজ কোন পর্যায়ের হলে ওপরতলা থেকে নিচতলার গিয়ে ওই ‘কানে কম শোনা’ বাড়িওয়ালার কানে ড্রামের ন্যায় আওয়াজ তোলে!’
‘আমিও অবশ্য গত কয়েকদিন দ্রিম দ্রিম আওয়াজ পেয়েছি। সেটা ওই গাদা বন্দুকের আওয়াজ নাকি ওই বজ্রবালিকার, তা নিশ্চিত হতে পারিনি। তারপর কী হলো সেটা বলো।’
‘পড়ার শব্দে ডিস্টার্ব হচ্ছে—রহমত চাচা এই বিষয়টা মিনির বাপকে নানাভাবে বোঝানোর চেষ্টা করে যখন সফলকাম হলেন, তখন মিনির বাপ তাকে ওই ওয়াল ফুটো করে দেওয়ার প্রস্তাবটা দিলেন। সেই সাথে এটাও বললেন, শব্দ ওই ফুটো দিয়ে বাইরে চলে যাবে, নিচে গিয়ে তাকে আর ডিস্টার্ব করবে না!’
‘সত্যিই কি তাই ঘটছে?’
‘বুড়ো বাড়িওয়ালা আগে কানে শোনার জন্য হিয়ারিং অ্যাইড ব্যবহার করতেন। শুনলাম—সেদিন নাকি তিনি সেই যন্ত্রটা ভাঙারির দোকানে বিক্রি করে গেছেন! হাঃ হাঃ হাঃ!’
কতক্ষণ একা একাই হাসল তোতা চাকলাদার। হিরু অবশ্য মুখ গোমড়া করে আছে। তা দেখে তোতা চাকলাদার জানতে চাইল, ‘কোনো সমস্যা, হিরু বাবু?’
‘সমস্যা তো বটেই। মেয়েটা যে কোন কুক্ষণে আমাদের পাশের বাসায় এসে উঠেছে!’
‘কেন?’
‘মা অলরেডি আমি কেন পড়ালেখা করি না—সেজন্য বকবকর শুরু করে দিয়েছেন। ক্লাসে গেলে আরেক জ্বালা। পোলপান এরমধ্যে ওর পেছনে পিঁপড়ের মতো লাইন ধরেছে! আমি প্রতিবেশী বলে অনেকেই আমার হাতে-পায়ে ধরছে। যদি মেয়েটার সাথে কোনোভাবে তাদের ভাব জমিয়ে দেওয়া যায়...! প্রতিদিন তাদের ওই একই টপিক। রোজ রোজ একই কথা শুনতে কারই বা ভালো লাগে বলো!’
‘তুমি একটা চান্স নিলেও কিন্তু পার?’
‘মাথা খারাপ তোমার!’
‘আরে তোমাকে লাইন ধরতে বলছি না। তুমি অন্যদের মধ্য থেকে একজনের সাথে লাইনটা ঠিক করিয়ে দাও। তোমার প্যারা ঘুচে গেল।’
‘সে অবশ্য খারাপ বলোনি। দেখি।’
এরপরের কয়েকটা দিন সেই একই নিয়মে চলল। অবশ্য সহপাঠীদের উত্পাত দিনকে দিন বাড়ছে বৈ কমছে না। অন্যদিকে, প্রতিদিন মায়ের সেই অমিয় বাণী শুনতে হয় তাকে, ‘পাশের বাসার মেয়েটি কত লক্ষ্মী, কী সুন্দর পড়ালেখা করে! আর আমাদের নবাবজাদা তো বইয়ের ধারেকাছেও ঘেঁষে না! তোকে দিয়ে যে কী হবে!’
এরমধ্যে প্রথম সাময়িক পরীক্ষার রেজাল্ট দিল। মায়ের অমিয় বাণী এবার আরেক ডিগ্রি উপরে উন্নীত হয়েছে। ‘মেয়েটা ক্লাসের ফার্স্টগার্ল। আর আমাদের নবাবজাদা...। লজ্জাও করে না। তোকে ওই মেয়ের পা-ধোয়া পানি খাওয়াতে হবে। তাহলে যদি কিছু একটা হয়!’
বাসায় হিরুর রুম চেঞ্জ করা হয়েছে। আগে এটা বাবা-মায়ের রুম ছিল। এই রুমের বারান্দার ওপাশেই মেয়েটির রুম। সারাদিন তার পড়ার শব্দে রহমত চাচার মতোই হিরুরও এখন কান ঝালাপালা হওয়ার জোগার।
সেদিন মিনি বারান্দায় বসে পড়ছিল। হিরুকে দেখে হাই দিল। অমনি হিরু দৌড়ে গিয়ে মাকে কথাটা বলল। মা হেসে বললেন, ‘এ তো খুশির কথা। কিভাবে ক্লাসে ফার্স্ট হতে হয়, মেয়েটার থেকে কৌশলে সেটা জেনে নে।’
হিরু তার রুমের বারান্দায় ফিরে এল। মিনি ফের হাত দিয়ে ইশারা করল তাকে। সৌজন্যবশত হিরুও জবাব দিল।
‘রোদ পোহাচ্ছি।’ মিনি বলল ওকে।
‘তাহলে পড়ছেটা কে?’
‘সেটাও আমি। একসাথে দুই কাজ। এটা আব্বুর হুকুম। একটু পরে গোসলে যাব। সেখানেও পড়তে হবে!’
‘বলে কী!’ হিরু স্বগতোক্তি করল।
‘কিছু বললে?’ মেয়েটা জানতে চাইল।
‘না।’ হিরু বলতে চেয়েছিল, ‘পড়ার আওয়াজ কি একটু কমানো যায় না?’ কিন্তু কথাটা বলল না সে, তাহলে হয়তো আওয়াজ আরো বেড়ে যাবে। হিরু এও বলতে চেয়েছিল, ‘প্লিজ রুমের মধ্যেই পড়ো, বারান্দায় এসে ভলিউমটা আর বাড়িয়ো না। আমার কানের পর্দা ফেটে যাবে।’ কিন্তু এই কথাটাও সে বলল না, তাহলে হয়তো বালিকা নিয়ম করে বারান্দায় বসেই পড়বে!
পরদিন ক্লাসে গিয়ে হিরু ঘোষণা দিল—বাসায় আমার রুমটা সাউন্ডপ্রুভ করতে হবে। বাসা থেকে টাকা দেবে না। তোদের একজনকে স্পন্সর করতে হবে। যে করবি, তাকে মিনির ব্যাপারে হেল্প করব। অনেকেই আগ্রহ প্রকাশ করল। ‘এ তো ভারি মুছিবত!’ এই ভেবে হিরু তখন ডাক ওঠাল। নিলামের মতো করে যে সর্বোচ্চ বিট তুলবে, মিনি তার! অর্থাত্ মিনি যেন তার হয়, হিরু সেজন্য কাজ করবে। এ পর্যায়ে হিরুর অবাক হওয়ার পালা। সর্বোচ্চ ডাক তুলেছে মাহমুদ। মাহমুদদের বাসা হিরুদের পাড়াতেই, মিনিদের বাসার ওপাশে। ও যে মিনির ব্যাপারে আগ্রহী, এতদিন ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেনি কেউ! মাহমুদ নিলামে জেতার সঙ্গে সঙ্গেই ব্যাগ থেকে একটা চিঠি বের করে হিরুর হাতে দিয়ে বলল, ‘এটা অনেকদিন আগেই লিখে রেখেছি। বাট দিতে পারিনি। আজ তোর এটাকে মিনির হাতে পৌঁছে দিতে হবে। সফলকাম হলে কাল সমস্ত টাকা পেয়ে যাবি।’
হিরু কোনো রকমে ঢোঁক গিলে বলল, ‘আচ্ছা।’ কিন্তু ভেবে পেল না চিঠিটা সে মিনির কাছে কিভাবে পৌঁছে দেবে!
বিকেলে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াতেই ওপাশের বারান্দা থেকে মিনি তাকে ইশারা করল। সঙ্গে সঙ্গে বুদ্ধি খেলে গেল হিরুর মাথায়। মিনিকে বলল সে, ‘তোমার জন্য একটা চিঠি আছে।’
‘ওহহো, লাভ লেটার!’ বালিকা উচ্ছ্বাসিত।
‘হ্যাঁ। এক মিনিট দাঁড়াও। দড়ি নিয়ে আসছি।’
‘দড়ি দিয়ে কী হবে?’
‘চিঠিটা তোমার ওখানে পাঠানোর ব্যবস্থা করব।’
‘উহু, তা হবে না! তোমাকে নিজে এসে দিয়ে যেতে হবে!’
‘এ তো ভারি মুছিবত!’ মনে মনে বলল সে। কিন্তু হাল ছাড়ল না। বলল, ‘আচ্ছা।’
রাতে পড়তে বসার সময় ফের মায়ের সেই ভাঙা গ্রামোফোনের আওয়াজ, ‘কী যে পড়ালেখা করিস না! পাশের বাসার মেয়েটাকে দেখেও তো কিছু শিখতে পারিস! ওর পা-ধোয়া পানি খা। তাহলে যদি তোর একটা গতি হয়!’
‘সত্যি বলছ?’
‘কী সত্যি বলছি?’
‘ওর পা-ধোয়া পানি খেলে আমার উপকার হবে?’
মা এবার আমতা আমতা করতে লাগলেন।
হিরু উচ্ছ্বাস চেপে না রেখে বলল, ‘একটা বোতল দাও। মেয়েটার পা-ধোয়া পানি নিয়ে আসছি।’
হিরুকে নিজেদের বাসায় দেখে মিনি যারপরনাই বিস্মিত। তাও আবার মা-বাবা, ভাইয়া এরা বাসায় থাকাবস্থায়ই চলে এসেছে ছেলেটা! কী ডেয়ারিং! একটু তাচ্ছিল্যভাবও চলে এল তার মধ্যে, ‘সত্যি! এ যুগের ছেলেরা এত্ত বোকা না! দুদিন হাই বলেছি আর এখন লাভ লেটার নিয়ে চলে এসেছে!’
‘কী চাই?’ মিলির বাপ গর্জে উঠলেন।
হিরু হাতের বোতলটা দেখিয়ে কাতর স্বরে বলল, ‘মা এটাতে মিনির পা-ধোয়া পানি নিয়ে যেতে বলেছে। ওর পা-ধোয়া পানি খেলে নাকি আমার রেজাল্টও ভালো হবে।’
মিনির বাপ খুশি হলেন। ‘বেশ তো, নাও না। কিন্তু ও তো একটু আগেই হাত-পা ধুয়ে এসেছে! এখন পানি দিয়ে পা ধুলে তা কোনো কাজে দেবে?’
‘সমস্যা নেই আঙ্কেল, আপনার একটু ময়লার ব্যবস্থা করুন। তারপর সেই ময়লাধোয়া পানিই নিয়ে যাব।’
সবাই ওদের রেখে বাইরে গেল ময়লার সন্ধানে। এই ফাঁকে হিরু মিনির হাতে মাহমুদের লেখা চিঠিটা গুঁজে দিল।
পরদিন স্কুুলে যেতেই মাহমুদ হিরুকে চেপে ধরল, ‘কীরে, চিঠিটা দিতে পেরেছিলি?’
‘হ্যাঁ।’ হিরু মুচকি হেসে বলল।
‘জবাবে ও কী বলল?’
‘তোর উদ্দেশে কিছু বলেনি। কিন্তু আমাকে এটা দিয়েছে।’ ব্যাগ থেকে পানির বোতলটা বের করে মাহমুদকে সেটা দেখিয়ে বলল সে।
‘মিনি তোকে এটা দিয়েছে?’
‘হ্যাঁ।’
মাহমুদ বোতলটা ছিনিয়ে নিয়ে বলল, ‘তুই মিথ্যে বলছিস! এটা মিনি আমাকে দিয়েছে। তুই দিতে চাইছিস না।’ এই বলে সে ছিপি খুলে ঢক ঢক করে পুরো বোতলের পানি খেয়ে শেষ করল!
একটু পরেই মিনিও স্কুুলে এল। ক্লাসে ঢুকেই সে এলাহি কাণ্ড ঘটিয়ে বসল। মেয়েটি এতদিন কোনো ছেলের সঙ্গে কথা বলা তো দূরের কথা, ফিরেও তাকায়নি। সেই কিনা মাহমুদকে এককোণে ডেকে নিয়ে গেল। ‘তোমার এত্ত বড় সাহস, আমার কাছে প্রেমপত্র পাঠাও! আব্বুকে বলে তোমার পিঠের ছাল তুলে নেওয়ার ব্যবস্থা করব।’
মাহমুদ মুহূর্তেই বসে পড়ে মিনির পা ধরে বলল, ‘এই তোমার পায়ে ধরছি! আর কখনো এমনটা করব না। প্লিজ, আঙ্কেলকে বলো না।’
সেদিন বিকেলে বারান্দায় মিলির সঙ্গে আবারো হিরুর কথা হলো। মেয়েটা ওকে তাচ্ছিল্য করে বলল, ‘আরেকজনের প্রেমপত্র টানার কাজটা ভালোই শিখেছ দেখছি!’
হিরু কিছু বলল না। লজ্জায় মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছে করল তার।
এর কয়েক মাস পরের ঘটনা। দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষার রেজাল্ট সবাইকে চমকে দিল। মিলিকে সরিয়ে মাহমুদ প্রথম স্থান অধিকার করেছে!
রেজাল্ট কার্ড পেয়ে মেয়েটিও অবাক! তবে সে এই কষ্টের দিনেও মজার এক কাণ্ড করে বসল। মাহমুদকে এককোণে ডেকে নিয়ে আকুতিভরা কণ্ঠে বলল, ‘তুমি কি সেদিনের কথাগুলো ভুলে যেতে পার না!’
সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে হিরু যখন বাধ্য ছেলে হয়ে পড়তে বসল, মা তার পাশে এসে দাঁড়ালেন। হিরু স্বগতোক্তি করল, ‘এই শুরু হলো ভাঙা রেকর্ডার!’
হিরুর মা তাকে অবাক করে দিয়ে বললেন, ‘জানিস, পাশের বাসার মেয়েটা না ডাব্বা মেরেছে! তোকে ওর পা-ধোয়া পানি খেতে হবে না! তারচেয়ে তুই বাবা নিজের মতো করেই পড়!’
মায়ের কথা শুনে হিরু তব্দা খেয়ে গেল। তবে সে আশ্বস্ত হতে পারল না। হয়তো তিনি যখন জানতে পারবেন ফার্স্ট হয়েছে এই পাড়ারই একটা ছেলে, তখন তিনিই আবার বলতে শুরু করবেন, ‘পাশের বাসার ছেলেটা কী... ওর পা-ধোয়া পানি খাইস!’
‘পা-ধোয়া পানি’ এই কথাটা সে কয়েকবার মুখে আওড়ালো। হঠাত্ তার চোখের সামনে ভেসে উঠল মিনির পা-ধোয়া পানির সেই বোতলটাকে মুহূর্তের মধ্যেই মাহমুদের খালি করে ফেলার দৃশ্যটা! অথচ পানিটা তার খাওয়ার কথা ছিল!
একটু যেন তার মনের মধ্যে আফসোস জন্মাল। সেটা প্রথম হওয়ার সুযোগটা হাতছাড়া করার কারণে নাকি মিনিকে না পাওয়ার কারণে, ঠিক বুঝতে পারল না সে! g