শাবান মাস হলো আরবি মাসসমূহের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাস। হিজরি চন্দ্রবর্ষের অষ্টম মাস হলো ‘শাবান’ মাস। শাবান মাস মুসলিম উম্মাহর কাছে রমজান মাসের আগাম বার্তা নিয়ে হাজির হয়।
আরবি এ মাসের পূর্ণ নাম হলো ‘আশ শাবানুল মুআজজম’ যার বাংলা অর্থ—মহান শাবান মাস। শাবান আরবি শব্দ যার অর্থ হচ্ছে বেরিয়ে যাওয়া, ছড়িয়ে পড়া ইত্যাদি। এ মাসকে শাবান শব্দ দ্বারা নামকরণ প্রসঙ্গে হাফেজ ইবনে হাজার (রাহ.) বলেন, ‘আরবের লোকেরা এ মাসে পানি সংগ্রহের জন্য বসতি ছেড়ে বেরিয়ে যেত, তাই এ মাসকে শাবান শব্দ দ্বারা নামকরণ করা হয়েছে, যার মাঝে বেরিয়ে যাওয়ার অর্থ রয়েছে। অথবা এ শব্দ দ্বারা নামকরণের এই কারণ হতে পারে যে, রজব মাসে যুদ্ধবিগ্রহ নিষিদ্ধ হওয়ার দরুন সবাই নিজের এলাকায় অবস্থান করত। যখনই রজব মাস গিয়ে শাবান মাস শুরু হতো, সকলে যুদ্ধের জন্য এলাকা ছেড়ে বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ত।
এ ছাড়া আরো অনেক কারণে এ মাস মুসলমানদের কাছে অনেক বেশি তাৎপর্যের। হিজরতের দেড় বছর পর (৬২৪ খ্রিষ্টাব্দ) মুসলমানদের প্রথম কিবলা ফিলিস্তিনের মসজিদুল আকসা বা ‘বাইতুল মুকাদ্দাস’-এর পরিবর্তে মক্কা শরিফের মসজিদুল হারাম তথা কাবা শরিফ কিবলা হিসেবে ঘোষিত ও নির্ধারিত হওয়ার ঘটনা এই শাবান মাসেই ঘটে। বনু মুসতালিকের যুদ্ধ সংঘটিত হয় এ মাসে। মুনাফিকদের বিষাক্ত আক্রমণ থেকে আল্লাহ তায়ালা মুসলমানদের পরিত্রাণ দেন এ যুদ্ধের মাধ্যমে। তা ছাড়া বদরে সুগরা সংঘটিত হয় এ মাসে।
শুধু তা-ই নয়, শাবান মাসে আল্লাহর রসুল (স.) সবচেয়ে বেশি নফল ইবাদত করতেন, বিশেষ করে রমজানের প্রস্তুতিস্বরূপ অত্যধিক নফল রোজা রাখতেন। ইসলামের ভাষ্য অনুযায়ী রজব হলো আল্লাহর মাস, শাবান নবি করিম (স.)-এর মাস আর রমজান হলো উম্মতের মাস। রজব মাস এলেই রসুলুল্লাহ (সা.) ইবাদতের পরিমাণ বাড়িয়ে দিতেন। রজব মাস এলে মনের জমিকে চাষ করা, শাবান মাসে ঐ জমিতে পানি দিয়ে বীজ বপন করা, আর রমজান মাসে অধিক ইবাদত-বন্দেগির মাধ্যমে সফলতার ফসল ঘরে তোলা হয়, যাতে করে পরবর্তী রমজান মাস আসা পর্যন্ত এই রমজানের ফসল (শিক্ষা) নিয়ে জীবনকে সুন্দরভাবে পরিচালনা করা যায়।
শাবান মাস এলেই রসুলুল্লাহ (স.) মাহে রমজানের প্রস্তুতি শুরু করে দিতেন। রমজান মাসের পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে শাবান মাসের তারিখের হিসাব রাখা বিশেষ জরুরি একটি সুন্নাত আমল। হাদিস শরিফে নবিজি সা. বলেন, ‘তোমরা রমজানের জন্য শাবানের চাঁদের হিসাব রাখো।’ (সিলসিলাতুস সহিহাহ, আলবানি, খণ্ড-২, পৃষ্ঠা-১০৩)। এ মাসের গুরুত্ব সম্পর্কে হজরত আয়শা (রা.) বলেন, নবি করিম (স.) শাবান মাসের প্রায় পূর্ণ সময় রোজা রাখতেন। আমি একবার তাকে জিজ্ঞাসা করি, আপনার শাবানের রোজা খুব পছন্দ? রসুল (সা.) বলেন, আল্লাহ তায়ালা সারা বছরে যারা মারা যাবে তাদের তালিকা এ মাসে প্রস্তুত করেন। আমার আকাঙ্ক্ষা যে, আমার নাম মৃতদের তালিকায় ওঠানো হোক রোজা থাকা অবস্থায়।’ (ফাতহুল বারি, খণ্ড-৪, পৃষ্ঠা-২৫২)
এ মাসে মুসলমানদের অনেক করণীয় আছে, এ মাসের প্রথম করণীয় হলো বেশি বেশি রোজা রাখা। রসুলুল্লাহ (স.) শাবান মাসে অধিক পরিমাণে রোজা রাখতেন। একদিন হজরত উসামা বিন যায়েদ রা. রসুল (স.)-কে জিজ্ঞাসা করলেন, শাবান মাসে আপনাকে যত রোজা রাখতে দেখি, আপনি কেন এ মাসে এত বেশি রোজা রাখেন? রসুলুল্লাহ (স.) বললেন, ‘এটি এমন একটি মাস যা রজব এবং রমজানের মতো গুরুত্বপূর্ণ দুটি মাসের মধ্যে পড়ে। আর বেশির ভাগ মানুষ এ মাসটি সম্পর্কে গাফেল থাকে। অর্থাৎ এ মাসটি সম্পর্কে তারা বেখবর থাকে, উদাসীন থাকে। যার ফলে তারা ভালো আমল করে না। তারা ভাবে যে, রমজান তো আছেই।’ (নাসায়ি)।
আরেকটি হাদিসে এসেছে, আয়েশা (রা.) আল্লাহর রসুল (সা.)-এর শাবান মাসের রোজা রাখা দেখে আমি মাঝেমধ্যে ভাবতাম রমজান মাস কি চলে এসেছে নাকি! রসুলুল্লাহ (স.) প্রতি বছর রজব মাসে ১০টি নফল রোজা রাখতেন এবং শাবান মাসে ২০টি নফল রোজা রাখতেন। রমজানে পূর্ণ মাস ফরজ রোজা রাখতেন।
শাবান মাসের আরেকটি কাজ হলো বেশি বেশি কোরআন তেলাওয়াত করা। কারণ, রমজান মাস হলো কোরআন নাজিলের মাস। বিভিন্ন হাদিসে পাওয়া যায়, সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়িন, তাবে তাবেয়িন এবং প্রসিদ্ধ ইমামগণ শাবান মাস এলেই অত্যধিক পরিমাণ কোরআন তিলাওয়াত করতেন। শাবান মাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো বেশি বেশি ইসতিগফার করা। রমজানে রহমত, বরকত, মাগফিরাত ও নাজাতের জন্য শাবান মাস থেকেই সালফে সালেহিনগণ বেশি বেশি ইসতিগফার করতেন; যা মানুষকে রমজান জুড়ে আমলে উদ্যোগী করে তোলে। সুতরাং সব মুসলমানের উচিত, শাবান মাস জুড়ে নিজেদের বিভিন্ন ইবাদত-বন্দেগির মধ্যে মগ্ন রাখা।
লেখক: শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়