যুদ্ধ বিশ্ব জুড়ে দাম বাড়াচ্ছে খাদ্য ও নিত্যপণ্যের

চার মাস আগে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি ৭০ ডলারের নিচে। গত সপ্তাহে এটি ২১ শতাংশ বেড়ে গেছে। বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ১০ শতাংশ বেড়ে ১৩০ ডলার হয়েছে। এটি ১৪৭ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে কিছুদিনের মধ্যেই যদি ইউক্রেন পরিস্থিতি অপরিবর্তিত থাকে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া থেকে তেল আমদানি পুরোপুরি বন্ধের ব্যাপারে ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে আলোচনা করছে। সেটি কার্যকর হলে অপরিহার্য এই পণ্যের দাম অস্থিতিশীল হয়ে পড়তে পারে।

তবে কেবল তেলের দামই একমাত্র চিন্তার বিষয় নয়। ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসন আরো অনেক পণ্যের সংকট তৈরি করেছে। রয়টার্স জানিয়েছে, গত সপ্তাহে নিকেলের দাম বেড়েছে ১৯ শতাংশ, অ্যালুমিনিয়াম ১৫ শতাংশ, জিঙ্ক ১২ শতাংশ এবং কপার ৮ শতাংশ। অর্থাৎ যেসব পণ্য তৈরিতে এগুলো ব্যবহৃত হয় সেগুলোরও দাম বাড়বে। অন্যদিকে স্বর্ণের দামও বাড়তি। আরেকটি দুষ্প্রাপ্য ও মূল্যবান ধাতু প্যালাডিয়ামের দামও বাড়ছে। কারণ এই পণ্যের বিশ্বের মোট উৎপাদনের ৪০ শতাংশই রাশিয়া নিয়ন্ত্রণ করে।

খাদ্যপণ্যের দাম: ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসনের ফলে বিশ্ব জুড়ে খাদ্যপণ্যেরও দাম বেড়ে যাচ্ছে। গমসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শস্যের আমদানি-রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে প্রতিদিনই বেড়ে চলেছে এগুলোর দাম। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, আন্তর্জাতিক গম বাণিজ্যের ৩০ শতাংশ রাশিয়া এবং ইউক্রেনের হাতে। আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, এসব গমের বেশির ভাগ যায় কৃষ্ণসাগর, মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকা অঞ্চলে। যুদ্ধের কারণে ইউক্রেনের বেশ কয়েকটি সমুদ্রবন্দরও বন্ধ হয়ে গেছে। আমদানি-রপ্তানি সংক্রান্ত বেশকিছু অফিস ও স্থাপনাও রুশ বাহিনীর গোলার আঘাতে বিধ্বস্ত হয়ে গেছে। ফলে এসব কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে দাম বাড়ছে সংশ্লিষ্ট পণ্যগুলোর।

অপুষ্টির আশঙ্কা: এদিকে খাদ্যপণ্যের এমন সংকটের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোতে অপুষ্টির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। রাশিয়া ও ইউক্রেন সংশ্লিষ্ট প্রয়োজনীয় খাদ্য, শস্য, প্রোসেসকৃত পণ্য রপ্তানি কমে যাওয়ায় কিংবা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এই পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। বিষয়টি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থারও মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আরো দুঃসংবাদ হলো অতিবর্ষণ ও বৈরী আবহাওয়ার জন্য জার্মানিতে, ভয়াবহ খরার জন্য কানাডা এবং দক্ষিণ আফ্রিকায় এবার শস্য উৎপাদন অনেক কম হয়েছে। তাই ইউক্রেন সংকট পরিস্থিতিকে ভয়াবহ অবস্থার দিকে নিতে যেতে পারে। দাম বেড়ে গেলে অনেকেরই সেগুলো কেনার সামর্থ্য হারিয়ে ফেলবে কিংবা কমে যাবে। এমনিতে করোনাকালে সব পণ্যের উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হয়েছে। পরিস্থিতি কিছুটা ভালো হতেই শুরু হয়েছে ইউক্রেন যুদ্ধ। এই পরিস্থিতির জন্য খোদ রাশিয়ানদের বিরাট একটি অংশই পুতিনকে দায়ী করছে।

কৃষি যন্ত্রপাতি সংকট: ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসন অনেক কৃষি যন্ত্রপাতি তৈরির কাঁচামালের সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে। আধুনিক ট্রাক্টর, ফসল আরোহণের যন্ত্রপাতি ইত্যাদি সংকটে কৃষিকাজও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এই সংকটও খাদ্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, সার তৈরির কাঁচামালের সরবরাহও কমে গেছে ভয়ানকভাবে। ফলে সারের দাম বাড়ছে আমদানিনির্ভর দেশগুলোতে। এর প্রভাব পড়তে পারে খাদ্যপণ্যের দামে। অনেক অঞ্চলে দাম বাড়ছে রান্নার তেলেরও। জাতিসংঘের ফুড অ্যান্ড এগ্রিকালচার অরগানাইজেশন জানিয়েছে, একটি পণ্যের দাম নির্ভর করে বাজারে তার সহজলভ্যতার ওপর। সরবরাহ বেশি হলে দাম কমে, সংকট তৈরি হলে দাম বাড়ে। যখন একটি পণ্যের দাম বাড়ে পরোক্ষভাবে তার প্রভাব পড়ে অন্যগুলোর ওপরেও। দেখা গেছে, মাংসের দাম বেড়েছে ১৫ শতাংশ, দুধের সরবরাহ কমে যাওয়ায় পশ্চিম ইউরোপ এবং ওশেনিয়া অঞ্চলে ডেইরি পণ্যের মূল্য বেড়েছে ২৫ শতাংশ। জানা গেছে, রাশিয়া এবং ইউক্রেনে বিশ্বের মোট ভেজিটেবল অয়েলের ৮০ শতাংশ উৎপাদন করে। এই পণ্যটির দামও বিশ্ব জুড়ে গড়ে সাড়ে ৮ শতাংশ বেড়ে গেছে।

তবে ইউক্রেনে রাশিয়ার অভিযান যদি অব্যাহত থাকে তবে খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির সবচেয়ে খারাপ উদাহরণ তৈরি হতে পারে আরো এক মাস পর। কারণ বর্তমানে অনেক দেশে কিছু পণ্যের পর্যাপ্ত মজুত থাকায় দাম তেমন একটা বাড়েনি। মজুত শেষ হবার পর সরবরাহ চেইনে বাধা পড়লে তখনই নেতিবাচক প্রভাব বুঝতে পারবে। সূত্র: বিবিসি